হামিদুর রহমানের ভাঙা ভাস্কর্য: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় দায় কার?
১৮ বছর বয়সে স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেওয়া বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে কোনো একক দলীয় বৃত্তে আটকে রাখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা ও রাষ্ট্রের নীরবতার পেছনে লুকানো সংকট কোথায়?
একটি ভাস্কর্য ভাঙলে কতটুকু ভাঙে? ইট, পাথর, ধাতু কিংবা নির্মাণ শৈলীর দৃশ্যমান অবয়বটুকু? ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাঙচুর হওয়া ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ালে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে। কারণ আঘাত করা হয়েছে এমন একজন মানুষের স্মৃতির প্রতি, যিনি একাত্তরে নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরের ভাস্কর্য ভাঙা শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মুক্তিযোদ্ধা, হামিদুর রহমানের পরিবার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভও হয়েছে। পরে ঢাকা থেকে নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে যায়। তারা ভাঙা ভাস্কর্য পরিদর্শন করে, শ্রদ্ধা জানায় এবং পুনঃস্থাপনের দাবি তোলে।
ঘটনাটিকে শুধু একটি স্থাপনা ভাঙার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা ধরা পড়বে না। প্রশ্ন উঠবে, স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া একজন বীরের স্মৃতিচিহ্ন কেন আক্রান্ত হলো? কারা ভাঙল? কী উদ্দেশ্যে ভাঙল? প্রশাসন তখন কোথায় ছিল? ভাঙচুরের খবর প্রকাশ্যে আসার পরও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন কেন নাগরিকদেরই তুলতে হচ্ছে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জানা জরুরি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিচয় কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় বৃত্তে আটকে নেই। তিনি বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ধলই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান দখলের অভিযানে তিনি জীবন দেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। স্বাধীনতার জন্য সেই আত্মদান তাকে বাংলাদেশের মানুষের যৌথ স্মৃতির অংশ করে রেখেছে। সুতরাং তার ভাস্কর্যের ওপর আঘাতের তাৎপর্যও বৃহত্তর।
একটি সমাজ তার অতীতকে কীভাবে ধারণ করে, তা বোঝা যায় সেই সমাজের স্মৃতিচিহ্নগুলোর প্রতি আচরণ দেখে। শহরের কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্য শুধু সৌন্দর্য বর্ধনের উপকরণ হয়ে থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষ, ঘটনা, সময় এবং একটি জনগোষ্ঠির দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম সেই দৃশ্যমান স্মারকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে পারে, মানুষটি কে ছিলেন? কেন তার ভাস্কর্য এখানে? কী করেছিলেন তিনি? সেই প্রশ্ন থেকেই অতীতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ তৈরি হয়। ফলে ভাস্কর্য ধ্বংসের মধ্য দিয়ে স্মৃতির সেই দৃশ্যমান সংযোগেও আঘাত আসে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ভাস্কর্য ও স্থাপনার ওপর আক্রমণের একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ঝিনাইদহের কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক আবু সাইদ খান মেহেরপুরের মুজিবনগরে ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে প্রতিটি আক্রমণকে পাশ কাটিয়ে গেলে সামগ্রিক প্রবণতাটি চোখ এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ খুব সামান্য।
নাগরিক প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ চত্বরে স্থাপিত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও প্রশাসনের নজরে কেন বিষয়টি এল না। তাঁদের বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, জনপরিসরে থাকা জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বর্তায়। ভাস্কর্যটি কে বা কারা ভেঙেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করা দরকার। অনুমান, গুজব কিংবা রাজনৈতিক সুবিধামতো কোনো গোষ্ঠিকে অভিযুক্ত করার বদলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে তথ্য ও তদন্তের মাধ্যমে। সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা সংগ্রহ করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া, স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করা এবং ভাঙচুরের সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রশাসনিক অবহেলা কিংবা কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয় ছিল কি না।
দায়ীদের বিচারের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো স্মারক ভেঙে ফেলার পর নতুন করে নির্মাণ করলেই পুরো ঘটনার সমাপ্তি ঘটে না। অপরাধের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলায় অন্যরাও উৎসাহিত হতে পারে। আজ হামিদুর রহমান, আগামীকাল অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক আক্রান্ত হতে পারে। এক সময় জনপরিসর থেকে একাত্তরের দৃশ্যমান স্মৃতিগুলো ক্রমে মুছে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে। এখানে আরেকটি বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। বাংলাদেশে ভাস্কর্যকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। শিল্প হিসেবে ভাস্কর্য, স্মৃতির বাহক হিসেবে ভাস্কর্য এবং উপাসনার প্রতিমার মধ্যকার পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। সেই বিভ্রান্তি যখন সংগঠিত বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন শিল্পকর্মের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের দৃশ্যমান সম্পর্ক।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ধর্মকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংসের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ধর্মকেও একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে নামিয়ে আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল সরকারি অনুষ্ঠান, দিবসের বক্তৃতা কিংবা ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ধরে রাখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জীবিত থাকে মানুষের আচরণে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে, পাঠ্যপুস্তকে, সাহিত্য ও শিল্পে, স্মৃতিসৌধে, ভাস্কর্যে এবং শহীদ পরিবারের প্রতি আমাদের ব্যবহারে। হামিদুর রহমানের বোন রিজিয়া বেগমকে নিজের ভাইয়ের ভাঙা ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে, এই দৃশ্য আমাদের জন্য গভীর অস্বস্তির।
একজন বোনের কাছে সেই ভাস্কর্য কোনো বিমূর্ত জাতীয় প্রতীক মাত্র নয়। সেখানে তার ভাইয়ের মুখ আছে, পরিবারের হারানোর স্মৃতি আছে, ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা মিশে আছে। ফলে তার উপস্থিতি পুরো ঘটনাকে আরও মানবিক করে তোলে। আমরা তখন ভাঙা নির্মাণের দিকে শুধু তাকাই না, একটি পরিবারের দীর্ঘ বেদনার কাছেও পৌঁছে যাই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলো তার ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে হাজির করতে পারে, ক্ষমতাসীনরা কখনো তাকে দলীয় সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করতে পারে। এসবের সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধ্বংস করার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
বরং মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় মালিকানা থেকে বের করে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই দরকার। হামিদুর রহমান সেই মানুষেরই একজন। আঠারো বছরের এক তরুণ, যিনি স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ নিজে দেখে যেতে পারেননি। তার আত্মদানকে কোনো দল, সরকার কিংবা বিশেষ মতাদর্শের একক সম্পত্তি বানানোর সুযোগ নেই। এ কারণেই ঝিনাইদহের ভাঙা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। পুনঃস্থাপন যেন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের প্রশাসনিক প্রকল্পে সীমিত না থাকে। মূল নকশা, শিল্পমান ও স্মৃতির মর্যাদা বজায় রেখে যথাযথভাবে কাজটি করা উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন স্থাপনার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্ষতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট পদ্ধতি থাকা দরকার।
ভাঙচুরের এমন ঘটনাকে কোনোভাবেই সমাজে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য প্রবণতায় পরিণত হতে দেওয়া উচিত হবে না। যে সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের বদলে বই পোড়ানো হয়, শিল্পকর্ম ভাঙা হয়, ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় কিংবা স্মৃতিচিহ্ন নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চলে, সেখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের চিন্তা ও প্রকাশের পরিসরও ছোট হতে থাকে। হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য তাই পুনর্নির্মাণ করা দরকার। একই সঙ্গে খুঁজে বের করতে হবে কারা ভেঙেছে, কেন ভেঙেছে এবং এত বড় একটি ঘটনা ঘটতে দেওয়ার পেছনে কার অবহেলা ছিল। পুনঃস্থাপিত ভাস্কর্যটি দাঁড়াক ঠিক সেই জায়গায়, আরও যত্নে, আরও মর্যাদায়। কারণ হামিদুর রহমানের স্মৃতি রক্ষার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত একটি ভাস্কর্য রক্ষার মধ্যে আটকে থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমরা আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া মানুষদের কীভাবে স্মরণ করতে চাই, সেই প্রশ্নও।
শাহেদ কায়েস কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com
