গালি কাম্য নয়, কিন্তু জবাবে পুলিশ পাঠানো কি গণতান্ত্রিক?
নাগরিকের ভাষার সীমা অতিক্রম আর অপরাধের মধ্যে রাষ্ট্র কীভাবে রেখা টানবে?
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতায়। ক্ষমতাসীন সরকারকে ঘিরে উচ্ছ্বাস, সাফল্যের প্রচার আর স্তূতিবাক্য শুনতে সরকারের বিশেষ রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রয়োজন হয় না। আসল পরীক্ষা হয়, যখন নাগরিক বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, প্রশ্ন তোলে এবং কখনো কখনো সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ভাষার সীমাও অতিক্রম করে।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই পরীক্ষাটিই সামনে এনেছে। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে তার বাসা থেকে আটক করে পুলিশ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে তিনি ফেইসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তার দাবি ছিল, এক মাসে ৪ হাজার এবং আগের মাসে ৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশকে জানালে ৩ সেপ্টেম্বর রাতেই তাকে আটক করা হয়। পরদিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। নাগরিকের অশালীন ভাষা ব্যবহার সমর্থন করার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রপ্রধান বা যে কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত গালাগালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ভালো নয়। কিন্তু একজন নাগরিকের ভাষা খারাপ হলেই রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত?
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে নাগরিকত্ব। নাগরিক সরকারকে ভোট দেন, কর দেন, সরকারি সেবা গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির ফল ভোগ করেন। ফলে সেই সরকারের কাজ নিয়ে তার প্রশ্ন করার অধিকারও থাকে। কারণ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কারণে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারের সমালোচনা এবং অপরাধ এক শ্রেণিতে পড়ে না। এই পার্থক্যটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। রাষ্ট্রের এখানে সূক্ষ্ম দায়িত্ব আছে। কোনো বক্তব্য অপছন্দ করা এবং কোনো বক্তব্য আইনত দণ্ডনীয় হওয়াকে এক করে করে দেখার সুযোগ নেই।
জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রের এই সমস্যাটিকে আরও গভীরভাবে দেখেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, স্বাধীনতার জন্য বিপদ কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে আসে না। সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক চাপও ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে। তার ভাষায়, প্রচলিত মতামত ও সামাজিক অনুভূতির চাপ ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মতোই কার্যকর।
গণতন্ত্র মূলত ভদ্র মানুষের জন্য তৈরি কোনো ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে বিরক্তিকর, অস্বস্তিকর, কঠিন এবং কখনো অভদ্র মতামতেরও জায়গা থাকে, যতক্ষণ তা আইনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে।
এই জায়গায় সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনাও প্রাসঙ্গিক। গত ২৯ অগাস্ট রাঙামাটি সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আবু আবরার আলভী বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ফেইসবুকে লিখেছিলেন, “আগে বিদ্যুতের অনেক সমস্যা ছিল, এখন বিদ্যুৎই আর নেই।” কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই পোস্টকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখিয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং পরে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতা এক জিনিস নয়। দল তার কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতেই পারে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও যদি বাস্তব সমস্যার সমালোচনা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তাহলে সরকারের কাছে সত্যিকার পরিস্থিতির খবর পৌঁছাবে কীভাবে?
ইয়ুর্গেন হাবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসরের ধারণা মতে, গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝখানে এমন একটি পরিসর প্রয়োজন, যেখানে নাগরিকেরা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও আপত্তি জানাতে পারেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতি কেবল নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিদিনের কথোপকথন, বিতর্ক এবং সমালোচনার মধ্য দিয়েও রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। বিদ্যুৎ নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি রাষ্ট্রীয় সেবা। কোনো নাগরিকের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক মনে হলে তার অভিযোগ শোনা উচিত। বিল সঠিক হলে ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। ভুল হলে সংশোধন করা উচিত। এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলে কেন নেই, কখন ফিরবে, কতটা ঘাটতি আছে, সরকার কী করছে, এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।
সেই জায়গায় নাগরিক যদি সমস্যার পরিবর্তে নিজের ভাষার জন্য রাষ্ট্রের নজরে চলে আসেন, তাহলে রাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হারায়। ক্ষোভকে অপরাধ হিসেবে দেখা শুরু করলে রাষ্ট্র সমস্যার উৎসটি দেখতে পায় না।
শক্তিশালী সরকার সমালোচকের মুখ বন্ধ করে শক্তিশালী হয় না। শক্তিশালী সরকার সেই সরকার, যে নিজের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কথার মধ্য থেকেও প্রয়োজনীয় সত্যটি বের করে নিতে পারে।
গালি অবশ্যই রাজনৈতিক সংস্কৃতির আদর্শ ভাষা নয়। নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। মিথ্যা তথ্য, হুমকি, সহিংসতায় উসকানি, ব্যক্তিগত হয়রানি কিংবা আইনত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সরকারের সমালোচনা, নীতির বিরোধিতা কিংবা জনদুর্ভোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াকে একই মাপে বিচার করলে গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত হয়।
রাষ্ট্রের হাতে পুলিশ আছে, মামলা করার ক্ষমতা আছে, প্রশাসন আছে। নাগরিকের হাতে আছে কণ্ঠস্বর। ক্ষমতার এই অসম সম্পর্কের কারণেই রাষ্ট্রের সংযমের প্রয়োজন বেশি।
নাগরিকের কথা বলা শ্লীলতার সীমা অতিক্রম করলে সেটা নাগরিক সমাজই দেখবে। গালিগালাজের উত্তরে পুলিশ পাঠানোর প্রয়োজন হয় না।
সরকারকে গালি শুনতে ভালোবাসতে হবে না। গালিকে প্রশ্রয় দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু গণতন্ত্রে সরকারকে এমন আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হয়, যাতে গালি শুনেও সে প্রথমে খুঁজে দেখে, এই গালির পেছনে কোনো বাস্তব অভিযোগ আছে কি না। কারণ নাগরিকের ভাষা কখনো কখনো অশালীন হয়ে পড়তে পারে। নাগরিকের সমস্যাটি অশালীন নয়।
গাজীপুরের ঘটনাটি প্রমাণ করে সরকার এখনো গালি শোনার মতো উদার হয়ে উঠতে পারেনি। আরও বড় কথা, নাগরিকের রাগের ভেতরে রাষ্ট্রের জন্য যে বার্তা থাকে, সেটি শোনার মতো রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
উল্লেখ্য, ভিডিওতে দুই মাসে ১০ হাজার টাকা বিল পরিশোধের কথা বলে সিফাত আব্দুল্লাহ যে চমক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, বাস্তব চিত্র বোধ হয় অতটা সরল নয়। পল্লীবিদ্যুতের ভাষ্য অন্তত সে কথাই বলছে, যা এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
সাজ্জাদ সাব্বির এনসিপির কেন্দ্
