প্রস্তাবিত বাজেট ‘কল্পনার ফানুস’: বিএনপি
“এই সরকারের কাছ থেকে জনকল্যাণমূলক বাজেট আশা করাটাই বোকামি। আমরা এই বাজেট প্রত্যাখান করছি”, দলের পক্ষ থেকে বলেন ফখরুল।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ঋণনির্ভর, লুটেরা-বান্ধব’ ও ‘কল্পনার ফানুস’ আখ্যা দিয়ে একে প্রত্যাখান করেছে বিএনপি।
রোববার বিকালে গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপরে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বাজেট উপস্থাপনের পর থেকেই ফখরুল এর সমালোচনা করে আসছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়াও প্রায় একই রকম।
ফখরুল বলেন, ‘‘এই বাজেট কর-নির্ভর, এই বাজেট ঋণ-নির্ভর, এই বাজেট লুটেরা বান্ধব বাজেট। অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ জনগণের ত্রাহি অবস্থা, এর উপরে বাজেটে করের বোঝা। এ বাজেট কল্পনার এক ফানুস, ফোকলা অর্থনীতির উপরে দাঁড়িয়ে আছে।
“লুটেরা সরকারের এই বাজেট কেবলমাত্র দেশের গুটিকয়েক অলিগার্কদের জন্য, যারা শুধু চুরিই করছে না, তারা ব্যবসা করছে, তারাই পলিসি প্রণয়ন করছে, আবার তারাই পুরো দেশ চালাচ্ছে।”
সরকারকে ‘জবাবদিহিতাহীন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “এই সরকারের কাছ থেকে জনকল্যাণমূলক বাজেট আশা করাটাই বোকামি। আমরা এই বাজেট প্রত্যাখান করছি।”
অর্থমন্ত্রী ৭ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট পেশ করেছেন তাতে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি হিসেবে রেখেছেন, যার সমালোচনা করছেন ফখরুল। তিনি বলেন, “সেই ঘাটতি মেটানো হচ্ছে ঋণ দিয়ে। এক দিকে বৈদেশিক ঋণ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ। যে মানুষগুলো ইতোমধ্যে খাদের মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের ওপরে তথাকথিত ‘হাতি’ চেপে বসেছে। তাদের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়া হয়। পুরো বাজেটটাই করা হয়েছে মেগা প্রকল্প, মেগা চুরির জন্য, দুর্নীতি করার জন্য।”
‘মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ করা উচিত ছিল’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘‘অর্থনীতির এই ত্রিশঙ্কুল অবস্থায় উচিত ছিল ‘অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পসমূহ’ বা অর্থহীন, অনুৎপাদক দৃশ্যমান অবকাঠামোগুলো বন্ধ রাখা। সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমুখী খাতে ব্যবহার করা যেত, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও সম্প্রসারিত করার যেত।”
‘‘কিন্তু সেগুলা বন্ধ করলে তো দুর্নীতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই বোধগম্য কারণেই সেটা করা হয়নি”, বলেন তিনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, “করোনাকালে পুনরায় প্রমাণিত হয়েছে আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। সরকার কৃষিকে সহায়তা না করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লক্ষ কোটি টাকা ভর্তুকির অর্থ তুলে দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের অলিগার্কদের হাতে, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ না কিনেই।”
মোবাইল ফোনে কথা বলা ও ইন্টারনেট পরিষেবার বিলে শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘মুখে ‘ডিজিটাল’ এর কথা বললেও তথ্য প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার সরকারি ঘোষণাকে মিথ্যা আশ্বাস ও ফাঁপা বুলিই প্রতীয়মান হয়।”
ফখরুলের অভিযোগ ল্যাপটপের আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যদিও অর্থমন্ত্রী আসলে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছেন।
‘বাজেট দিক-নির্দেশনাহীন’
বাজেট বক্তৃতায় সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো উন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও তার বাস্তবিক কোনো পথনির্দেশনা নেই বলে মত দিয়েছেন ফখরুল।
বাজেটে কর্মসংস্থানের তৈরির কোনো দিকনির্দেশনা নেই দাবি করে বিএনপি নেতা বলেন, “ডলার সংকটের কথা বলে আমদানি সংকুচিত করায় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং কাঁচামাল আমদানি প্রায় অবরুদ্ধ। যার ফলে শিল্প কারখানা বন্ধের পথে।”
ব্যাংকগুলো ‘শূন্য’ দাবি করে তিনি বলেন, “সুদের হার অনেক বেশি। সরকার নিজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ কমে গেছে। এফডিআইও (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) ‘শূন্যের’ কোটায়। নতুন কর্মসংস্থান না থাকায় শ্রমিকরা গ্রামে চলে যাচ্ছে… সেখানেও কর্মের সংস্থান নেই।”
বাজেটে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোনো আশা দেখছেন না ফখরুল। বলেন, “চাকরি হারা এবং দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন রোডম্যাপ নেই।”
অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি সাড়ে ছয় শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বললেও কোনো ‘পথ নির্দেশনা’ নেই বলেও মনে করেন বিএনপি মহাসচিব। বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতির চরম চাপে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। কীভাবে এই মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে তার কোনো কথা নেই বাজেটে।”
সরকারি ‘আশ্রয়-প্রশ্রয়ে’ তাদের ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ কিছু সিন্ডিকেটের কারণেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, “এসব সিন্ডিকেট কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, বাজেটে সে বিষয়ে কোনো আলোচনাই স্থান পায়নি।”
বাজেট বাস্তবায়ন হবে না
ঋণনির্ভর ও ঘাটতি বাজেট অতীতেও বাস্তবায়ন হয়নি মন্তব্য করে বিএনপি নেতা বলেন, “আগামীতেও হবে না।
‘‘বাজেটের এক তৃতীয়াংশ ঘাটতি যা মেটানোর প্রস্তাব করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নিয়ে। ঋণ দিয়ে ঋণ পরিশোধের ফন্দি। অর্থাৎ কৈ এর তেলে কৈ ভাজা আরকি। এই ঋণ নেওয়া হবে সোভারিন গ্যারান্টির কভারে। কারণ কো-লেটারেল দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশ হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থা ফিচ রেটিংস অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান আবারও অবনমন করেছে। এর আগে মুডিস ও এস অ্যান্ড পিও বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হল ‘দেউলিয়া সরকারের ওপর’ কার আস্থা হবে ঋণ দিতে?”
খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারা, অর্থ পাচার, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য রোধে সরকারের ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনাও করেন বিএনপি মহাসচিব। বলেন, ‘‘যে সরকার নিজেরাই আইনকানুন ও সংবিধান ‘লঙ্ঘন করে’ তারা কীভাবে আর্থিক ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে?
“বাংলাদেশ ব্যাংক কতিপয় অর্থপিপাসু অলিগার্ক ও দুষ্টু রাজনীতিকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকারি কাজে ব্যয় সংকোচন, ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা স্থাপন কিংবা আর্থিক খাতে মৌলিক সংস্কার নিয়ে এই বাজেটে কোনো উদ্যোগ নেই।”
কালো টাকা সাদা করতে বাজেট প্রস্তাবের সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব। বলেন, ‘‘দেশ এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের নিপতিত। এর মূল কারণ সুশাসনের অভাব ও জবাবদিহিহীন এই মাফিয়া সরকার।”
ফখরুলের দৃষ্টিতে দেশ ‘মহাসংকটে’ এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় এই ‘স্বৈরশাসকের কবল’ থেকে দেশকে রক্ষা করতে ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা’, অবিলম্বে একটি ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন করা।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
