২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

একাত্তরে শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মদান

বেবী মওদুদ

Published : 13 Dec 2011, 09:29 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:52 PM

১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতি যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত তখন নরঘাতক পাকিস্তানি সেনাধ্যাক্ষ জেনারেল রাও ফরমান আলী ও জেনারেল নিয়াজীর নির্দেশে রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সহায়তায় পাক সেনারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। এরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, কবি-সাহিত্যিক। মধ্যরাতে রাতের অন্ধকারে খুব গোপনে এদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুম থেকে তুলে চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে সৈন্যদের গাড়িতে তুলে রায়ের বাজারে জলাভূমি ইটের ভাটায় খোলা স্থানে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এই নৃশংসতা, এই পাশবিকতার নজীর পাওয়া যায় না পৃথিবীর ইতিহাসে। ইতিহাসে হিটলার ও তার বশংবদদের দ্বারা ব্যাপক হত্যার কথা আমরা জানি । কিন্তু বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এই হত্যা সব কিছুর উর্ধ্বে। পাক সেনাদের গণহত্যার অধ্যায়ে এই হত্যাকাণ্ড তাদের বিবেকহীনতা ও পৈশাচিকতার পরিচয় তুলে ধরে। তাদের পাষান হৃদয় কারবালার এজিদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সভ্যতার ইতিহাসে এই গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া ও তার দোসরদের ক্ষমা করা যায় না। সেই সঙ্গে বেঈমান বিশ্বাসঘাতক গোলাম আযম-নিজামী গং যারা এই হত্যার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল তাদেরও বিচার এবং শাস্তি হওয়া উচিত।

এইসব অমৃতের সন্তান বাঙালির পরম স্বজন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সাংবাদিক নিযামউদ্দীন আহমেদ, আলতাফ মাহমুদ, নূতন চন্দ্র সিংহ, সাংবাদিক ডাঃ ফজলে রাব্বী, ডাঃ গোলাম মর্তুজা, ডাঃ আলীম চৌধুরী, মুহম্মদ আখতার, সেলিনা পারভীন ছিলেন অন্যতম। অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানও মীরপুরের বিহারী এলাকায় নিখোঁজ হন। এছাড়া ২৫ শে মার্চ রাতে দখলদার পাকসেনারা গণহত্যার নীলনকশা অনুযায়ী শুধু ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষ হত্যা করেনি, বস্তিতে বস্তিতে আগুন ধরিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের রোকেয়া হলসহ প্রতিটি হলে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী হত্যা করেছে। শিক্ষকদের আবাসিক ফ্ল্যাটে গিয়ে তাদের অনেককে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে দার্শনিক অধ্যাপক জি.সি. দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ডাঃ মনিরুজ্জামান অন্যতম। মধুদা ও অন্যান্য কর্মচারীদের কথাও স্মরণ করছি। জগন্নাথ হলের সেই লোমহর্ষক ছাত্র হত্যার চিত্রটিও আমি ভুলতে পারি না। কবি মেহেরুন্নেসাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে হত্যা করেছিল মীরপুরের বিহারীরা। তিনি সেখানে বসবাস করতেন।

বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু করে রাখার একটা অপচেষ্টা ছিল জেনারেল ইয়াহিয়া ও তার সহযোগীদের। জেনারেল টিক্কা খান কসাই খেতাবে পরিচিত হয়ে ছিলো পাকসেনাদের মধ্যে। ইয়াহিয়া তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর করে পাঠায় এবং গণহত্যার নীলনকশা অনুযায়ী সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিল। ২৫ মার্চ রাতেই সে বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈন্য পাঠিয়ে যে গণহত্যার সূচনা করে তার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষক ও ছাত্রদের হত্যা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে তোলা। কিন্তু হলগুলো ছিল প্রায় ছাত্রশূন্য। ফলে কিছু সংখ্যক ছাত্র সেদিন নিহত হয়। শিক্ষকরাও আবাসিক এলাকায় খুব আতঙ্কসহ রাত কাটান। সেনারা ঘরে ঘরে গিয়ে কলিং বেল টিপে, নাম ধরে ডেকে এনে হত্যা করে। অনেকে ঘরে তালা দিয়ে অন্যত্র সরে যান অথবা দরোজা খোলেন নি।
২৫ মার্চ হত্যার ঘটনায় আমরা ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম, ডঃ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং কবি সুফিয়া কামালের নাম শুনতে পাই। পরে জানা যায় তারা জীবিত আছেন এবং ডাঃ মনিরুজ্জামান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎসক। ডঃ মনিরুজ্জামান দীর্ঘ নয় মাস আত্মগোপন করে থাকেন এবং টিক্কা খানের নির্দেশে তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর তার বরখাস্ত আদেশ বাতিল করা হয়। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে সেনা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নেয়, তবে তাকে ঢাকায় থাকতে নির্দেশ দিয়ে ছেড়ে দেয়।

দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ অফিস ২৫ মার্চ রাতেই পুড়িয়ে দেয়। কবি শহীদ সাবের সংবাদ অফিসে থাকতেন এবং সেখানেই নিহত হন।

তারা ২৫ মার্চ রাতে যাদের হত্যা করার সুযোগ পায়নি, তাদের হত্যা করেছিল ১৪ই ডিসেম্বর। তাদের নেতৃত্বাধীন শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল শামস-এর সদস্যদের দিয়ে এইসব কৃতি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে রায়ের বাজারের খালের ধারে হত্যা করে ফেলে রাখে। অনেকের চেহারা বিকৃত করে দেয় যাতে শনাক্ত করা না যায়।

১৬ ডিসেম্বর পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পনের পর এদের খবর পাওয়া যায়। অপরাধী ঘাতকরা তার আগেই আত্মগোপন করে, কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এইসব কৃতি বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তারা নয় মাস ঢাকায় অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাঙালির বিজয় অর্জন মেনে নিতে পারেনি বলেই হিংস্র ঘাতকের দল দেশের কৃতি সন্তানদের এমন নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।

১৪ ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা স্মরণ করি এই সব মহান শহীদদের। তাদের প্রতি আমাদের সুগভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাদের আত্মত্যাগ আমাদেরকে দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত করে যাবে চিরকাল।

বেবী মওদুদ: লেখক ও সাংবাদিক।