খোলা মুখ, খোলা মন: দূর করুক দুঃসহ করোনাভাইরাস
কেউ কিছু না বললে, না লিখলে, না চিন্তা করলে যদি সমস্যার সমাধান হতো সত্যি লিখতাম না। কিন্তু রাষ্ট্র বা দেশ মানে কি আসলে? মানুষ আছে বলেই তো রাষ্ট্র। দেশ, সরকার সবই তার অংশ মাত্র। মানুষ না থাকলে কিছু থাকে না। আর আজ সেই মানুষ দেশে বিদেশে বড় অসহায়। আমরা বিশ্বাস করতাম এখনো মনে করি আমেরিকা দুনিয়ার সব দেশের চাইতে আগুয়ান। তাদের এক নাম্বার দেশ হিসেবে ভাবা হয়। সেখানকার হাল দেখুন। নিউইয়র্কের মতো শহর মৃত্যুপুরি। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে তাদের আস্থা, তাদের বিশ্বাস। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা মরছে পাখির মতো। ধসে পড়েছে আমেরিকার অর্থনীতি। যেকোনো দেশে মানুষের মৃত্যু বেদনার। বিশেষত প্রাণঘাতী এক ভাইরাস মোকাবেলায় ব্যর্থ পদ্ধতির জন্য মহা মূল্যবান জীবনের এমন হানি মানা যায় না। সাথে কি এটা ও বলা যায় না যে ট্রাম্পের মতো হামবড়া বদরাগী এক প্রেসিডেন্টও দায়ী? তিনি তার ব্যর্থতা ঢাকার জন্য একবার চীন একবার WHO কে দোষারোপ করছেন। কিন্তু একবারও বলছেন না আসলে কী করণীয় ছিলো বা কী কী করলে মানুষ করোনাভাইরাস ও আসন্ন অভাবের হাত থেকে বাঁচতে পারবে?
চীনের সরকারও দেখুন কেমন চুপ মেরে আছে। তাদের কথা শুনলে বা তাদের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় করোনাভাইরাস যেন সামান্য সময়ের অযাচিত মেহমান। কেন এই ভাইরাস বেইজিং, সাংহাই পর্যন্ত গেল না আর গেলে কী তার হকিকত কিছুই বলছে না তারা। এদিকে গোড়াতে রাশিয়া চাপা দিলেও এখন আর পারছে না। মৃত্যু ও সংক্রমণের হারে রাশিয়া টপকে গেছে অনেক দেশকে। দিনে দিনে গভীর সংকটের মুখে চলে যাচ্ছে পুতিনের রাশিয়া। প্রমাণ হচ্ছে ধামাচাপা দিলে আর যাই চাপা থাক সত্য বা মৃত্যু চাপা থাকে না।
অন্যদিকে আমাদের আবাসভূমি অষ্ট্রেলিয়া আর পাশের দেশ নিউজিল্যান্ডের দিকে দেখুন। এখানে এখন স্বাভাবিক পরিবেশ প্রায় ফিরে এসেছে। আমরা আমাদের কাজে ফিরে গেছি। এমন না যে এখানে সংক্রমণ ছিল না। শুরুতে মনে হচ্ছিল আমাদের এই ক্যাঙারুর দেশে পরিস্থিতি হয়ে উঠবে ভয়ংকর। শুরুতে সরকার তেমন পাত্তা দেয়নি বলে মনে হলেও পরে দেখলাম সময়মতো তারা ঠিকই তাদের কাজ শুরু করে। কাজগুলো খুব অসাধারণ কিছু না। তারা সঠিক সময়ে লকডাউন করে মানুষকে সাবধান করে কাজ শেষ করেনি। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ নামিয়ে মোটা অংকের জরিমানা করার বিধান দেয়ায় যুবক-যুবতীদের রোখা সম্ভব হয়েছে। জরিমানার পরিমাণটা শুনুন একবার। বাংলাদেশী টাকায় সাড়ে ছয় লাখ টাকার সমান। সাথে জেলে যাবার ভয়। এত বড় ঝুঁকি নেয়া কি সম্ভব না কারো বুকের পাটা আছে তা নেয়ার? ফলে মানুষ সাবধানে থাকতে বাধ্য হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের সরকার আরো এক কাঠি এগিয়ে। তারা শুরুতেই তাদের দেশের সবকিছু বন্ধ করে দেয়ায় করোনাভাইরাস সুযোগ পায়নি মানুষের ভেতরে ঢোকার। ফলে সংক্রমণ যেমন দানা বাঁধেনি তেমনি মৃত্যুর হারও কম। যে কারণে এই দুই দেশ এখন সারাবিশ্বের রোল মডেল হয়ে উঠছে। কিন্তু তারপর ও তারা থামেনি। বারবার বলা হচ্ছে সাবধান না হলে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না। আর তা হবে ভয়াবহ।
দেশের কথায় আসি। সবার জানা আছে বাঙালি এমন এক জাতি বাধ্য না হলে কখনো নিয়ম মানে না। তা এই বাধ্য করার কৌশল কী? দমন নিপীড়ন বা জুলুমের জন্য সবসময় গালি খাওয়া সরকার আর পুলিশ হাতে পায়ে ধরে থামাতে পারছে না বাঙালিকে। আমার মনে হয় মোটা অংকের টাকা জরিমানা আর জেল দিলে সমস্যা হয়তো কিছুটা লাঘব হতো। জানি না কেন তা করা হচ্ছে না। এদিকে আমরা দেখছি রোজ হু হু করে বানের পানির মতো বাড়ছে সংখ্যা, বাড়ছে সংক্রমণ। যখন এই লেখাটা লিখছি আমার জন্মভূমি চট্টগ্রামের প্রাক্তন মেয়র মহিউদ্দীন আহমেদের পত্নীসহ তাদের বাড়ীতে তিন জন আক্রান্ত। আক্রান্ত হয়েছেন সাংবাদিক নাসির ভাইয়ের কন্যা। আরো কত যে লুকিয়ে আছে কে জানে! এ এক ভয়াবহ দানব। ওৎ পেতে আছে চারদিকে। কিন্তু সাধারণ নিয়মটাই মানুষ মানছেন না। কেন তারা এমন করছেন? মৃত্যুর আর কম বলে কি আমরা আজরাইল কে বাড়িতে ডেকে আনব?
খুব স্বাভাবিক নিয়মে রাজনীতিকরা ব্যর্থ। কোনো দলের কোনো নেতাকে আমরা মাঠে দেখি না। তারা হয়তো বলবেন করোনাকালে আমরা কি মরতে যাবো? বুকে হাত দিয়ে বলুন, গোপনে একবার কি শপিং এ যাবেন না? না করেননি কোনো বাজার? কেউ বলছে না জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু করতে। স্বাভাবিক নিয়মে পাশে দাঁড়ানোর কাজের বদলে এখনো চলছে নিন্দার ঝড়। পরস্পরের বিরুদ্ধে গলাবাজী। আচ্ছা এটা ভাবা কি অন্যায় হবে যে সব দল মিলেই রাজী কিছু বলা লেখা বন্ধ হোক? অন্তত এই একটি কাজে হয়তো তারা ঐক্যবদ্ধ। তাতে সবার সম্মান বাঁচবে। কিন্তু মরবে সাধারণ মানুষ। আমেরিকার মতো গণতন্ত্রের নামে বড়াই করা দেশে কালো মানুষ আর ওয়ার্কিং ক্লাসের মানুষ মরছে বলে কারো তেমন মাথাব্যথা নাই। আমাদের দেশে শেখ হাসিনা আন্তরিক বলে মানুষকে তিনি নানাভাবে সামলে রেখেছেন এখনো। কিন্তু অজানা কারণে সবকিছু কেমন ঢিলেঢালা।
স্বাভাবিক ভাবেই আমরা উদ্বিগ্ন। একটা পজিটিভ বিষয় অবশ্যই বলবো যে মানুষ কিনতু ভয় পেয়েছে। সে ভয়কে আরো অনেক কিছুর মতো প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারেনি সমাজ। প্রতিটি মিডিয়া তাদের সাধ্যমতো প্রচার করলেও কোথাও দানা বাঁধেনি। শুধু যদি পেটের দায় আর বাঁচার জন্য এমনটা হতো তবে যাদের মাঠে দেখছি তাদের বেশির ভাগের চেহারায় কিন্তু অভাবের ছাপ নাই। বরং মনে হতে পারে যেন মজা দেখার জন্য হাটে-মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। এই প্রবণতা এখনই বন্ধ করা দরকার। সত্যি বন্ধ করতে না পারলে কিন্তু এতদিনের ঘরে থাকা এত সংযম সব নষ্ট হয়ে যাবে। এখন আর এ কথা বলার অবকাশ নাই আমরা সংক্রমণে পিছিয়ে। উপমহাদেশের দেশগুলি এখন ভয়াবহ বিপদের মুখে। ভারত পাকিস্তান হিমশিম খাচ্ছে সামাল দিতে। আমাদের লড়তে হবে একা। এই যুদ্ধে কেউ কারো না। এটা যার যার নিজেদের যুদ্ধ। বাংলাদেশ এটা জানে কিন্তু মানে না।
শুরুতে বলছিলাম আমাদের দেশে একটা রোগের নাম ভয়। সবাই যার যার জায়গা থেকে ভয় পাই আমরা। কোনো কারণ নাই সবকিছু'র জন্য সরকারকে দায়ী করার। তারা তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্তরিকতাও দেখতে পাচ্ছি আমরা। তাহলে কেন মানুষ বলতে পারবে না? লিখতে পারলে, বলতে পারলে বরং সাবধানতা বাড়বে। সজাগ করা সহজ হবে। গুজব, অকারণ উস্কানি আর মিথ্যা বাদে মানুষকে ভয়মুক্ত রাখুন। এতে সবার লাভ। বাংলাদেশে কিভাবে এই ক্রান্তিকাল পেরুবে তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ। মুখবন্ধ সমাজ মুখবন্ধ মানুষের। এই সময় যদি প্রাণের আকুতি, মনের ভয়ও জানাতে না পারে বাঁচবে কী করে সবাই?
