৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

জামায়াত-শিবিরের বদলে যাওয়ার রাজনীতি

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে ‘শরিয়া আইন’ শব্দটি সরাসরি নেই কিন্তু ‘শরিয়াত’ শব্দটিকে একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে। শরিয়াতের সীমা ও বিধান নিয়ে এই কৌশলী শব্দচয়ন বুঝতে হলে তাদের রাজনীতিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

জামায়াত-শিবিরের বদলে যাওয়ার রাজনীতি
বাংলাদেশের মুসলিমরা ধর্মবিশ্বাসে দৃঢ়, তবে ধর্ম পালনে স্বাধীনচেতা। তাই ধর্মীয় পরিচয় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে যেমন সুবিধা দিচ্ছে, তেমন অসুবিধারও কারণ হয়েছে।

মাহবুবুল হক ভূঁইয়া মাহবুবুল হক ভূঁইয়া

Published : 10 Oct 2025, 11:38 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:26 PM

বাংলাদেশে ২০০০ সালের পরে যাদের জন্ম, তারা ক্ষমতায় থাকা দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির কেমন; সেটি প্রত্যক্ষভাবে দেখেননি। তবে জামায়াত-শিবির সম্পর্কে তাদের একেবারে ধারণা নেই, এমনটা বলার সুযোগ খুব কম।

২০০৬ সালের পর থেকে জামায়াত ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির ক্ষমতায় না থাকলেও দুটি কারণে প্রাসঙ্গিক ছিল।

প্রথমত, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছিল, ওই কারণে। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় জামায়াত সেটিকে ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায় করার রাজনীতি কিছুটা হলেও করতে পেরেছে।

দ্বিতীয়ত, তাদের গুপ্ত রাজনীতি। স্কুল-মাদ্রাসা থেকে কলেজ, কোচিং, মেস বা আবাসিক হলে তাদের গুপ্ত রাজনীতি সবসময় ছিল। শিবির সাধারণত শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে তাদের রাজনীতিতে যুক্ত করে, ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের কাছে শিবিরের পরিচিতি ইতিবাচক।

তবে এর বাইরের বড় অংশ জামায়াত-শিবিরকে যুদ্ধাপরাধের আলোচনার বাইরে খুব একটা চেনে না। ফলে, জামায়াত-শিবির ক্ষমতায় থাকলে কেমন হবে, তা বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণেরই জানা নেই।

দিন কয়েক আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তার ক্যাম্পাসে শিবিরের ব্যাপক দাপট ছিল। ওই বড় ভাই বলছিলেন, চট্টগ্রাম শহর থেকে শাটল ট্রেনে ক্যাম্পাসে পৌঁছানো পর্যন্ত দুনিয়া ছিল এক রকম, ক্যাম্পাসে ঢুকলে ভিন্ন আরেকটি দুনিয়ার মুখোমুখি হওয়া লাগত, তার কাছে ক্যাম্পাসটাকে অনেকটা কারাগারের মতো হত। সেখানে শিবিরের ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে হত তাদের।

১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরুর পর বাংলাদেশের মানুষ যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বড় দুটি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক উন্নতি, সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াত সেটির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই সুযোগ নেওয়া ইতিবাচক হতে পারত, কিন্তু জামায়াতের রাজনৈতিক ধারার কারণে এটিকে সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ধর্মকে ব্যবহার করার কারণে জামায়াতের রাজনীতি তাদের সুবিধা দিলেও এটি তাদের অসুবিধারও কারণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী, কিন্তু ধর্ম পালনে তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব রয়েছে। ফলে শরিয়া আইনের শাসন নিয়ে তাদের মনে শঙ্কা রয়েছে।

জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে, ওই শঙ্কা মানুষের মধ্যে আছে এবং জামায়াত এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলছে না। বরং প্রশ্ন করলে তারা পাল্টা প্রশ্ন করে, “আমরা কি কোথাও বলেছি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করব?” কিন্তু তারা এটি করবে না, তাও স্পষ্ট করে বলছে না। আদতে সেটি বলার সুযোগ নেই তাদের।

এই অস্পষ্টতার কারণ বোঝার জন্য দুটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, জামায়াতের গঠনতন্ত্র। তাদের গঠনতন্ত্রে ‘শরিয়া আইন’ শব্দটি সরাসরি নেই কিন্তু ‘শরিয়াত’ শব্দটিকে একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের গঠনতন্ত্রে ‘শরিয়াতের সীমা’, ‘শরিয়াতের বিধান’, ‘শরিয়াত নির্ধারিত পন্থা’ মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

এই শব্দচয়ন কৌশলী। শরিয়া আইন নিয়ে এ দেশের মানুষের ভয়ের কারণে তারা সরাসরি শব্দটি এড়িয়ে এসব শব্দ ব্যবহার করেছে, যা পরোক্ষভাবে শরিয়া আইনেরই কথা বলে।

দ্বিতীয়ত, মওদুদীবাদ। এটি নিয়ে বিস্তারিত না গিয়ে দুটি বিষয় উল্লেখ করছি, যা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। মওদুদীবাদে নারী নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং ভিন্নধর্মাবলম্বীদের কাছ জিজিয়া কর আদায়ের কথা আছে।

জামায়াত ও শিবিরের পরিচিত মুখগুলো যখন জনপরিসরে নারী ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের নিয়ে কথা বলেন, তখন মনে হয় তারা তাদের গঠনতন্ত্র বদলে ফেলেছেন ও মওদুদীবাদ থেকে সরে এসেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, দলটি কি সত্যিই সেখান থেকে সরে এসেছে? বা আদৌ সরে আসতে চায়?

সম্প্রতি তাদের লোগো পরিবর্তনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে ‘আল্লাহ’ ও ‘আকিমুদ দ্বীন’ শব্দ ছিল না। কিন্তু কর্মী-সমর্থকদের চাপে তারা স্পষ্ট করেছে যে, এটি তাদের চূড়ান্ত লোগো নয়। এই কর্মী-সমর্থকরাই প্রকৃত জামায়াত-শিবির। তাদের গঠনতন্ত্র ও মওদুদীবাদ অনুযায়ী সারাজীবন দীক্ষা দেওয়া হয়, তাই এগুলো পাশে সরিয়ে রাখা সহজ নয়।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির ও যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মির্জা গালিব টকশোতে যতই ‘পলিশড’ আলাপ করুন না কেন; জামায়াত-শিবিরকে বুঝতে হবে তাদের তৃণমূল নেতাকর্মী আর সমর্থকদের কাছ থেকে।

জামায়াত-শিবিরের আসল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং তারা ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে কী করতে পারে সেটি দুটি উপায়ে বোঝার চেষ্টা করে যেতে পারে। এক, জামায়াত-শিবিরের সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনীর কার্যকলাপ বিচার করে। দুই, তাদের সাধারণ নেতাকর্মী, সমর্থকদের বক্তব্য, কার্যকলাপ বিচার করে।

জামায়াত-শিবিরের বাছাই করা কিছু মুখ সাধারণত মিডিয়ায় কথা বলেন। তারা নিজেদের আসল চেহারা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পাশে রেখে আলাপ চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মী বা সমর্থকদের আলাপ শুনলেই এদের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে।

শিবিরের প্রকাশনা ছাত্র সংবাদে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আহমদ আফগানীর লেখা, ডাকসু নির্বাচনের সময় শিবির সমর্থক আলী হোসেনের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের হুমকি এবং সর্বশেষ জামায়াতের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদের শরিয়া ও নারীদের নিয়ে বক্তব্য এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির বা টকশোর বাছাই করা মুখদের কথা দিয়ে তাদের এজেন্ডা বিচার করা মারাত্মক ভুল। এরশাদের শাসনামল থেকে শেখ হাসিনার আমল পর্যন্ত তাদের কার্যকলাপ দেখলে বোঝা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা যে কোনো কিছু করতে পারে।

জামায়াত দলীয়ভাবে যে দীক্ষা দেয় আর তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী, সেটি মূলত তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের থেকে বুঝতে হবে। আর আপনি যদি মনোযোগী পাঠক হন, আরও ভালো করে বোঝার জন্য তাদের গঠনতন্ত্র এবং মওদুদীবাদ নিয়ে বইপুস্তকও ঘেঁটে দেখতে পারেন।

শেষ দুটি কথা। এক, একাত্তরের গণহত্যার বিচার যদি কেউ চান, তাহলে সেই সময় দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকার কথা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তার নেই। শুধু ক্ষমা প্রার্থনায় সে বিচার ন্যায্যতা পাবে না। কেবল ব্যক্তির কর্মের বিচার নয়, দলের দায়ও সেখানে বিচার্য হবে। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ ও সম্ভ্রম হারানো মানুষের প্রতি এটা আমাদের রাজনীতিবিদদের দায়।

শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে ক্ষমতার রাজনীতি করেছে বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কথা তুললে সেটি আওয়ামী লীগের রাজনীতি হয়ে যায় না। এই আলোচনায় সতর্ক থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে ক্ষমতার রাজনীতির পুঁজি করা ও এটিকে মর্যাদার জায়গায় রাখার মধ্যে পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করেছে বলে মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে মর্যাদার জায়গায় রাখতে পারবে না–এত খারাপ দিন এই দেশের মানুষের আসেনি।

দুই, জামায়াতের রাজনীতি মূলত আইডেন্টিটি পলিটিক্স, অনেকটা নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির রাজনীতির মতো। বিজেপির রাজনীতি যদি নাগরিক ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের অধিকারের জন্য ক্ষতিকর হয়, জামায়াতের রাজনীতিও তাই। জামায়াত ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করে। তাদের গঠনতন্ত্রে শরিয়তের বিধান মানার কথা থাকলেও, শিশির মনির ও গালিবরা নারী উপস্থাপকদের সামনে যা বলেন, তা কতটা তাদের বিধান মেনে হয়, সেটি প্রশ্নের বিষয়। ডাকসুতে যখন পর্দা করেন না এমন নারীকে ছাত্রশিবির প্রার্থী করে এবং ডাকসু ভিপি সাদিক সায়েম দ্বিধাহীনভাবে ভিন জাতি ও ধর্মের নারীর ছাতার তলে দাঁড়ান, তখন সংশয় হয়।

এই প্রশ্ন তোলার মানে তাদেরকে নারীর সামনে বসার জন্য, বৃষ্টিতে ছাতার তলায় দাঁড়ানোর জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। এটি বলার উদ্দেশ্য, ক্ষমতায় যাওয়ার আলাপ যখন ওঠে, তখন তারা যে ধর্মকে সরিয়ে রাখেন; সঙ্গে তাদের গঠনতন্ত্র এবং মওদুদীবাদকেও পাশ কাটান, ওই চাতুরিটা সামনে নিয়ে আসা।