সদাশয়, না ভোটকে ‘হ্যাঁ’ বলুন
নাগরিকরা দলদাস নয়। তারা সার্বভৌম। নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নে অধিকার না থাকলেও প্রার্থী নির্বাচনে তাদের রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। এমন মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার মতো মানুষের অভাব হয়তো নেই, তবে এ কথাও সত্য যে নাগরিক ভোটারদের সামনে যখন একজন বেশি খারাপ এবং একজন কম খারাপ প্রার্থীর মধ্যে একজনকে নির্বাচন করতে বলা হয় আর তার সামনে অন্য কোনো উপায় খোলা থাকে না– তখন অগত্যা ভোটটি নষ্ট না করে কম খারাপ প্রার্থীকেই বেছে নিতে হয়। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নয়টি নির্বাচনে ব্যত্যয়হীনভাবে এই ঘটনারই পুনঃ পুনঃ প্রয়োগ দেখে আসছি।
গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে কখনও কখনও সংস্কারের পথে হাঁটে, তারই এক সাম্প্রতিক নজির আমরা দেখলাম ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রায়ে। নির্বাচনে লড়া কোনো প্রার্থীকেই পছন্দ না হলে ভোট দিয়ে সেই মত প্রকাশের অধিকার ভোটারদের হাতে তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট।
ভারতের শীর্ষ আদালত ২৭ সেপ্টেম্বরে এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-এ "উপরের কোনো প্রার্থীকেই নয়" বলে একটি বোতাম বা প্রতীক চিহ্ন রাখতে হবে, যে বোতাম টিপে বা প্রতীকে ছাপ দিয়ে ভোটার নিজের অনাস্থা নথিভুক্ত করতে পারবেন।
এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থী আর পেশিশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছেন। এই রায়ের প্রেক্ষিতে পাঁচ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেই ইভিএম-এ এমন বোতাম রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
'পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ' (পিইউসিএল) নামে একটি বেসরকারি সংস্থার চার বছর আগে করা মামলায় রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পি সদাশিবমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রায়ে জানায়, কোনো প্রার্থীকেই ভোট না দিয়ে তাদের প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে নাগরিকদের। প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে যারা সন্তুষ্ট নন, এই প্রক্রিয়া চালু হলে তারাও ভোটদানে উৎসাহী হবেন।
গ্রীস, যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা রাজ্যসহ বিশ্বের তেরোটি দেশে এই 'না-ভোট' ব্যবস্থা কার্যকর রযেছে। এই ব্যবস্থা চালু হলে রাজনৈতিক দলগুলি স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিকে প্রার্থী করতে বাধ্য হবে বলে মনে করে সুপ্রিম কোর্ট।
যদিও ভারতীয় সংবিধানের নির্বাচন পরিচালনা বিধি (১৯৬১)-র ৪৯ ধারা অনুসারে না ভোট দেওয়ার অধিকার ভোটারদের আগেও ছিল। তবে সে অধিকার প্রয়োগ করতে ভোটারকে বুথে এসে প্রিসাইডিং অফিসারকে তা অবহিত করতে হয় এবং একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে তাতে সই করে জমা দিতে হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত সে পদ্ধতিতে ভোটারের নাম ও পরিচয় গোপন থাকে না। কিন্তু ইভিএম বা ব্যালটে 'না-ভোট' চিহ্ন চালু হলে ভোটারের নাম-পরিচয় গোপন থাকবে। অনেক নির্বাচকই প্রার্থীদের প্রতি অনীহায় ভোট দিতেই আসেন না। নতুন এ ব্যবস্থা সেই অসন্তোষ নিরসনের উপায় হিসেবে বোতাম টিপে অনীহা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে সব প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের শেষে ভোটযন্ত্রে আরও একটি বোতাম যুক্ত হবে যাতে লেখা থাকবে, 'উপরের কোনো প্রার্থীকেই নয়'। ভোটার যদি কোনো প্রার্থীকেই যোগ্য বলে মনে না করেন, তাহলে শেষের বোতামটি টিপে নিজের মত জানাতে পারবেন।
সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে একাধিক সুশীল সংগঠন। তাদের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রেই এমন লোককে প্রার্থী করা হচ্ছে, যাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। এই রায় সেই সব অযোগ্যদের নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হবে। 'প্রোটেস্ট ভোট'-এর বিধান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে মুখে স্বাগত জানিয়েও ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির সংশয়মিশ্রিত অভিনন্দন জানানোর ঘটনা থেকে বোঝা যায় তারা সর্বান্তকরণে এই রায় গ্রহণ করতে পারেনি।। কারণ সামনেই, পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন, এর আগে এমন রায় চিন্তায় ফেলে দিয়েছে সব দলকেই।
তবে যেহেতু রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, অর্থ ও পেশীবল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই রায় দেওয়া হয়েছে, তাই প্রকাশ্যে কোনো দলের পক্ষেই এর বিরোধিতা করা কঠিন। যদিও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী বিজেপির নরেন্দ্র মোদী এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
আর সাবেক সাংসদ তথা পিডিএসের রাজ্য সভাপতি সৈফুদ্দিন চৌধুরী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "২০১১ সালের নভেম্বর মাসেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে দাবি করেছিলাম, ভোটদাতাদের কোন প্রার্থীকেই উপযুক্ত মনে না হলে ভোট না দেওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।"
রাশিয়ায় না-ভোট প্রথার কারণে ১৯৯১ হালে কমিউনিস্ট পার্টির পরাজয় ঘটেছিল, ক্ষমতা নিয়েছিল বরিস ইয়েলেৎসিনের দল। যদিও পরবর্তীতে রাশিয়া এই প্রথা বাতিল করে।
আমাদের দেশে না-ভোট প্রথা চালু করেও বাতিল করার পর পুনরায় চালুর স্বপ্ন মনে হয় প্লেটোনিক রাজনৈতিক অভিলাষ।
না-ভোট প্রদান সংক্রান্ত রায় প্রকাশিত হওয়ার পর পরই বাংলাদেশের সুশীল সমাজ ও সংগঠনগুলো যারা নির্বাচন বিধি, আইন সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে তারাসহ সচেতন নাগরিকগণের মাঝে ২০০৯ সালে বাতিল করা না-ভোট সংক্রান্ত আইন নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না-ভোট বিধান করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে ৪২ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী এনে না-ভোটের বিধান সংযোজন করা হয়েছিল। সংশোধিত আদেশের ৩১(৫)(খ খ) অনুচ্ছেদের বিধান ছিল, যদি নির্বাচক বা ভোটার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোনো প্রার্থীকেই ভোট দিতে না চান, তবে তিনি 'উপরের কোনো প্রার্থীকেই না লিখিত স্থানে নির্ধারিত ছাপটি দিবেন'।
না-ভোটের বিধানের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ভোটারের উপস্থিতি বেড়ে গিয়েছিল এই বিধানের কারণে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয় তাতে জানা যায়, সব আসনেই না-ভোট পড়েছিল।
মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন ভোটারের মধ্যে না-ভোট দিয়েছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬১৫ জন। না-ভোট পড়েছে মোট ভোটের ০.৫৫ শতাংশ। এক আসনে সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৬৪টি না-ভোট পড়েছে রাঙামাটিতে। ঢাকার আসনগুলোতে না-ভোট পড়েছে ৭০ হাজার।
ভোটারকে তার ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে না-ভোটের বিধান সংযোজন করা হয়েছে– এই মর্মে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রচার চালানো হয়। কোনো ভোটারের যদি কোনো প্রার্থীকেই পছন্দ না হয়, তাহলে ব্যালট পেপারে না-ভোট প্রকাশের মাধ্যমে তিনি তার পছন্দের প্রতিফলন ঘটাতে পারেন।
নির্বাচন কমিশন ভোটাধিকার প্রয়োগের দুটি দিক উল্লেখ করেছিল। এক, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া; দুই, কোনো প্রার্থীকে পছন্দ না হলে না-ভোট দেওয়া। পঞ্চাশ শতাংশের বেশি না-ভোট কোনো আসনে পড়লে সেই আসনে পুননির্বাচন করার বিধানও রাখা হয়েছিল।
তবে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধিত), ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে উত্থাপনের সময় না-ভোটের বিধান বাতিল করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ১৪ জুলাই না-ভোটের বিধান পুনরায় চালুর সুপারিশের কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা। নির্বাচনী ব্যয়ের অজুহাত দিয়ে না-ভোটের বিধান পুনরায় চালু করা হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বার বার বলা হচ্ছে ।এর প্রতিফলন হিসেবে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) গত মাসে যে গুচ্ছ প্রস্তাব দেয় তার ২ নম্বর প্রস্তাবটিই না-ভোট বিধান চালু সংক্রান্ত। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এগুলো ইসিতে পাঠিয়ে লাভ নেই। সংসদ এ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা প্রস্তাবগুলো সংসদে পাঠাব।
নির্বাচন গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। ভোট দিয়ে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে। ভোটারগণ যাতে সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন সেজন্য প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্যপ্রাপ্তি অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি ভোটারদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
'না-ভোট' বা 'ওপরের কাউকে নয়' এমন একটি মৌলিক মতামত প্রকাশের আয়োজন নির্বাচনকালীন সরকারের একটি সাংবিধানিক দায়। সরকার, বিরোধী দল কিংবা সাধারণ জনগণ সবারই কমন রেফারেন্সের বিষয় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তবে তা যেন এখনও একাডেমিক চর্চার বিষয় হয়েই রয়েছে।
আমাদের সংবিধানের ধারা ৩৯(১) ও (১) (ক) প্রদত্ত চিন্তা এবং মতামত প্রকাশের মতো মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার বিবেচনা মাথায় রেখে, না-ভোটের বিধান প্রবর্তন সময়ের দাবি। সংবিধানের ধারা ৩৯ এর ব্যত্যয়হীন প্রয়োগ একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রত্যয়কেই প্রতিষ্ঠিত করবে।
এম এম খালেকুজ্জামান : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্
