’ফতোয়া অবৈধ’– হাইকোর্টের রায় কার্যকর হোক
গত ৮ জুলাই হাইকোর্ট এক রায়ে ঘোষণা করেছে ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম ও শাস্তি প্রদান অবৈধ এবং সাজা প্রদানকারীকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করে শাস্তি দিতে হবে। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর সমন্বয় গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেছে। খবরটি সন্ধ্যায় অফিসে বসে পেয়েই স্বস্তি পেলাম। তবে শঙ্কাও রইলো। সুপ্রিম কোর্টে আবার আপীল হলে কত বছর পড়ে থাকবে জানি না।
২০০১ সালেও হাইকোর্ট এমন একটি রায় ঘোষণা করেছিল। সেটাও ঐ আপীল বিভাগে ধুলোমলিন হয়ে মামলার জটে পড়ে আছে। আপীল বিভাগ কোন মীমাংসা দেননি। কেন বা কী কারণে মামলার নিষ্পত্তি হয়নি জানি না। তবে ফতোয়াবাজরা নিশ্চুপ হয়ে বসে নেই। তারা তাদের ফতোয়াবাজি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র। মেয়েদেরকে এদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নারী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ফতোয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। তখনও হাইকোর্টের রায় এমনই ছিল। সরকার পক্ষ আবার সুপ্রিম কোর্টে আপীল করায় সেটাও অবহেলায় পড়ে আছে। কিন্তু চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আমাদের শুধু অপেক্ষায় থাকতে হবে।
ফতোয়া আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে অসহায় করে তুলেছে। পুরুষশাসিত এই সমাজে নারীর সকল অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করছে। ফতোয়া দিয়ে শুধুমাত্র মেয়েটিকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে তার ওপর নির্যাতন ও অপমানের যে মাত্রা আমরা দেখি তা আরও ভয়াবহ। সালিশী বসিয়ে তার চরিত্র নিয়ে অকথ্য ভাষায় অপমান, ১০১ দোররা মারা, একঘরে করা তার পরিবারকে ইত্যাদি।
আমি ছাতকছড়ার নূরজাহান, মধুখালির নূরজাহান ও কসবার স্বপ্নাহারের ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ফতোয়া নারীর জীবন ও অধিকার অবমাননার শামিল। নারীর স্বাভাবিক জীবন-যাপনের গতিকে নষ্ট করে। নারীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। ফলে নারী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। পরিবার থেকে গঞ্জনা পেয়ে সে বেঁচে থাকার মত সাহস ও শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফতোয়াবাজদের কাছে মেয়েটি সহানুভূতি ও সহায়তা পায় না। বরং প্রতারিত ও বিধার্মিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কারণে বা যে ব্যক্তির কারণে মেয়েটিকে অপরাধী বানিয়ে সালিশী বসলো সেখানে অপরাধকে ঘৃণা করা হয় না এবং সেই ব্যক্তিও ক্ষমা বা রেহাই পেয়ে যায় অথবা অল্প শাস্তি ভোগ করে শুধু মাত্র পুরুষ বলে। অপরাধের জন্য মেয়েটিকে প্রধানতঃ দায়ি করে তার চরিত্র কলঙ্কিত করে কঠিন শাস্তি দেয়া হয় যা শুধু দুঃসহ যন্ত্রণাদায়কই নয় রীতিমত দুর্ভাগ্যজনক।
ছাতকছড়ার নূরজাহানকে হাঁটু সমান গর্তে দাঁড় করিয়ে ১০১ টি পাথরকণা ছুড়ে মারা হয়। তার অপরাধ কী ছিল? দীর্ঘদিন ঘরে না ফেরায় তার বাবা-মা তাকে আবার বিয়ে দিয়েছিল। তার স্বামী ফিরে এলে গ্রামের মৌলবী ও মুরুব্বিরা এ বিয়েকে হারাম আখ্যা দিয়ে গ্রাম্যসালিশী বসায়। ফতোয়া দেয়া হয় নূরজাহান দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারবে না। সেই সঙ্গে তাকে ১০১ টি পাথরকণা ছুড়ে মারা হবে। এই অপমান ও অবমাননা সহ্য করতে না পেরে নূরজাহান ঘরে ফিরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করে। কসবার স্বপ্নাহারকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে গ্রামেরই একটি ছেলে। একসময় সন্তান হয় কিন্ত ছেলেটি তাকে বিয়ে করতে রাজি হয় নি। গ্রামের মোল্লা-মৌলবীরা তখন সালিশ বসিয়ে দিন ঠিক করে ফতোয়া দেয় তাকে একশ দোররা মারা হবে। দোররা মারার আগের দিন তাকে আমরা নবজাত বাচ্চাসহ গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে আসি।
সেসময় দেখেছি তার দরিদ্র পিতামাতার আহাজারি ও কান্না। তারা আমাদের কাছে পেয়ে যেন জীবন ফিরে পেলেন। মেয়েকে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আপনারা ওকে বাঁচান। দোররা মারলে ও মরে যাবে। ও এখানে থাকলে আমাদের একঘরে করে দেবে। সেই গ্রামের আলপথ ধরে আমি স্বপ্নাহারকে এবং মালেকা বেগম তার বাচ্চাকে কোলে করে শত শত মানুষের সামনে দিয়ে এক কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে গাড়িতে উঠি। ঐ সময় ওখানে যিনি থানা নির্বাহী অফিসার ছিলেন তিনি আমাদের বলেছিলেন, ওকে আপনারা নিয়েই যান। সরকার থেকে ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু মেয়েটা সুখে থাকতে পারবে না। স্বপ্নাহার এখনও মহিলা পরিষদের রোকেয়া ভবনে আছে। তার মেয়েটিও স্কুলে লেখাপড়া করছে।
আমি মনে করি, এসবই মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানবাধিকার কমিশন এদিকটা বিবেচনা করবে বলে আমি প্রত্যাশা রাখি। মানবাধিকার কমিশন নিজ উদ্যোগেই দেশের জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘন কোথায় কীভাবে এবং কাদের দ্বারা হচ্ছে সেটা চিহ্নিত করতে পারে।
নূরজাহানদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি ফতোয়ার নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা দেয়া হয়। ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিকে এইসব ফতোয়া নামধারী ধর্ম ব্যবসায়ীরা সহজেই কাবু করে ফেলে। ফলে মেয়েটি পরিবারে ও সমাজের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পায় না। বরং কলঙ্কিনী হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আমাদের দেশে ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে ফতোয়ার নামে মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করে, শিক্ষাগ্রহণ ও চাকুরী করা নাজায়েজ উল্লেখ করে, বাল্য বিবাহ দিতে বাধ্য করে, বোরখা পরতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু মেয়েটি কী চায় সেটা জানতে চায় না। তাকে পিতা-ভ্রাতা-স্বামী-সন্তানের বাধ্য হয়ে চলতে বলা হয়। মেয়েটির জীবন, তার মেধা ও দক্ষতা, তার স্বপ্ন ও চাওয়াপাওয়ার কোনো মূল্য দিতে চায় না। সমাজ এগিয়ে চলেছে, মানুষ তার ভাগ্য পরিবর্তন করছে, দেশের উন্নয়ন ঘটছে এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তির কারণে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। সভ্যতার বিকাশ এ কারণে ঘটে। আর এইসব ধর্মান্ধ ধর্ম ব্যবসায়ীরা অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে পেছনে ঠেলে রাখতে চায়, মধ্যযুগীয় পন্থায় নির্যাতন ও শোষণের মাধ্যমে দমিয়ে রাখতে চায়। আমরা এটা মেনে নিতে পারি না। যার যা ধর্ম সে তো তা পালন করেই থাকে। তারপরও রাষ্ট্রীয় আইন রয়েছে। সেই আইনই আমাদের ন্যায় বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বিচার বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে সুষ্টু ও স্বাধীনভাবে বিচার করা। এর বাইরে ফতোয়ার বিচার কেন প্রচলিত থাকবে? কেনই বা সে বিচার নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে ?
ইদানিং পত্রিকায় খবর দেখছি কোথাও বাল্য বিবাহ হবার খবর পেলে প্রশাসন, শিক্ষক ও সচেতন মানুষ প্রতিরোধ করছে। এটা একটা ভালো লক্ষণ। আশা করবো, সামাজিক আন্দোলন এভাবেই গড়ে উঠবে। সম্প্রতি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে সৌদি আরবে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছে। ১৩ জুলাই মঙ্গলবার পত্রিকায় আরও একটি খবর দেখলাম ইরানে একজন নারীকে ব্যাভিচারের কারণে পাথর ছুড়ে মারার ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত সেদেশের উচ্চ আদালত এই আদেশ স্থগিত করে দিয়েছে। অধিকাংশ মুসলিম দেশেই ফতোয়া দিয়ে এধরনের বিচার নিষিদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশেও ফতোয়ার শাস্তি বন্ধ করা সরকারের দায়িত্বে পড়ে। ফতোয়ার এভাবে যথেচ্ছাচার বিচার ও শাস্তি অবশ্যই সরকার আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করতে পারে। ধর্মের নামে এক শ্রেণীর মোল্লার এই মধ্যযুগীয় পাশবিক বিচার ও শাস্তি অবশ্যই শান্তি ও মানবতার লঙ্ঘন। সমাজের মধ্যেই নারীর বসবাস। তাহলে তাকে কেন বিচ্ছিন্ন রেখে চিন্তাভাবনা করা হবে? কেন ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হবে? তার ওপরই সব নির্যাতন নিপীড়ন শোষণ চলবে?
হাইকোর্ট তার রায়ে ফতোয়াকে অবৈধ এবং ফতোয়াদানকারীকে অপরাধী বলে উল্লেখ করেছে। আমরা চাই, এই রায় যেন কার্যকর হয়। ফতোয়া বন্ধ হবে। এজন্য প্রশাসন ও সমাজের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এই বিষবাষ্প যেন আর ছড়াতে না পারে। নারীকেও তার ভাগ্য জয় করতে নিজ উদ্যোগে সচেতন হতে হবে। নারীও তো মানুষ। আমরা ফতোয়ার অভিশাপ থেকে মানুষের মুক্তি চাই।
