০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘তৌহিদী জনতা’ কেন নৌকাবাইচ বন্ধ করতে চায়?

উৎসব মুক্ত করে, মিলন ঘটায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে। আর তাই লোকজ উৎসবগুলো দিনে দিনে উগ্রদের নিশানায় পরিণত হচ্ছে?

‘তৌহিদী জনতা’ কেন নৌকাবাইচ বন্ধ করতে চায়?
ভেদাভেদ ভুলে এক হওয়ার নদীকাব্য; নৌকাবাইচের বৈঠার টানে ফুটে ওঠে বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতি ও যৌথ উদ্দীপনা।

খান মো. রবিউল আলম খান মো. রবিউল আলম

Published : 26 Aug 2026, 12:56 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:11 PM

সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীর কুলঘেঁষে বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা উৎসবটি স্রেফ নৌকাবাইচ নয়; ধর্ম, বর্ণ ও বয়সের সীমানা ভেঙে মানুষের এক হয়ে ওঠার যৌথ স্মৃতি। কিন্তু সেই চিরায়ত ঐতিহ্যের ঘাটে যখন ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি আসে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক গভীর সামাজিক সংকট।

কিন্তু এ বছর প্রথমবারের মতো স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ফেইসবুকে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নাম ধারণ করে নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করে এবং তা বন্ধে প্রচারণায় নামে। এ প্রতিযোগিতার আয়োজন হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে তারা ঘোষণা দেয়।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কারো বাধার মুখে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধ হবে না বলে দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “নৌকাবাইচ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলা। এটি ‘তৌহিদী জনতা’ বা কারো বাধার কারণে থেমে থাকবে না। স্থানীয়রা বসে সমাধান না করতে পারলে, আমরা বসে সমাধান করে দেব।” উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে লাউতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে স্থানীয় লোকদের নিয়ে বসে এ সমস্যার সমাধান করতে বলেছে। প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। নৌকাবাইচের নির্ধারিত তারিখ ২৮ অগাস্ট ২০২৬। দেখা যাক, পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন তৌহিদী জনতা এ রকম গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলা বন্ধ করতে চাইছে? কেন এ ধরনের লোকমুখীন উৎসবের প্রতি কঠোর হচ্ছে? এই উত্তর পাওয়া যাবে হুমায়ুন আজাদের ‘প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘‘মানুষ বাস করে বহু বিধিনিষেধের মধ্যে, জীবনযাপনের একঘেয়ে ক্লান্তির মধ্যে দিনের পর দিন আবর্তিত হয় তার রক্তমাংস-আবেগ, মরচে ধরে তার জীবনে। উৎসব তাকে মুক্তি দেয় একঘেয়ে জীবনযাপনের অন্ধকূপ থেকে, উৎসব মানুষকে সমুদ্রের স্বাদ দেয়। উৎসব মানুষের শিথিল ইন্দ্রিয়গুলোকে আবার ঘষেমেজে সজীব করে তোলে; জীবনের ক্লান্তি দূর করে মানুষকে জীবনের দিকে নিয়ে যায়।।’’ এসব তথাকথিত তৌহিদী জনতা উৎসব, আনন্দ ও উদযাপনকে ভয় পায়।

উৎসব কোনো বিধিবদ্ধ আয়োজন নয়, উন্মুক্ত জনসমাবেশ; যেখানে হৃদ্যতা, সংযোগ আর আনন্দই মূল বিষয়। সমাজের সংগতি ও সম্প্রীতি ধরে রাখার অন্যতম শক্তি এসব উৎসব। উৎসব সমাজ নামের বিনিসূতার মালার মূল সংযোগ তৈরি করে। উৎসব মূলত ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিনিরপেক্ষ। উন্মুক্ত উৎসব টিকলে সমাজ টিকবে।

অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়াশীলরা একটি বদ্ধ ও নির্দেশিত সমাজ নির্মাণে সচেষ্ট থাকে। তারা মুক্ত সমাজকে ভয় পায়; নির্মল আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভয় পায়। তারা বাধ্যতামূলক উৎসবের পক্ষে, স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব তাদের পছন্দ নয়। স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব মানুষকে সমান কাতারে দাঁড় করায়, ঘটায় প্রাণের সংযোগ। মানুষ এসব উৎসবে যেতে চায়, অংশ নিতে চায়।

নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা, পহেলা বৈশাখ বা জব্বারের বলিখেলা—এ ধরনের উৎসবগুলো এদেশের মানুষের চিরায়ত উৎসব; সম্মিলিত উদযাপনের স্মারক। ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে এসব উৎসবের মহত্ত্ব। ধর্মীয় উৎসবগুলো বিধিশাসিত ও কাঠামোবদ্ধ, কিন্তু যেকোনো চিরায়ত উৎসব সর্বজনীন ও অবারিত। যারা এসব চিরায়ত উৎসব বন্ধ করতে চায়, তারা মূলত সর্বজনীনতা অস্বীকার করে সীমিত গণ্ডির উৎসবের কথা ভাবেন। তারা সমাজ ও ধর্ম গুলিয়ে ফেলেন।

ধর্মের আধ্যাত্মিক দিকের চেয়ে আচারসর্বস্বতা তাদের কাছে অগ্রগণ্য।

‘ধৃ’ ধাতু থেকে 'ধর্ম' শব্দের উৎপত্তি। ‘ধৃ’ ধাতুর অর্থ ‘ধারণ করা’, ‘পোষণ করা’ বা ‘রক্ষা করা’। শাব্দিক অর্থে ধর্ম হলো তা-ই, যা সমাজ, জীবন ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করে, টিকিয়ে রাখে এবং যার মাধ্যমে মানবকল্যাণ ও মানুষের সুরক্ষা সাধিত হয়। অন্তর দিয়ে ধারণ করতে না পারলে ধর্মীয় মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখা কঠিন। ‘তৌহিদী জনতা’র কর্মকাণ্ড আচারনিষ্ঠ হলেও সেখানে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা অনুপস্থিত। তা যদি না হতো, তাহলে ইরান ছাড়াও আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সাড়ম্বরে নববর্ষ হিসেবে ‘নওরোজ’ উদযাপিত হতো না; নওরোজ উৎসব বন্ধ হয়ে যেত। ধর্মীয় বিষয়ে আক্ষরিক ব্যাখ্যার চেয়ে আধ্যাত্মিক বা উদার ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা এখন দারুণভাবে অনুভূত হচ্ছে।

আনন্দ বা উচ্ছ্বাসের মতো বিষয়কে যারা অস্বীকার করতে চান, তাদের কাছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি পরিচিত নয়। একই গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদ আরও লিখছেন, ‘‘আনন্দ যাদের কাছে পাপ, জীবন তাদের কাছে সুখের হতে পারে না।।’’ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠির মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিষয় ঘিরে নতুন বয়ান তৈরি করা ও তা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাজারে হামলা, ওরশে বাধা, কনসার্ট আয়োজনে প্রতিবন্ধকতার খবর প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা কুহেলিকাময়।

সংগঠিত বা সমাজ কাঠামোয় তৈরি এসব সংঘাতী দঙ্গল গোষ্ঠি বহু দিন ধরে পুষ্ট হচ্ছে। বললে অত্যুক্তি হবে না, তারা সব সরকারের আমলেই প্রণোদনা পেয়েছে। মূলত রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যেই তাদের প্রসার ঘটেছে। মনে রাখতে হবে, মানুষের কোনো উৎসব ধর্ম পাহারা দিতে পারে না, ইতিহাসে তার নজির নেই। প্রকৃত ধার্মিকেরা সেই চেষ্টাও করেন না; অধর্ম যাদের ধার্মিকতা, তারা এই ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্ত। ভালো-মন্দ নির্ধারণের দায়িত্ব যখন এসব ‘তৌহিদী জনতা’ নিজ হাতে তুলে নেয়, তখন বুঝতে হবে জনপরিসরে এদের বাড়বাড়ন্ত কম নয়।

এ সমাজে তাদের অস্তিত্বের শক্ত ভিত্তি অস্বীকার করা যায় না। নির্মল সত্য হলো, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থ। চলমান প্রবণতা থেকে অনুমান করা যায়, এসব দঙ্গলকে প্রতিহত করতে শাসকগোষ্ঠি ভয় পাচ্ছে অথবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে।

এ অপশক্তি বহুত্ববাদী সমাজ ভেঙে একরৈখিক সমাজ নির্মাণ করতে চায়, আর তা হলো ধর্মভিত্তিক সমাজ। সমাজ-রসায়নে ধর্মই একমাত্র উপলক্ষ নয়। তারা ধর্ম, রাষ্ট্র ও সমাজজীবন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পাঠ নিতে অক্ষম। সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক বোধ না থাকলে সে সমাজ টেকে না। আরেকটি বিশেষ দিক হলো, এসব জনতা নিজেদের শুদ্ধতার প্রতীক বলে দাবি করে। তারা তথাকথিত শুদ্ধতার মাপকাঠিতে পুরো সমাজটিকে শুদ্ধ করতে চায়। তৌহিদী জনতার এ শুদ্ধীকরণ প্রচেষ্টা ভয়াবহ সামাজিক প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। নিজ ধর্ম, অন্য ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি মিলিয়ে সমাজ; সমাজ টিকলে সবাই টিকবে। সমাজের অস্তিত্ব সংকটে পড়লে জনজীবন বিপন্ন হবে।

কোনো লোকজ উৎসবে কোনো অশুদ্ধতা নেই। মানুষের মিলন ও আনন্দ উৎসবের মূলকেন্দ্র, যা সহাবস্থানমূলক টেকসই সমাজের অন্যতম ভিত্তি। পাবনায় নৌকাবাইচের জন্য স্থানীয় মানুষ নতুন নৌকা বানাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা তুলছে, নৌকাবাইচের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে যা আছে, তা কেবল নির্মল আনন্দ ও সমবেত উদযাপন। মানুষ যত বেশি উৎসবপ্রবণ হবে, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য তত সুদৃঢ় হবে।

খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক। ই-মেইল: khanmdrabiulalam@gmail.com