‘গুম-হত্যার’ তদন্ত হোক জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে: ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, মিশেল ব্যাশেলের বক্তব্য গুম-খুন নিয়ে অভিযোগের সত্যতা তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেসব বিষয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্ত চায় বিএনপি।
বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “প্রায় ছয়শর অধিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির মানুষ, শ্রমিক নেতা- তাদেরকে গুম করা হয়েছে; বেশির ভাগকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
“এগুলোর কোনো সদুত্তর আমরা পাইনি, গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা পায়নি। একটা লোককে রাষ্ট্র গুম করে রাখবে, তার সমস্ত অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা হবে, তার পরিবারকে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে- এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। এই ধরনের অপরাধ অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেলে ব্যাশেলে ঢাকা সফর করে যাওয়ার পরদিনই বিএনপি এই দাবি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করল।
ব্যাশেলে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংস্থা গঠন করে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান রেখেছেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে।
এ প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “তিনি অত্যন্ত সঙ্গতভাবে বলেছেন যে, এগুলোর সুষ্ঠু স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে এবং সেই সঙ্গে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি কিন্তু র্যাবের নামও উচ্চারণ করেছেন যে, র্যাবের মাধ্যমে এগুলো হয়েছে বলে তাদের ইনভেস্টিগেশনে এসেছে।
“এ বিষয়ে আমরা বলেছি যে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে স্বাধীন ইনভেস্টিগেশন চাই, ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে সেগুলো উদঘাটন করতে চাই এবং যারা এসবের সাথে জড়িত, যেসব সংগঠন জড়িত; তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি আমরা জানিয়েছি।”
গুম নিয়ে বিএনপির অভিযোগ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “উনারা তো একথা বলবেনই। তারা তো স্বীকার করবেন না। তবে কালকে উনার (ওবায়দুল কাদের) বক্তব্য যেটা দেখলাম, উনি বলেছেন যে, জাতিসংঘের কোনো ক্ষমতা নেই এসব গুম-অপহরণ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো বিচার করবার। তার মানে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তাহলে স্বীকার করছেন যে সংঘটিত হয়েছে। সেখান থেকে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো ঘটেছে।
“আপনারা তো নিশ্চয়ই পুলিশ অফিসারদের বক্তব্যগুলো শুনেছেন, এর আগে তারা বলেছেন, অনেকে হারিয়ে যায়, অনেকে পারিবারিক কারণে লুকিয়ে থাকে-এই ধরনের কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু এগুলো প্রমাণিত হয়ে গেছে, বিশেষ করে নেত্র নিউজের যে প্রতিবেদন বেরিয়েছে সেই প্রতিবেদনে আরও বেশি প্রমাণিত হয়েছে যে, এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই গুম হওয়া, অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনার সাথে জড়ানো হয়েছে।”
মির্জা ফখরুল বলেন, “জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার যে বিবৃতি দিয়েছেন, এই বিবৃতি আমাদের এতদিনকার যে দাবি- সেটাই প্রমাণিত হয়েছে আবারও। আমরা যেটা এতদিন বলে আসছি যে, এখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স এবং এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং চলছে।”
“ওদের ভাষা সন্ত্রাসী’
এক দিন আগের সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের হুঁশিয়ারির জবাবে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল বলেন, “গতকালের সমাবেশে উনারা হুঙ্কার দিয়েছেন। বলা যেতে পারে, হুমকি দিয়েছেন বিভিন্নভাবে। এটাই তাদের চরিত্র। এভাবে তারা সব সময় বিরোধী দলকে দমন করতে চায় এবং যে ধরনের ভাষা তারা ব্যবহার করেছে, সেই ভাষা সম্পূর্ণ সন্ত্রাসের ভাষা।”
সরকার দেড় যুগ ধরে বিএনপিকে বাধা দিচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “রাস্তায় তো দাঁড়াতে দেয়নি কোনোদিন। এখন কী কারণে হঠাৎ করে রাস্তায় দাঁড়াতে দিয়ে… আসল চরিত্র কী দাঁড়াবে, কয়েকদিন পরেই দেখা যাবে। এমনি তো দেখেছেন গত কয়েকদিন যাবৎ খুলনাসহ কয়েকটি জেলায় কীভাবে তারা আক্রমণ করেছে দলের কার্যালয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির উপরে।”
আওয়ামী লীগের সঙ্গে নতুন করে কোনো আলোচনায় অনাগ্রহ জানিয়ে ফখরুল বলেন,
“সংলাপের কোনো পরিবেশ বাংলাদেশে নেই। এখানে রাজনৈতিক যে সঙ্কট, তার সমাধান সম্ভব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত হবে, যতক্ষণ না মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে, যতক্ষণ না এই সরকার পদত্যাগ করে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, সংসদ বাতিল না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংলাপের প্রশ্নেই উঠবে না।”
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ধর্মঘটী চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবির প্রতি বিএনপির সমর্থন রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে মহাসচিব বলেন, “ম্যাডামের অবস্থা ভালো। অল হার প্যারামিটারস ভালো। আমি তার ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি, সেই ডাক্তার বলেছেন- উনি অত্যন্ত ভালো আছেন। কোনো সমস্যা নেই এখন পর্যন্ত। উনি হাসপাতাল থেকে যেমনি এসছিলেন, সেরকমই আছেন।
“এমনিতেই তো উনি অসুস্থ। অসুস্থতার মধ্যে সুস্থ আছে। এমন কোনো ব্যাপার নেই যে, এখনই তাকে হাসপাতালে যেতে হবে।”
গুম-খুনের ‘আয়নাঘর’ চূর্ণবিচূর্ণ করা দরকার: জাফরুল্লাহ
নেত্র নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘আয়নাঘর’ হিসেবে যে নির্যাতন সেলের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা ধ্বংস করে গুম-হত্যার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘গুম ও সাদা পোষাকে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক এক সমাবেশে এই দাবি করেন তিনি।
জাফরুল্লাহ বলেন, “গুয়ানতানামো জেলের কারণে আমেরিকাকে সারা পৃথিবী ধিক্কার দেয়। তবে আমেরিকার সরকার যাদের গুয়ানতানামো নিয়ে যায়, তাদের প্রত্যেকের তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু আমাদের এখানে ‘আয়নাঘর’ আছে, আমরা কেউ জানি না।
“আজকে এই যে গুমের কাহিনী এটা শেষ হবার নয়। এর পরিবর্তন দরকার। আয়নাঘরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া দরকার। প্রত্যেকটা গুমের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”
সমাবেশ থেকে ‘গুমের শিকার’ সব নাগরিককে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত করা, সব ‘রাজবন্দি’র মুক্তির দাবি জানানো হয়।
খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাফরুল্লাহ বলেন, “দুর্ভাগ্য যে বিএনপি তার নেতা চিনে না। তাদের নেতা হবে খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া নয়। খালেদা জিয়া জামিন নিলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জোয়ার বইবে।
“আপনি (সরকার) খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়ে দেন, দেখেন না কী হয়? আপনি প্রতিহিংসা বাদ দেন। সষ্ঠু নির্বাচন দরকার, নির্বাচনের আগে একটা নিরপেক্ষ সরকার বা জাতীয় সরকার যাই বলেন না কেন, একটা কিছু করতে হবে। ২০১৪ সালের খেলা চলবে না। ২০১৮ সালের ইভিএমের চালাকি চলবে না।”
সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদিব, পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আখতার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসাইন বক্তব্য দেন।
