অচেনা ভারত
ভারতে আকর্ষিত হয়নি, এমন ব্যক্তি কম। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে এসেছেন পর্যটক, বণিক, প্রায় সব ধরনের মানুষ। কেউ সম্পদের খোঁজে, কেউ আধ্যাত্মিকতার খোঁজে, কেউ-বা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের খোঁজে। ভারত কাউকে বিমুখ করেনি।
১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত, ভারত স্থিতিশীল থেকেছে, পাকিস্তানি নয়। ভারতের কংগ্রেস নেতারা গণতন্ত্রের একটি ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন, বহুত্ববাদ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ১৯৪৭ সাল থেকেই অস্থির সময় পার করছে। আমলাতান্ত্রিক শাসন তারপর থেকে সামরিক শাসন। বহুত্ববাদে বিশ্বাসী নয় পাকিস্তান। এখন জঙ্গি মৌলবাদ তাদের বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তান প্রায় ব্যর্থ এক রাষ্ট্র। তখন ভারতের বৈভব ও শক্তি এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধির দাবি তুলতে তারা পিছপা হয়নি।
আমরা যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে বড় হয়েছি, এ পার্থক্য আমাদের সহজে নজরে পড়ে। আমাদের জেনারেশন ভারতকে পরম বন্ধু মনে করে শুধু ১৯৭১এর জন্য নয়, সহিষ্ণু জনগোষ্ঠীর জন্য। আমরা বড় হয়েছি এক অসহিষ্ণু পরিবেশে যেখানে ধর্মকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে আমরা মনে করি, অসাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্রের মূলনীতি না হলে সে রাষ্ট্রের পক্ষে আধুনিক পৃথিবীতে স্থান করে নেওয়া মুশকিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতার আলোকে, সংবিধানের চারটি মূলনীতি যোগ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছিলেন। এ ধরনের সংবিধান শুরুতে কোনো রাষ্ট্রই গড়ে তুলতে পারেনি।
১৯৭৫ সালের পরের ইতিহাস সবার জানা। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া, নিজামী যারাই ক্ষমতায় ছিলেন তারাই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়েছেন, দেশত্যাগ করেছেন। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরাট অংশও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ফিরিয়ে এনেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা এখন রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি যদিও এরশাদ কর্তৃক প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বর্তমান। গত ৩০ বছরে সাম্প্রদায়িকতা ভিত্তি পেয়েছিল; এখন আবার তা দূর করে ১৯৭১এর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজটি অব্যাহত এবং আশার কথা তরুণরা এই নীতিতে বিশ্বাসী।
এটা ঠিক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষ হলে সবই অসাম্প্রদায়িক হয়ে যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় আছে তাদের দর্শনটি কী? সব নির্ভর করে শিক্ষা-সংস্কৃতি জনগোষ্ঠীকে কীভাবে গড়ে তুলছে। ইংল্যান্ডে খুব সম্ভব ব্ল্যাসফেমি আইন এখনও টিকে আছে, কিন্তু জনগোষ্ঠীর জীবনচর্চা এমন যে, দেশটির পক্ষে সাম্প্রদায়িক হওয়া সম্ভব নয়। এই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা অনেকাংশে আমরা পেয়েছি কংগ্রেস ও বামপন্থী রাজনৈতিক দল থেকে। কেননা, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মূলনীতি আমাদের প্রভাবিত করে।
২০০৬ সালের নির্বাচনের আগে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় আমরা শঙ্কিত হয়েছি। কারণ, ক্ষমতায় তখন বিএনপি-জামায়াত। ঐ সরকার এথনিক ক্লিনজিং [বা হিন্দু-খেদানো] শুরু করেছিল। বিজেপি সরকারও এতে আপত্তি করেনি। জেল-জুলুম সহ্য করেও তখন আমরা অসাম্প্রদায়িক আদর্শ তুলে ধরেছি। পরে কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসায় আমরা নিশ্চিন্ত হয়েছি। এবারও যখন বিজেপি ক্ষমতায় আসে, আমরা আশঙ্কা করছিলাম বিএনপি-জামায়াতের উত্থান হবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পুরনো নীতি নরেন্দ্র মোদি বদলাননি। এতে আমরা স্বস্তি পেয়েছি।
এখন আমরা আবার শঙ্কিত। প্রতিদিন খবরের কাগজে ভারত-সম্পর্কিত যে সব খবর ছাপা হচ্ছে তাতে বিস্মত হচ্ছি। বহুত্ববাদের ভারত এখন কি একত্ববাদের দিকে যাচ্ছে? ভারতীয়রা তা মেনে নিচ্ছে? নেপালের মতো দেশ রাজতন্ত্র ছুঁড়ে ফেলে, হিন্দুরাষ্ট্রের আলখেল্লা ছেড়ে যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে ধরছে, সেখানে ভারত সাম্প্রদায়িকতা তুলে ধরছে। আজ একুশ শতকে। এ ভারত আমাদের অচেনা।
এ কথা ভাবতে পারি না, যেখানে ভারতীয় মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত নিজেদের আধুনিক মনে করে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে, সেখানে তারা গরুকে দেবতা শুধু নয়, গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে! অথচ মদ বা শূকরের মাংস নিষিদ্ধ নয়। গরুর মাংস ফ্রিজে রাখা হয়েছে এই গুজব তুলে একজনকে মেরে ফেলতে পারে। ভারতে প্রাচীনকালেও যে সব পর্যটক এসেছেন তারাও এ রকমটি কখনও ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ।
আমরা, এই ক্ষুদ্র বাংলাদেশে, যেখানে দাঙ্গা হয়েছে (ভারতের মতো), সাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিপালিত হয়েছে, সেখানেও জোর প্রতিবাদের কারণে তা হটে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ভারতে যেখানে প্রতিবাদ আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে এসেছেন, কিন্তু রাজনীতিবিদরা বা সাধারণ মানুষ?
আমাদের শঙ্কার কারণটি ভিন্ন। ভারতের মানুষ গরু নিয়ে, মুসলমানদের নিয়ে যা করছেন তাতে মনে হয় এ ধারা যদি চলতে দেওয়া হয় তাহলে ভারত-পাকিস্তানে তফাৎ কমে যাবে। দ্বিজাতি-তত্ত্ব আবার 'সত্য' বা 'ঠিক' বলে প্রমাণিত হবে। উপমহাদেশে এর অভিঘাত হবে প্রচণ্ড। ১৯৪৭ সালের মতো ফের শরণার্থী বা অভিবাসী স্রোত বয়ে যাবে। মুসলামদের যেতে হবে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে, হিন্দুদের ভারতে অথবা নেপালে আর বৌদ্ধদের শ্রীলংকায়। খ্রিস্টানদের কী অবস্থা হবে জানি না।
বিজেপির নীতির সমালোচনা বা বিরোধিতা করলে সেটি দেশদ্রোহিতার সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। বাইট টু ডিসেন্টের অধিকার হ্রাস পাচ্ছে। কথায় কথায় বিজেপি নেতারা এখন শুধু মুসলমানদের নয়, হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদেরও পাকিস্তানে চলে যেতে বলছেন। কিন্তু এখন সমস্ত জায়গা থেকে হিন্দু বিতাড়ন হলে কী হবে?
সত্যি বলতে কী, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের অন্য কোথাও এখন যেতে হলে আমাদের মতো 'বিধর্মী'দের দুবার ভাবতে হবে। দিল্লি বা বিহারের জয় ভয় ভাঙ্গাবার জন্য যথেষ্ট নয়।
আমি ভিন্ন দেশের নাগরিক হয়েও মনে করি, ভারত সরকারের বর্তমান অভ্যন্তরীন নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। আরএসএস যদি ভারত চালায় তাহলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমাদের এখানে জামায়াতকে খালেদা টেনে এনে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। এ ধরনের দল অন্তিমে কী করতে পারে সে অভিজ্ঞতা ভারতীয়দের নেই। আমাদের আছে।
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যে সব রাজনৈতিক দল যুক্ত থাকে স্বাধীনতার সঙ্গে, তাদের দেশের প্রতি একটি প্রগাঢ় টান থাকে। যারা থাকেনি তাদের এ টান থাকার কথা নয়। যেমন, আমাদের বিএনপি-জামায়াত। দেশের ক্ষতি তারা যা করতে পারে অন্য কেউ তা পারে না। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএসের কোনো অবদান নেই। উপমহাদেশে এখন শান্তি-বিঘ্নকারী হিসেবে যেমন পাকিস্তান পরিচিত, তখন ভারতও সেই পরিচয়ে পরিচিত হবে।
আমাদের জেনারেশন সে ভারত চায় না। আধুনিক ভারত পেছন দিকে যেতে পারে না। কারণ, হিন্দু জাতীয়তাবাদকে অতিক্রম করেই ভারতের সৃষ্টি। ইতিহাসের চাকা অন্যদিকে ঘোরানো যায় না।
যারা ভারতে আছেন, তাদের হয়তো মনে হতে পারে, এসব রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী। দূর থেকে আমাদের মনে হচ্ছে তা নয়। আফগানিস্তানেরও প্রথমে তালেবানদের প্রগতিশীল মনে হয়েছিল। জীবনচর্চায় হিন্দুত্ববাদ যদি প্রবল প্রশ্রয় পায় তাহলে সাম্প্রদায়িকতার পথ পরিহার করা মুশকিল হবে।
আমরা চাই, যে কোনো মৌলবাদ তা হিন্দু-ইসলামি যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই মৌলবাদ পরে জঙ্গি মৌলবাদে পরিণত হবে এবং তা অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে প্রবল অভিঘাত হানবে।
আমরা যারা এই উপমহাদেশে আছি তারা আরেকটি পাকিস্তান চাই না। আমরা পাকিস্তানিকরণের বিরুদ্ধে লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছি এবং তা জোরদার হচ্ছে। পাকিস্তানি প্রভাব ভারতে পড়বে এবং জোরদার হবে এটি কল্পনা করাও কষ্টকর। কিন্তু হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানই কি জিতে যাবে? ভারতকে তা আবার ভাবতে হবে। আমরা সাধারণ ভারতীয়দের ওপর এই আস্থা রাখতে চাই যে, তারা ভারতের পাকিস্তানিকরণ রুখবেন। প্রয়োজনে সরকার বদলে ফেলবেন।
আমাদের পাশে সেই চিরচেনা ভারত চাই, এই অচেনা ভারত নয়।
