২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সাইকোপ্যাথ: ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, লক্ষণ ও প্রতিকার

সাইকোপ্যাথরা আমাদের সমাজে একেবারে অচেনা কেউ নয়। তারা হতে পারে সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব, এমনকি পরিবারের সদস্যও। তাদের সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে তারা অন্যের ক্ষতি না করতে পারে এবং নিজেরাও সঠিক পথে আসতে পারে।

সাইকোপ্যাথ: ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, লক্ষণ ও প্রতিকার
গ্রাফিক: মো. নুরুল মোস্তফা জিনাত

মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা

Published : 25 Feb 2025, 04:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 11:54 AM

একেবারে সাধারণ, হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল। সবাই ভাবে সে খুবই ভালো মনের মানুষ। কিন্তু কেউ জানে না, তার ভেতরের শূন্যতা, তার অনুভূতিহীন হৃদয়ের কথা। তার প্রকৃত নামটি গোপন রাখতে হবে, তাই আমরা তাকে অনিন্দ্য বলে একটা ছদ্মনাম দিয়ে দিলাম।

আমাদের চারপাশে এই অনিন্দ্যের মতো অনেক মানুষ থাকে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না।

একদিন পাড়ার একটা ছোট ছেলে রবি অনিন্দ্যদের বাসার পাশে খেলছিল ওর পোষা বিড়াল নিয়ে। হঠাৎ অনিন্দ্য রবির পোষা বিড়ালটার লেজ ধরে টান দেয়। বিড়ালটা ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে। রবি ক্ষুব্ধ হয়, দুর্ব্যবহার করে অনিন্দ্যের সঙ্গে। অন্য কেউ হলে হয়তো বাচ্চাটাকে মিষ্টি করে বকা দিত বা বিড়ালটাকে কোলে তুলে আদর করে দিত। কিন্তু অনিন্দ্য ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছুই হয়নি। কয়েকদিন পর দেখা যায়, রবির সেই বিড়ালটা রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে। কেউ কিছু বুঝতে পারে না, কিন্তু অনিন্দ্যের ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি খেলে যায়।

তারপর একদিন, বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছিল, একজন বলল, “জান, পাড়ার কুকুর, বিড়ালগুলা কেমন যেন কমে যাচ্ছে!” অনিন্দ্য মুচকি হেসে বলল, “হয়তো কেউ কেয়ার করছে না বলে মারা যাচ্ছে!” কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত ঠান্ডাভাব ছিল, যেন সে জানে আসল ঘটনা কী।

সাইকোপ্যাথরা এমনই হয়– তারা আমাদের মাঝে মিশে থাকে, একদম স্বাভাবিকভাবে।তাদের কোনো অনুশোচনা নেই, অনুভূতি নেই, কিন্তু তারা সবসময় একটা মুখোশ পরে থাকে। অনিন্দ্যের মতো মানুষগুলো সত্যিকারের বিপজ্জনক, কারণ তারা কখন কী করবে, কেউ জানে না।

সাইকোপ্যাথ একটা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। সাধারণত সাইকোপ্যাথ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যার মানসিক গঠনে গুরুতর সামঞ্জস্যহীনতা রয়েছে, বিশেষ করে যে ব্যক্তি সহমর্মিতা বা অনুশোচনাবোধের অভাব নিয়ে থাকে এবং সমাজবিরোধী আচরণ করে। সাইকোপ্যাথরা সাধারণত মিথ্যা বলা, প্রতারণা বা নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে অন্যদের ক্ষতি করতে পারে এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যদের অনুভূতি ও অধিকার উপেক্ষা করতে পারে। এটি সাধারণত এক ধরনের ব্যক্তিত্ব বৈকল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাইকোপ্যাথ: লক্ষণ ও প্রতিকার

সাইকোপ্যাথ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভয়ানক অপরাধীদের কথা আসে, কিন্তু বাস্তবে সবাই খুনি বা অপরাধী নয়। অনেক সাইকোপ্যাথ আমাদের আশেপাশেই থাকে, সাধারণ মানুষের মতোই আচরণ করে, কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বের গভীরে রয়েছে অনুভূতিহীনতা ও স্বার্থপরতা।

সাইকোপ্যাথদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সহানুভূতির অভাব ও বিবেকহীনতা। তারা মানুষের আবেগ বুঝতে পারে, কিন্তু তা অনুভব করে না। কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো–

আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব: তারা খুব মিষ্টভাষী ও মোহময়ী হতে পারে, যা অন্যদের সহজেই আকৃষ্ট করে।

মিথ্যা বলা ও প্রতারণা: তারা সত্য লুকিয়ে বা বিকৃত করে নিজের সুবিধা আদায় করে।

সহানুভূতির অভাব: অন্যের কষ্ট বা দুঃখ তাদের স্পর্শ করে না।

আচরণগত নিয়ন্ত্রণের অভাব: অপ্রত্যাশিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, কখনোই অপরাধবোধ কাজ করে না।

পরিকল্পিত চালবাজি: মানুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং ঠান্ডা মাথায় প্রতারণা চালিয়ে যায়।

দায়িত্বহীনতা: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, কাজ অসম্পূর্ণ রাখা, এবং অন্যের দোষ অন্যের ওপর চাপানো।

প্রতিকার ও চিকিৎসা

সাইকোপ্যাথি মূলত একটি ব্যক্তিত্বগত সমস্যা, যা সহজে পরিবর্তনযোগ্য নয়। তবে, কিছু উপায়ে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব–

সাইকোথেরাপি: কগনিটিভ বেহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) তাদের বিপজ্জনক আচরণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে।

সামাজিক নিয়ন্ত্রণ: পরিবারের সদস্য বা কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের উচিত তাদের কাজ ও আচরণের ব্যাপারে অবহিত থেকে তাকে সাহায্য করা ।

প্রয়োজনে ওষুধ: যদিও এই মানসিক সমস্যার সরাসরি কোনো ওষুধ নেই, তবে যদি তারা হতাশা বা আগ্রাসন অনুভব করে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ওষুধের সাহায্য নিতে পারে।

সীমা নির্ধারণ: যারা সাইকোপ্যাথদের সংস্পর্শে থাকে, তাদের উচিত নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সম্পর্কের সীমানা ঠিক করে নেওয়া। 

বিশেষজ্ঞের মতামত

সাইকোপ্যাথি একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা যা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে, আমাদের উচিত সাইকোপ্যাথি বা অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা। 

প্রথমত, সাইকোপ্যাথদের শুধুমাত্র অপরাধী হিসেবে দেখা উচিত নয়। যদিও তাদের মধ্যে সহানুভূতির অভাব থাকতে পারে, তারা সবাই অপরাধমূলক আচরণে লিপ্ত নয়। অনেকেই সাধারণ জীবনযাপন করে এবং সমাজের অংশ হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, সাইকোপ্যাথদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তারা পরিবর্তন অযোগ্য, কিন্তু গবেষণা দেখায় যে সঠিক থেরাপি ও সমর্থনের মাধ্যমে তারা দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে পারে।

তৃতীয়ত, সমাজের উচিত সাইকোপ্যাথি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা এবং তাদের প্রতি দোষারোপের বদলে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কলঙ্ক সৃষ্টি না করে, বরং সহানুভূতি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নত করার চেষ্টা করা উচিত।

সাইকোপ্যাথদের সমাজ থেকে আলাদা করে ফেলার বদলে, তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হবে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের প্রকৃত দায়িত্ব।

পরিশেষে বলা যায়, সাইকোপ্যাথরা আমাদের সমাজে একেবারে অচেনা কেউ নয়। তারা হতে পারে সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব, এমনকি পরিবারের সদস্যও। তাদের সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে তারা অন্যের ক্ষতি না করতে পারে এবং নিজেরাও সঠিক পথে আসতে পারে। প্রয়োজনে অবশ্যই কাউন্সেলিং-এর জন্য পরামর্শ দিতে হবে।