যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডেরেক শোলে ঢাকায়
দুই দিনের সফরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পাশাপাশি দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করবেন এ কূটনীতিক।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দুই দিনের সফরে ঢাকায় পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার ডেরেক শোলে।
মঙ্গলবার বিকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সেলরের দায়িত্বে থাকা ডেরেক শোলে দেশটির আন্ডার সেক্রেটারি পদমর্যাদায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নীতি নির্ধারণ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিংকেনের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ কূটনৈতিক দায়িত্বও সামলে থাকেন এ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেরেক শোলে।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ককে শক্তিশালী করা এ সফরের উদ্দেশ্য।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
সোমবার পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের বিষয়ে সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে সহযোগিতা জোরদার ও যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে সফররত প্রতিনিধিদল।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি বুধবার পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করবেন ডেরেক শোলে ও তার সফরসঙ্গীরা।
প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ইউএসএআইডি এর প্রশাসক সামান্থা পাওয়ারের উপদেষ্টা ক্লিনটন হোয়াইট, পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মুখ্য উপ সহকারী সচিব এলিজাবেথ হোর্স্ট এবং গ্লোবাল ক্রিমিনাল জাস্টিস বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর-এট-লার্জ বেথ ফন স্কক রয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সঙ্কটের মত বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে।
পাশাপাশি র্যাব এবং এর সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই জোর দেওয়া হবে।
এ সফরের বিষয়ে এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলী সাবরীন বলেছিলেন, “ডেরেক শোলের এই সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশের মধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, এটাকে আরও জোরদার করা। দুই সরকারের মধ্যে যে সম্পর্কটা আছে, সেটাকে আরও শক্তিশালী করা।”
তিনি আরও বলেন, “উনি বিশেষত আমাদের বাংলাদেশে যে রোহিঙ্গা সংকট, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অবস্থান, আমরা যে মানবিক সাহায্য দিয়েছি সে বিষয়ে সরেজমিনে দেখতে এবং আলোচনা করতে আসছেন।
“বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটা সেই আগের মতই আছে। আমরা একযোগে কাজ করছি সব সমস্যা সমাধানের জন্য।”
এ সফরের কয়েক দিন আগে বাংলাদেশে একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন ডেরেক শোলে।
সেখানে তিনি বলেন, “মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, যা কেবল খারাপের দিকেই যাচ্ছে। এই শরণার্থী সংকট বাংলাদেশের ওপর চাপ ফেলছে, তা কমানোর জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র সাধ্যমত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশকে।
“মানবিক প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি কিছু শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার কার্যক্রমও রয়েছে।”
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার সফরের ধারাবাহিকতায় ঢাকা সফর করছেন ব্লিংকেনের উপদেষ্টা ডেরেক শোলে।
এর আগে ২০২২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের সফরের পর অগাস্টে বাংলাদেশ সফর করেন দেশটির আন্তর্জাতিক সংগঠন বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশেল জে সিসন। এরপর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুদিনের সফরে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আকতার। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশটির জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়েটা ভ্যালস নয়েস চার দিনের সফরে আসেন।
গত ৭ জানুয়ারি চার দিনের বাংলাদেশ সফরে আসেন হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লউবাখার। তিনি ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় মধ্য জানুয়ারিতে ঢাকা সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এবং মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডনাল্ড লু।
এরপর ৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কারা সি ম্যাকডনাল্ডের বাংলাদেশ সফরের কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়।
ওই সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সম্পর্কিত কৌশলে (আইপিএস) বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবার কারণে উচ্চ পর্যায়ের এসব সফর হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ডেরেক শোলে।
তিনি বলেন, “আগামী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ। সে কারণেই উচ্চপর্যায়ের সফরকারীদের আমরা ঘন ঘন বাংলাদেশে দেখছি।”
বাংলাদেশে অবাধ ও নিরেপক্ষ নির্বাচন দেখার প্রত্যাশা জানিয়ে ডেরেক শোলে বলেন, “আমরা স্বীকার করি যে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রও নিখুঁত নয়। তবে আমরা নিজেদেরকে আরও ভালো করার, উন্নততর করার চেষ্টা সবসময় করে যাচ্ছি।
“এ কারণে আমরা যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অবাধ ও নিরেপক্ষ নির্বাচন, নাগরিক সমাজের সমাবেশ ও মতপ্রকাশের বিষয়ে উদ্বেগ তুলে ধরি, তখন সেটা আমরা অংশীদারিত্ব ও বন্ধুত্বের জায়গা থেকে করে থাকি।”
