২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হিমালয় গলছে, তিস্তা কাঁদছে: অববাহিকার ঐক্যই এখন পথ

পাহাড়ের বিপর্যয় কূটনৈতিক সীমান্ত মানে না; নেপালের হিমবাহধস ও হড়কা বানের মারাত্মক অভিঘাত নেমে আসতে পারে সমতলের তিস্তা অববাহিকাতেও।

হিমালয় গলছে, তিস্তা কাঁদছে: অববাহিকার ঐক্যই এখন পথ
জলবায়ু পরিবর্তনের চড়া মূল্য দিচ্ছে হিমালয় অববাহিকা; পাহাড়ি নদীর ভয়াল রূপ রুখতে এখন সময় আঞ্চলিক সমন্বিত উদ্যোগের। ছবি: রয়টার্স

নজরুল ইসলাম হক্কানী নজরুল ইসলাম হক্কানী

Published : 01 Sep 2026, 09:07 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:30 PM

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক হিমবাহধস, হড়পা বান ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—হিমালয়ের সংকট কোনো একটি দেশের সংকট নয়; এটি গোটা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অস্তিত্বের প্রশ্ন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল যথার্থই বলেছেন, নেপাল বিশ্বের সবচেয়ে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর একটি হয়েও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহ শিকার। তাই হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই আহ্বান কি শুধু নেপালের কণ্ঠে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নেপাল, ভুটান, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ নিজেদের অভিন্ন ভবিষ্যৎ রক্ষায় একটি নতুন আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, হিমালয় শুধু বরফে ঢাকা পাহাড়ের সারি নয়; এটি এশিয়ার পানির বিশাল ভাণ্ডার। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের তুষার ও হিমবাহ থেকে উৎপন্ন নদীগুলো কোটি কোটি মানুষের পানি, খাদ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জীবিকার ভিত্তি। সাম্প্রতিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) গবেষণা বলছে, হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের পর বরফ হারানোর গতি প্রায় দ্বিগুণ করেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের হিমবাহের আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে পানি নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকিতে।

এই বাস্তবতায় তিস্তা নদীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তিস্তা হিমালয়েরই সন্তান। তার জন্মভূমির জলবায়ু বদলালে তিস্তার চরিত্র বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘ শুষ্কতা, নদীর প্রবাহের অনিশ্চয়তা—সবকিছুর অভিঘাত তিস্তার ওপর পড়বে। আর তিস্তার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ সেই অভিঘাত বহন করবে। তাই তিস্তার পানি নিয়ে শুধু বাংলাদেশ-ভারত বিরোধের পুরোনো কাঠামোয় আটকে থাকলে চলবে না। তিস্তা এখন একটি আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু নদী। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু একটি বাঁধের গেট খোলা বা বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে নয়; বরং হিমালয়ের বরফ, বৃষ্টিপাত, নদীর অববাহিকা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন—সবকিছুর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

এখানেই প্রয়োজন নতুন চিন্তার। নেপাল, ভুটান, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ—এই দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু হিমালয়ের বরফ গলার সামনে এসব রাজনৈতিক বিভাজন প্রকৃতির কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। হিমবাহ জানে না রাষ্ট্রীয় সীমান্ত, নদী জানে না ভিসা-পাসপোর্ট, আর বন্যার পানি জানে না কূটনৈতিক প্রটোকল।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই—তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন হিমালয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতার কথা বলেছেন। এটি শুধু পরিবেশগত আহ্বান নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সংঘাতগুলোর একটি হতে পারে পানি নিয়ে, আর তার বিপরীতে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাটিও লুকিয়ে আছে পানিতে। যদি দেশগুলো পানিকে প্রতিযোগিতার অস্ত্র না বানিয়ে সহযোগিতার ভিত্তি করে, তাহলে হিমালয় হয়ে উঠতে পারে সংঘাতের নয়, শান্তির সেতু।

তবে এখানে একটি কঠিন সত্যও স্বীকার করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দায় সামান্য; অথচ ক্ষতির বোঝা তাদেরই বেশি বহন করতে হচ্ছে। বিশ্বের শিল্পোন্নত ও উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে উন্নয়ন মডেলের ওপর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে তুলেছে, তার পরিবেশগত মূল্য এখন বহন করছে পাহাড়ি কৃষক, নদীর চরবাসী, জেলে, ক্ষুদ্র কৃষক এবং জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা সাধারণ মানুষ। এটি কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়—এটি জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। যে দেশ কম নিঃসরণ করে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাকে শুধু দুর্যোগ মোকাবিলার পরামর্শ দিলে হবে না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত অভিযোজন অর্থায়ন, প্রযুক্তি, গবেষণা, পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

এ অবস্থায় শুধু জলবায়ু সম্মেলনে বিবৃতি দিয়ে কাজ হবে না; হিমালয় অববাহিকার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত আঞ্চলিক জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি। এই কর্মসূচির কয়েকটি স্তম্ভ থাকা জরুরি:

প্রথমত, হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলের হিমবাহ, তুষার, পারমাফ্রস্ট, বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য নেপাল, ভুটান, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, হিমবাহধস, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের জন্য একটি আঞ্চলিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাহাড়ে কোনো বিপর্যয় ঘটার পর নিচের দেশের মানুষকে খবর দিলে চলবে না; বিপর্যয়ের আগেই তথ্য পৌঁছাতে হবে।

তৃতীয়ত, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, কোসি, গণ্ডকসহ অভিন্ন নদীগুলোর জন্য শুধু পানিবণ্টন নয়, অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। নদীকে কেবল পানি সরবরাহের পাইপ হিসেবে দেখলে চলবে না। নদীর প্রবাহ, পলি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, বন্যা ও শুষ্ক মৌসুম—সবকিছুকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

চতুর্থত, তিস্তার মতো সংকটাপন্ন নদীগুলোর জন্য জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের তিস্তাপাড়ের মানুষের জন্য বাঁধ, নদীশাসন কিংবা সেচ প্রকল্পই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চরবাসীর পুনর্বাসন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, বন্যা ও খরার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো জীবিকা এবং নদীভিত্তিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার।

পঞ্চমত, হিমালয়ের বন ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। পাহাড়ের বন ধ্বংস হলে মাটি দুর্বল হয়, ভূমিধস বাড়ে, নদীতে অতিরিক্ত পলি নামে এবং নিচের অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। তাই পাহাড় রক্ষা মানেই শুধু পাহাড়ের মানুষকে রক্ষা নয়, বাংলাদেশের নদী ও সমতলের মানুষকেও রক্ষা করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমাদের চিন্তার কাঠামো বদলাতে হবে। তিস্তা নিয়ে আমরা এতদিন মূলত পানি চেয়েছি। এখন পানি চাওয়ার পাশাপাশি নদীর ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হবে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো এক দেশের কাছে নেই; উত্তর খুঁজতে হবে সম্মিলিতভাবে। তাই ‘হিমালয় অববাহিকা জলবায়ু অভিযোজন জোট’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এর আওতায় নেপাল, ভুটান, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময়, দুর্যোগ পূর্বাভাস, নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, গবেষণা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যৌথ কর্মসূচি নিতে পারে।

আজ নেপালের পাহাড়ে যে বরফধস হচ্ছে, তার ঢেউ হয়তো কাল তিস্তায় আসবে। আজ তিস্তায় যে পানি সংকট, তার অভিঘাত হয়তো আগামীকাল আরও বিস্তৃত হবে।

হিমালয় যদি গলে যায়, তার কান্না শুধু নেপাল শুনবে না; তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও পদ্মার তীরে সেই কান্না প্রতিধ্বনিত হবে। আর হিমালয়ের বরফ যদি রক্ষা পায়, তার সুফলও এক দেশের নয়।

নজরুল ইসলাম হাক্কানী শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক। ইমেইল: nazrul.hakkani@gmail.com