আমরা কেউ খারাপ নই
সাম্প্রতিক সময়ে ইভ টিজিং ও আত্মহত্যা প্রবণতা দেখে বেদনাহত হতে হয়। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ কোথায় নেমে গেছে। আমাদের মধ্যে যে সম্প্রীতি, শান্তি ও সংস্কৃতির একাত্মতা ছিল তার মধ্যে ঘাটতি লেগেছে কী? আমাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পারিবারিক শিক্ষা দিতে কী ব্যর্থ হচ্ছি? এ প্রশ্নগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয়।
প্রতিদিন খবরের কাগজে সংবাদ পড়তে হচ্ছে বখাটেরা স্কুলছাত্রীদের উত্যক্ত করে, স্কুল-কলেজ যাওয়া আসার পথে। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমও হয়, পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করে। কোথাও কোথাও পরিবারে জানাজানি হলে তখন বকাঝকা দেওয়া হয় মেয়েটিকে। মেয়েটি হতাশাগ্রস্থ হয়ে একদিন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ছেলেটাও আত্মহত্যা করে, তবে সংখ্যা কম। সম্প্রতি পুলিশ কিছু বখাটে গ্রেপ্তার করে, তাদের শাস্তি দেয়া হয় সাতদিনের সশ্রম কারাদণ্ড।
আমরা বখাটে বলতে কাদের বুঝি? পরিবারে উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেটি, বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বোঝা হয়ে থাকা ছেলেটি, অথবা মাদকে আসক্ত ছেলেটি? এরা ছাড়াও বখাটে আছে আমাদের আশেপাশে। তারা লেখাপড়াও করে, পাশও করে, বাবা-মায়ের অর্থ-বিত্তও আছে। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি বসে লেখাপড়া করছে। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক যেমন গড়ে ওঠে, তেমনি প্রেমের সম্পর্কও গড়াতে সময় লাগে না। প্রেম তো স্বাভাবিক বিষয়। চিরন্তন সত্য। একে মোটেও খারাপ দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা ঠিক নয় বরং সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে কোমলমতি ছেলেমেয়েরা বিপদে না পড়ে। তাদের জীবনটা যেন নষ্ট না হয়।
বর্তমানে যে সময়টা আমরা অতিবাহিত করছি তা অত্যন্ত অস্থির সময়। সেই একান্নবর্তী পরিবার নেই, সবাই ভিন্ন সত্তা নিয়ে বসবাস করি। ফলে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকেই না। তারপর বাবা-মা, চাকুরি, ব্যবসা, পার্টি-অনুষ্ঠান ইত্যাদি নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকে যে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে প্রতিদিন মুখ দেখাদেখিও হয় না। ফলে মমত্ব, ভালোবাসা ও আস্থার স্থানটি নষ্ট হয়ে যায়। যেখানে বাবা-মা ছেলেমেয়ের অভিবাবক হিসেবে তার সুখ-দুঃখ, আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গী হবে সেখানে আমরা তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করলে কি ভুল হবে? ছেলেমেয়েকে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করলেও উদারভাবে তাকে স্বাধীনতাও দেয়া দরকার। তবে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সে কোথায় যাচ্ছে, কারা তার বন্ধু, তাদের পরিবারই বা কেমন ইত্যাদি। একেবারে শিশুকাল থেকে সে যদি মা-বাবাকে আপনজন ভাবতে শেখে, তার সঙ্গে সব কথা বিনিময় করে, সু-পরামর্শ নেয় তাহলে সেটা তার সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। মা-বাবা ছাড়া শ্রেষ্ঠ বন্ধু আর কে হতে পারে সন্তানের কাছে? কিন্তু সে যদি মা-বাবার মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতি দেখে, অনৈতিক আচরণ দেখে তাহলে বড় নিঃসঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের পরিবারে ও সমাজব্যবস্থায় যে মূল্যবোধগুলি ছিল, তা এখন অচল হয়ে গেছে। অর্থ-বিত্ত-স্ট্যাটাস নিয়ে এতো বেশি অস্থির থাকি যে, ছেলেমেয়েদের অবহেলা-অযত্ন করি শুধু নয়, মানসিক-শারীরিক, নির্যাতনও করে থাকি। তারা অবস্থার শিকার হয়ে কোনো খারাপ কাজ করে ফেললেও তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে চাই না। পরামর্শ-পরিচর্যার মাধ্যমে তার পাশে থাকতে পারি না। এখানেই তার ক্ষতি হয়।
যে কোনও দেশের যুব সমাজ হচ্ছে একটা বড় শক্তি। তারাই গড়ে তুলবে ভবিষতের সমাজ। তাদের মেধা ও শ্রম শক্তি দিয়ে দেশের উন্নয়ন ঘটাবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। সেই বিষয়টি চিন্তা ভাবনা করেই তাদের জন্য শিক্ষা ও বিনোদনের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ছেলেমেয়েদের শৈশব-কৈশোর থেকে মুক্ত মনের অধিকারী করে তুলতে হবে। তার চারপাশের জগৎ, মানুষজন এবং নিজস্ব সংস্কৃতির শিক্ষা দিতে হবে। তার কাছে কোনো কিছু গোপন রাখা ঠিক নয়। জীবনকে জানতে ও উপভোগ করতে হলে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এটা তাকে জানাতে হবে এবং উপলব্ধি করাতে হবে। ভালোবাসা বা প্রেম কোনো খারাপ বিষয় হতে পারে না, তবে তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে হবে, এই শিক্ষাটা তাকে দিতে হবে।
আর যাদের আমরা বখাটে, উত্যক্তকারী, মাদকসেবী বা উচ্ছন্নে যাওয়া বলি, তারা তো আমাদেরই সন্তান। পরিবারে ও সমাজেই তার অবস্থান ও জীবনযাপন। তাকে কেন স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে আমরা জয় করবো না? কেন তাকে অবহেলা অযত্ন করে অনৈতিক পথে ঠেলে দেব? তাকে কেন ক্ষয় হতে হতে ধ্বংস করে ফেলবো? আমরা যতই আইনের কথা বলি, শাস্তি দাবি করি–আসলে কিন্তু দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের। পরিবারে-সমাজে ছেলেমেয়েদের পরস্পরকে জানার সুযোগ দিতে হবে, শিক্ষাও দিতে হবে। সে যখন তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সবার প্রতি সহমর্মী হবে, একাত্মবোধ করবে, তখন নিশ্চয় একজন নীতিবান মানুষ হবে। তার মধ্যেও নিশ্চয় মানবিক গুণ জাগ্রত হবে।
এই পরিবার ও সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে দেশের সচেতন ব্যক্তিত্ব যারা আদর্শ ও নীতিবান, তাদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটা ঐতিহ্য আছে। আমাদের কিশোর ও তরুণ সমাজের মধ্যে তার চর্চা ও বিকাশ ঘটাতে হবে। কেননা তারাই এই সমাজ ও দেশের ভবিষ্যত নাগরিক। আমার মনে হয় কেউ খারাপ নয়। খারাপ চিন্তা ও পথকে উপড়ে ফেলতে হবে। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে অনেকে খারাপ পথে চলতে বাধ্য হয়। সমাজে দুর্নীতি, দুঃশাসন বন্ধ করতে হবে। জনকল্যাণমূলক সরকার পারে সমাজ ও মানুষকে সকল কলুষতা থেকে দূরে রাখতে। মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি রক্ষা করাটাই তার দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থানে থেকেও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাটা করলে নিশ্চয় জীবনে সফল হওয়া যাবে।
