০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

“এখন পর্যন্ত আঙ্গুল আমাদের সোজা। প্রয়োজনে এটা বাঁকা হবে। আমাদের বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে। আমরাতো চাই নাই।”

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Sep 2026, 11:54 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ শেষে সমাপনী সমাবেশে তিনি বলেন, “জনগণের যখন প্রয়োজন হবে, ডাক তখনই আসবে।”

বিএনপি সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এতগুলো মানুষ মারা গেল। তাদের দলেরও প্রচুর লোক মারা গেছে। গুম হয়েছে। আয়নাঘরে বন্দি হয়েছে। এই মানুষগুলোর রক্ত আর জীবনের প্রতি কি আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই? 

“আফসোস, ক্ষমতায় বসেছেন ছয় মাস। বলেন যে, আমাদের সরকার শিশু সরকার। জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয় নাই। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আপনারা ভোট নিয়েছেন। কথা দিয়েছেন। এখন সবকিছু লঙ্ঘন করছেন।”

জামায়াতের আমির বলেন, “আপনারা উল্টাপাল্টা করবেন। আর বিরোধী দল বসে বসে আঙ্গুল চুষবে এটা হবে না। এখন পর্যন্ত আঙ্গুল আমাদের সোজা। প্রয়োজনে এটা বাঁকা হবে। আমাদের বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে। আমরাতো চাই নাই। আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে এবং সংসদের ভিতরেই তার ফয়সালা হবে। 

“আপনারা গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষকে অপমান করেছেন। প্রতারণা করেছেন। বিরোধী দল জনগণের সাথে প্রতারণা করবে না।”

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এদিন ‘লং মার্চ’ করছে ১১ দলীয় ঐক্য।

শনিবার সকালে ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এ লং মার্চ রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

সমাপনী সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এর আগে আমরা বিরতি দেব না। এই লড়াই আমাদের চলবে। এবং বাংলাদেশও ইনশাল্লাহ বদলাবে। প্রস্তুত থাকুন। বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। তবে এর সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে, ডাক তখনই আসবে। 

“আমরা আস্থাশীল এই লড়াইয়ে জনগণ বিজয়ী হবে। ফ্যাসিবাদ হেরে যাবে। অপরাধীরা, চাঁদাবাজরা, দুর্নীতিবাজরা, লুন্ঠণকারীরা হেরে যাবে। যারা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে তারা হেরে যাবে।”

লং মার্চের ছয় দফা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সকলেই বলেছি, আপনারা গণভোটে হাঁ বলুন। যদি ‘হাঁ’ বিজয়ী হয় তাহলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। এ কথা বিএনপিও বলেছে আমরাও বলেছি। ছয় মাস চলে গেল বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে? 

“সংকট তারাই তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বেধে ছিল যে, এবার একটা পরিবর্তন আসবে। আর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না।” 

তিনি বলেন, “পরিষ্কার একটা কথা বলি, আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। 

“আমাদের আজকের এই লং মার্চ সরকারকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাকি লং মার্চগুলো আর এমন হবে না।”

‘এরা গুপ্ত’

দলীয় আনুকূল্যে ও প্রশ্রয়ে সরকারি দলের লোকেরা এখন সন্ত্রাসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অভিযোগ করে জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান বলেন, “চার দিন আগে ঢাকা বিমানবন্দরে একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাই করেছে তিনটা ছিনতাইকারী মিলে। যখন ছিনতাই করে তখন বলছে যে, আমরা আওয়ামী লীগের লোক। 

“ধরা পড়ার পর এখন দেখা যায় সবগুলো বিএনপির লোক। এরা গুপ্ত। এরেই বলে গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে সেই হচ্ছে সব চাইতে বড় গুপ্ত।”

আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকার একই রাস্তা ধরে হাঁটছে দাবি করে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম তার আরেকটা বাস্তব প্রমাণ। এখানে একজন মেয়র আছেন। উনার কি মেয়াদ এখনো আছে? উনাকে কি বলব আমরা? মেয়াদোত্তীর্ণ বলব তাই না? 

“এখন শুনি যে উনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন থাকবেন। আচ্ছা বলেন এর নাম সুশাসন না এর নাম ফ্যাসিবাদ।”

সরকারের কঠোর সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, “এখন গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই আবার বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল আসতেছে। আমরা তেল পাইনা, জ্বালানি পাইনা, চর্তুদিকে হাহাকার। আর সমাজে বিভিন্ন ধরণের সন্ত্রাস, রাহাজানি, হানাহানি।”

‘জনগণ কিন্তু বিকল্প খুঁজছে’

সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা ৬ দফা দাবি নিয়ে এই লং মার্চ শুরু করেছি। আজকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি মন্তব্র করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যা নিয়ে আমরা অরাজকতা করছি। স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি আপনি করতে না পারেন, তাহলে সেটা সবার আগে জনগণের কাছে স্বীকার করুন। 

“স্বীকার করুন, এই সমস্যার সমাধান আপনার একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বীকার করুন, আপনার কাছে কোনো সঠিক পরিকল্পনা নাই দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার। এবং বিরোধী দলের সাথে আলোচনায় বসুন। বিরোধী দল সমর্থন না দিলে আপনার পক্ষে এ দেশ একা চালানো সম্ভব নয়, এই বাস্তবতা মেনে নিন।”

তিনি বলেন, “আমরা পতিত স্বৈরাচারকে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না। এই পথ আপনারাই করে দিচ্ছেন। কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না। ফলে জনগণ কিন্তু বিকল্প খুঁজছে। সেই বিকল্প কিন্তু আজকের লং মার্চে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে, বিকল্প শক্তি কারা।

“আমরা যেমন পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আছি। পতিত স্বৈরাচার কোনভাবে এই দেশে ফিরে আসতে পারবে না। একইভাবে নতুন কোন স্বৈরাচার আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না।”

নাহিদ বলেন, “তারেক রহমান এই সংকট আপনিই তৈরি করেছেন। আপনি সংসদকে কার্যকর করেননি। সংসদ কার্যকর না হওয়ার কারণে আজকে আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। আপনি যদি প্রথমেই গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ করতেন তাহলে, তাহলে সেই পরিষদে আমরা আলোচনা করতে পারতাম।

“কিন্তু আপনি সেটা না করে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। গণভোটের গণরায় মেনে না নিয়ে গণঅভু্ত্থ্যানের সাথে প্রতারণা করেছেন। তারপরও এই দেশের স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে আমরা সংসদে গিয়েছি এবং আছি। কিন্তু আপনি কি করছেন? দেশের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের মত এই সংসদকেও একটা একদলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছেন।”

তিনি বলেন, “এই সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের মূল হোতা হচ্ছেন এই চট্টগ্রামের সালাউদ্দিন সাহেব। উনি একাই সংসদ চালান। উনি যদি একাই সংসদ চালান তাহলে বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ারতো কোনো প্রয়োজন নাই। 

“আমরা এখনো সংসদে আছি। সংসদকে যদি কার্যকর করেন সমস্যার সমাধান হয়ত কিছুটা খুঁজে পাবেন। সংসদকে কার্যকর করতে হলে সংবিধান সভা তৈরি করুন। বিরোধী দলকে তার যোগ্য জায়গা করে দিন। একসাথে এই দেশকে পরিচালনা করুন।”

পরের অধিবেশনে বিরোধী দল যাবে কি না তা এখনও অনিশ্চিত বলে তুলে ধরে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “কারণ জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে এই সংসদ কোন কাজেই আসবে না।

“হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, সংসদ রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। তার আগেই আপনি হয় জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে কীভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া যায় সেটার রাস্তা খুঁজে বের করুন। নতুবা জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি আপনারা ভঙ্গ করেছেন এর পরিণতি আপনাকে, আপনার দলকে দিতে হবে।” 

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক,  জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার।