০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

কোন পথে ‘ইসলামিক নেটো’?

সৌদির অর্থ, তুরস্কের সামরিক শক্তি ও পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা—এই তিনের সমন্বয়ে নতুন সামরিক অক্ষ। ‘ইসলামিক নেটো’র উত্থানে কেন চিন্তিত ভারত ও ইসরায়েল?

কোন পথে ‘ইসলামিক নেটো’?
মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

আলমগীর খান আলমগীর খান

Published : 22 Aug 2026, 03:52 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইসরায়েল হামলা, গাজায় চলমান গণহত্যা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে এক নতুন মেরুকরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটল ৭ অগাস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরে। মাত্র তিনটি দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—এতে স্বাক্ষর করলেও এটি খুবই আলোচ্য একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেকেই একে ‘ইসলামিক নেটো’ (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগ্যানাইজেশন) বা ‘মুসলিম নেটো’ হিসেবে দেখছেন; কারণ নেটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো এতেও বলা হয়েছে: যেকোনো এক দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণকে সবার ওপরে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তবে চুক্তিটির বীজ রোপিত হয়েছিল গত বছর সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর। ওই হামলার এক সপ্তাহ পর সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর ইসরায়েলি হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদি আস্থা কমতে থাকে এবং নিজেদের জন্য এমন একটা সামরিক জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি হামলার পর সৌদি আরব একটি মুসলিম পারমাণবিক শক্তির নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএমডিএ) শীর্ষক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। মক্কা চুক্তিটি আসলে এরই সম্প্রসারণ।

এই সামরিক জোটটি অল্পসংখ্যক দেশ নিয়ে গঠিত হলেও অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; এর কারণ একদিকে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিসম্পন্ন তিনটি দেশের অংশগ্রহণ এবং অন্যদিকে এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বিকাশ। জোটটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী ইসরায়েল ও ভারত। যদিও এর বর্তমান অবস্থায় উদ্বেগের কিছু নেই, তবে আগামী দিনে এর সম্প্রসারণ নিয়ে তাদের মাথাব্যথার কারণ আছে। সম্প্রসারণ হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হতে পারে, তাও ভাবনার বিষয় হয়েছে।

বাংলাদেশ অবশ্য এর এক সপ্তাহ আগেই সৌদির নেতৃত্বে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স কোয়ালিশন’ শীর্ষক একটি প্রতিরক্ষা কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ১৪টি দেশের এই কোয়ালিশনের উদ্দেশ্য বাব-এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করা। চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার জন্য ইরান-সমর্থিত হুথিদের আক্রমণের ফলে এই কোয়ালিশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া—দুই রকম সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের জন্য সংকট তৈরি করে; যোগ দিলে ইরানের এবং যোগ না দিলে সৌদির বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে, কারণ কোয়ালিশনটি আক্রমণাত্মক কোনো জোট নয়, প্রতিরক্ষামূলক আর সাময়িক। আবার এখানে বাংলাদেশের ভূমিকাও কেন্দ্রীয় নয়; বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ কোয়ালিশনকে যে নৈতিক শক্তি জোগায়, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ‘ইসলামিক নেটো’ সামরিক জোট হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—জোটের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশই নানাদিক থেকে শক্তিশালী। এর উৎপত্তির কারণ নিহিত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে। ইসলামিক নেটো সেই আগ্রাসী পরিকল্পনায় বাদ সাধতে পারে, আবার তা নেটোর মতোই আরেকটি যুদ্ধবাজ জোটে পরিণত হয়ে যেতে পারে। তাদের সম্মিলিত শক্তি হবে ১৪ লাখ সামরিক সদস্য, ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান ও ৬,০০০-এর বেশি ট্যাংক। তাদের শক্তির বৈচিত্র্য হচ্ছে—রিয়াদের আছে অর্থ, আঙ্কারার আছে নেটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী এবং ইসলামাবাদ পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন এক মুসলিম দেশের রাজধানী। এভাবে সৌদির অর্থ, তুরস্কের সামরিক শক্তি ও পাকিস্তানের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা—এই তিনের সমন্বয় ঘটেছে এই নতুন সামরিক সংঘে।

এই জোট গঠনের মধ্য দিয়ে উক্ত তিনটি দেশেরই আশু লাভ হয়েছে। এ ব্যাপারে ফার্স্টপোস্টে ১৪ অগাস্ট রোশনীশ কামানেক লিখেছেন, আন্তর্জাতিক এনার্জি ব্যবসায়ী জ্যাক প্রান্ডেলে এক্স-এ উল্লেখ করেছেন, এই চুক্তি করে ‘রিয়াদ তার প্রতিরক্ষা বাড়িয়েছে ও নিরাপত্তা নিশ্চায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, তুরস্ক তার আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি করেছে এবং পাকিস্তান উপসাগরীয় ও মুসলিম বিশ্বে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।’

যদিও এই ইসলামিক নেটো বিশ্বজুড়ে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তবে বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়েছে ইসরায়েল, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি, কোনো বন্ধু দেশকে নিরাপত্তা প্রদান করতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত ব্যর্থতা, ভারতের ক্রমবৃদ্ধিমান ইসরায়েলপ্রীতি ও অঞ্চলজুড়ে ইরানের শিয়া প্রভাব বৃদ্ধি—এগুলো এই চুক্তির পেছনের হিসাব-নিকাশ। যদিও হিসাবটা সরল নয়। যেমন: সৌদি আরব ও তুরস্ক কোনো সম্প্রীতির সম্পর্কে আবদ্ধ নয়, কিন্তু এই চুক্তির খাতিরে এবার তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আবার তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে নানারকম বাণিজ্যিক সম্পর্কে আবদ্ধ, যেভাবে সৌদি আরব আবদ্ধ ভারতের সঙ্গে। অর্থাৎ এই চুক্তি এসব দেশের মাঝে একে অপরের সঙ্গে এক নতুন সম্পর্কের জাল বুনতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তার এক্স পোস্টে এ উপলক্ষে বরং উৎসাহ প্রকাশ করেছেন। ৮ অগাস্ট তিনি পোস্ট করেছেন, “বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের প্রস্তুতি, সক্ষমতা ও শক্তি প্রমাণ করেছে। মুসলিমরা একত্র হলে আমরা যেকোনো বিদ্বেষপূর্ণ বহিঃশক্তির হামলাকে মোকাবিলা করতে পারি। আমাদের নিজ শক্তির ওপর নির্ভর করার ও প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করার সময় এসেছে।”

তবে মুসলিম বিশ্বের এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কল্পনার জগতে যতটা সহজ ও সুন্দর, বাস্তবের জগতে ততটাই কঠিন ও দুরূহ। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, যার যার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রাধান্য ইত্যাদি মুসলিম ঐক্যকে নামকাওয়াস্তে শক্তিতে পরিণত করেছে। গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধে ইরান ছাড়া তাই কারো তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেই। বরং অভিযোগ আছে যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানে হামলার ব্যাপারে ট্রাম্পকে উসকানি দিয়েছেন, যদিও এখন আবার তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করছেন। দুই দেশ সুন্নি হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঝে তিক্ত সম্পর্ক বিদ্যমান। ধর্মীয় ঐক্যবোধ যতটা সাধারণ মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়, ক্ষমতাসীনদের তা দেয় না। তবে তারা এ আবেগকে ব্যবহার ও অপব্যবহার করতে ওস্তাদ। পার্থিব রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ক্ষমতাসহ অন্যান্য স্বার্থ তাদের কার্যক্রমকে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। ইসলামিক নেটোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে তাই অনেকেই সন্দিহান।

এসব কারণে ইসলামিক নেটো যত না উদ্বেগ ও সংশয় জন্ম দিয়েছে কিংবা কারো কারো মনে যত না আশার সঞ্চার করেছে, তার চেয়ে বেশি জল্পনা-কল্পনা তৈরি করছে। তবে একদিকের এই সংশয় ও অন্যদিকের এই আশা—দুইই বাড়তে থাকবে যদি আগামীতে ইসলামিক নেটো নতুন নতুন সদস্য নিয়ে সম্প্রসারিত হতে থাকে, সামরিক ব্যয় বাড়ে, ছোট-বড় মহড়া শুরু করে এবং বাস্তবে তার শক্তির প্রদর্শন ও প্রয়োগ শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকারকেও অনেক নতুন জটিল ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবময় কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হতে পারে। আর যদি এটি কেবল রাজনৈতিকভাবে এক প্রতীকী উদ্যোগ হয় মাত্র এবং শেষ পর্যন্ত এক কাগুজে বাঘেই পরিণত হয়, তবে ভিন্ন কথা।

আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com