বিতর্কিতদের সরিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে বিএনপি?
নিজ এলাকা গেণ্ডারিয়ায় দলবল নিয়ে অস্ত্র হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ নামার ভিডিও ফেইসবুকে দিয়ে আলোচনায় আসার তিন দিনের মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর পদ হারালেন ইশরাক হোসেন।
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের জন্ম দেওয়ার তিন দিনের মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন ইশরাক হোসেন; ঠিক ১৮ দিন আগে রাড্ডাকাণ্ডে নাম জড়িয়ে ইস্তফা দিয়েছেন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
দল ও সরকারের তরফে দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দলে ও দলের বাইরে কী বার্তা দিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি- সে আলোচনা সামনে এসেছে ইশরাকের ঘোষণার পর।
বিএনপি সরকারে আসার আট মাসের মধ্যে এ দুই ঘটনায় দলীয় প্রধানের নির্দেশেই সরে যেতে হল তাদের। নানা অভিযোগ ও সমালোচনা শুরু হওয়ার পরপরই দল ও সরকারের তরফে দ্রুত এমন পদক্ষেপ বিএনপির সর্বস্তরে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে দল ও সরকারপ্রধানের কঠোর বার্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
সবশেষ অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে সোমবার প্রতিমন্ত্রীর পদ হারালেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন এমন খবরের মধ্যে এদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।
শনিবার নিজ এলাকা গেণ্ডারিয়ায় দলবল নিয়ে অস্ত্র হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ নামার ভিডিও ফেইসবুকে দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। দলে ও দলের বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিন দিনের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হল তাকে।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইশরাক বলেছেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে ‘বিব্রত না হয়’ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ ‘আড়ালে পড়ে না যায়’, সেজন্যই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দিন কয়েক আগে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডায় এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টার ঘটনায় নাম আসায় ১ অক্টোবর বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
দুটো ঘটনাতেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তারা পদত্যাগের পথে হাঁটতে বাধ্য হন।
নেতাদের এমন বির্তকিত কর্মকাণ্ডে দলের মধ্যে শৃঙ্খলার লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি ভাবমূর্তি ঠিক রাখতেই দলীয় প্রধানের এমন নির্দেশনা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা।
সরকার পরিচালনায় আসার এক বছর না হতেই নেতাকর্মীদের এসব কার্যক্রমের কারণে আরও বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচতে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষনেতৃত্ব থেকে এমন কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।
অতীতে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ আমলেও এ ধরনের ঘটনার নজির থাকার কথা বলছেন তারা। তবে এর সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে তুলনা করতে চান না তারা।
বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপিপ্রধান দলের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর বলে মানছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তত একটা বার্তা দিচ্ছেন যে, দলে অনৈতিক কাজ সহ্য করা হবে না। এতে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত একটা সতর্কতা তৈরি হবে যে, দলে এগুলো করে পার পাওয়া যাবে না। সতর্ক থাকতে হবে, একটা লাগামের ভেতর থাকতে হবে।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। এ থেকে যেন অন্যরা শিক্ষা নেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে (২০০৯-২০২৪) লতিফ সিদ্দিকী, সোহেল তাজ, আবুল হোসেন, ডা. মুরাদ হাসানের পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) এ কে এম মোশাররফ হোসেন, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নাজমুল হুদা ছিটকে পড়েন মন্ত্রিসভা থেকে।
এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী আফসার উদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরে যেতে হয়েছিল।
তার আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে বিএনপির শাসনামলে শিল্পমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন খান ও তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা দায়িত্ব পালনের মাঝামাঝি সময়ে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন।
তারও আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির আমলে (১৯৮২-১৯৯০) সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আনোয়ার জাহিদ ও সিরাজুল হোসেন খানের মন্ত্রিত্ব হারানোর নজির রয়েছে।
দায়িত্বশীল আচরণ করার বার্তা: মহিউদ্দিন
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও ফেইসবুকে দিয়ে আলোচনায় আসার তিন দিনের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের সরে যাওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “তারেক রহমান দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সর্বত্রতো এক বিশৃঙ্খলা অবস্থা। যে যার খেয়াল খুশি মত চলছে। ফলে দলের বদনাম হচ্ছে। এই জিনিস তিনি অ্যাড্রেস করছেন।”
তার মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ায় প্রতিমন্ত্রী পদ হারাতে হয়নি ইশরাককে। বরং দায়িত্বশীল আচরণ করার বিষয়ে আগামীতে দলের মন্ত্রীরা শিক্ষা নেবেন- এমন বার্তাই দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
“মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্যতো তাকে পদত্যাগ করতে হয়নি। তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে অস্ত্র হাতে লম্ফঝম্ফ দেওয়ার জন্য, এটা তার আচরণের জন্য। (এমন আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে) শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এ থেকে যদি অন্যরা লেসন নেয়,” যোগ করেন তিনি।
কর্মীরা সতর্ক হবেন, তবে ‘গুরুদণ্ড’ পেলেন ইশরাক: আলতাফ পারভেজ
ইশরাক হোসেনের বিষয়টিকে বড় আকারের ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখতে চান না রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। বলেন, “যেটা ঘটলো আরকি, আমি কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর অপরাধটা খুব বড় আকারে দেখি না। উনি বয়সে তরুণ, হয়তো উৎসাহ নিয়ে একটু মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েছেন। কিন্তু তাকে পদ থেকে একবারে পদত্যাগ করতে হওয়ার মত বড় অন্যায় উনি করেছেন বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না।”
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার বিষয়টি নজরে এসেছে এই লেখক ও গবেষক।
“বোঝা যাচ্ছে যে বিএনপি তাদের মন্ত্রিসভাকে একটু ফ্রেশ রাখতে চায়, হয়তো সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে চায়। সেই কারণে হয়তো উনাকে পদত্যাগ করতে বলেছে বা উনি নিজেই পদত্যাগ করেছেন।”
এখানে বিএনপিতে হয়তো ‘একটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি’ আছে বলে অনুমান এ বিশ্লেষকের।
আলতাফ পারভেজ বলেন, “অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে তাদেরকে ব্যবহার করবেন এটা ঠিক, উনি কিছুটা শো অফও করেছেন। কিন্তু গুরুতর অন্যায় করেছেন, দুর্নীতি করেছেন এরকম ঘটনাতো নয় এটা। সেক্ষেত্রে বলব উনি একটু লঘু অন্যায়ে একটা গুরুদণ্ড পেলেন আর কি-আমি মনে করি।”
তবে মন্ত্রিসভার অন্তত একজনের বিরুদ্ধে বেশ সমালোচনা, লেখালেখি হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
কারও নাম না নিয়ে আলতাফ পারভেজ বলেন, “আমার কাছে ভিন্ন একটা জিনিস মনে হয়। মন্ত্রিসভায় বরং দুয়েকজন আছেন, অন্তত একজন আছেন তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য সমালোচনা ঘটেছে; একটা অন্যায়ের লেখালেখি হয়েছে রিপোর্ট হয়েছে সেক্ষেত্রে কিন্তু এত খড়্গহস্ত হয়নি দল।”
তার মতে, সংসদ সদস্য মিষ্টি ও ইশরাকের ঘটনাগুলোর একটা ফল হবে যে বিএনপিতে সতর্কতা তৈরি হবে। কর্মী, সংগঠকরা লাগামহীন থাকবেন না, সতর্ক হবেন। কোনো বিতর্কে জড়াতে চাইবেন না, বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে চাইবেন।
“ওই অর্থে এটা বিএনপির জন্য ভালোই হবে। কিন্তু বিএনপি সরকারে অদক্ষতাজনিত সমস্যাগুলো আছে সেটাতো আর এভাবে সমাধান করা যাবে না।”
দলের প্রধান যে বার্তা দিতে চাইছেন তা হল- দলে অনৈতিক কাজ সহ্য করা হবে না।
উদ্দেশ্য ভালো, প্রক্রিয়ায় ভুল: অধ্যাপক নিজামউদ্দিন
সাম্প্রতিক পদত্যাগের দুই ঘটনার বিষয়ে সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, “পাবলিকলি কোনো মন্ত্রীর জন্য অস্ত্র প্রদর্শন গর্হিত অপরাধ। মন্ত্রী হিসেবে তার আরও দায়িত্বশীল আচরণ দরকার ছিল। এটা অন্যদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। অনেকে যে ধরনের কথাবার্তা বলেন তাদের আরও সতর্ক হতে হবে।”
তার মতে, ইশরাক হয়ত ভালো উদ্দেশ্যে করেছেন, কিন্তু প্রক্রিয়া ভুল হয়েছে। সেটার খেসারত তাকে দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রিত্ব গেলেও অবিভক্ত ঢাকার সবশেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাকের সামনে মেয়র নির্বাচনের পথও কিছুটা প্রশস্ত হয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক এ শিক্ষক।
বাকিরা সাবধান হয়ে যাবে: মুশতাক হোসেন
ইশরাককাণ্ডের পর বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে তার মন্ত্রিসভা থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার বা সম্মান জানিয়ে পদত্যাগ করতে বলার। বরখাস্ত করতে পারেন, তবে সরাসরি বরখাস্তের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় না।
“মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য অন্যায় করলে তার অবশ্যই শাস্তি ও প্রতিবিধান হওয়া উচিত। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে অনেক ঘটনা হয়েছে, কোনো কোনোটি জাস্টিফাইড ছিল, যৌক্তিক ছিল।”
ইশরাককে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াকে ‘যৌক্তিক’ বলে তুলে ধরেন ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, “প্রতিমন্ত্রীর এরকম যে অস্ত্র নিয়ে পেশি শক্তি দেখানো, দাপট দেখানো- এটা উনি একটা প্রতীক হয়ে গিয়েছিলেন। উনার মাধ্যমে যদি এই শাসকদলের বাকিরা সাবধান হয়ে যায়, সতর্ক হয়ে যায় তাহলে আমরা একটা সুফল দেখতে পাবো। কাজেই এই প্রতিমন্ত্রীকে এই পদত্যাগ করতে বলা আমার কাছে পুরোই যৌক্তিক মনে হয়, তিনি খুব অন্যায় করেছেন।”
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করলে নিশ্চয়ই এটা সুফল পাওয়া যাবে এবং অন্তত শাসকদলের অত্যাচার থেকে মানুষ কিছুটা হলেও রেহাই পাবে। একটা গণতান্ত্রিক সরকার সবাই চেয়েছে একটা আইনের শাসনের জন্য।
দল যাতে বিব্রত না হয়, সেজন্যই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত: ইশরাক
রাড্ডাকাণ্ড: বিএনপির সংরক্ষিত এমপি মিষ্টির পদত্যাগ
দল যাতে বিব্রত না হয়, সেজন্যই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত: ইশরাক
ইশরাক কেন ‘এক সপ্তাহের জন্য’ মেয়রের দায়িত্ব নিতে চান?
পিস্তল হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক
ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন? ইশরাক বললেন, জামায়াত নেতার কথায় তিনি ‘ব্যথিত’
