০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

সার আছে, সরবরাহ নেই: কৃষকের ক্ষোভের দায় কার?

জাতীয় পর্যায়ে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থার কারণে মাঠপর্যায়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা।

সার আছে, সরবরাহ নেই: কৃষকের ক্ষোভের দায় কার?
দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা ও ডিলারদের কারসাজিতে মাঠপর্যায়ে তৈরি হয়েছে তীব্র সার সংকট। যার জেরে বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।

এম এম মুসা এম এম মুসা

Published : 10 Sep 2026, 08:02 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:57 AM

গত এক সপ্তাহে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা অন্তত তিনবার ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে শত শত বস্তা ইউরিয়া নিয়ে গেছেন। লালমনিরহাটে সড়ক অবরোধ হয়েছে, রাজশাহীতে মহাসড়কে বিক্ষোভ হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের একটি অভিন্ন জবাব শোনা গেছে, “এলাকায় সারের কোনো সংকট নেই, এটি নিছক গুজব।”

প্রশ্ন হলো, যদি সংকটই না থাকে, তাহলে একই মাসে একাধিক জেলায় কৃষকেরা কেন গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, জাতীয় পর্যায়ে সারের সামগ্রিক মজুত ও চাহিদার হিসাব হয়তো আপাতত ভারসাম্যে আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বণ্টনব্যবস্থা এমন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে যে সামান্য বিলম্ব বা গুজবই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারছে। এটি নিছক তথ্যের সংকট নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে দেশে সারের চাহিদা প্রায় ১৩ লাখ ২১ হাজার টন, বিপরীতে মজুত রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। সংখ্যা দুটির ব্যবধান সামান্য; মাত্র ৪৪ হাজার টনের নিরাপত্তা মার্জিন। বার্ষিক চাহিদা নির্ধারিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬৮ লাখ টন। এই স্বল্প মার্জিনের অর্থ হলো, সরবরাহ শৃঙ্খলের যে কোনো একটি বিন্দুতে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটলেই—তা পরিবহন বিলম্ব হোক, ডিলারের কারসাজি হোক বা একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়া হোক, তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাতে থাকা সারের প্রবাহে গিয়ে পড়ে।

কুড়িগ্রামের ঘটনাগুলোর প্রায় প্রতিটির অভিন্ন প্যাটার্ন লক্ষণীয়। কৃষকেরা দীর্ঘ সময় ডিলার পয়েন্টে অপেক্ষা করেছেন, ডিলার সময়মতো দোকান খোলেননি বা বিতরণে গড়িমসি করেছেন এবং একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা নিজেরাই গুদামে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, সমস্যাটি জাতীয় মজুতের ঘাটতিতে নয়; সমস্যাটি ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা।

এই দুর্বলতার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতির একটি বড় ভূমিকা আছে। ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে দেশজুড়ে তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের সিইউএফএল ও কাফকো, সিলেটের এসএফসিএল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানাসহ একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। জামালপুরের যমুনা সার কারখানা তো বছরের বড় একটি সময় ধরেই গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে, যাতে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি টাকার মতো লোকসান হচ্ছে এবং দামি যন্ত্রাংশ মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার ২৭ দিনের বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফেরার ঘটনাও প্রমাণ করে যে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পরও পুরো উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে পাঁচ-ছয় দিন সময় লাগে। ফলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা নির্ভরযোগ্য নয় এবং প্রতিবারই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিদেশ থেকে জরুরি আমদানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে—মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস থেকে ডিএপি আমদানি হোক বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮০ হাজার টন সার ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হোক। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ২,৬৯৫ কোটি টাকা।

এই আমদানিনির্ভরতাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সরাসরি শিকারে পরিণত করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬ সালের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে ইউরিয়ার দাম মার্চ মাসে টনপ্রতি ৭২৫ দশমিক ৬ ডলারে পৌঁছেছিল; মাত্র এক মাসে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ব ব্যাংক সতর্ক করেছিল, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সারের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। কারণ, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই একটি প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ডিএপি ও পটাশের দামও একই সময়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

জুলাই নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও (মিসরে ইউরিয়ার দাম নেমে আসে টনপ্রতি ৪৪৮ ডলারে), বাজার এখনো ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও চীনের রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রতি অতিসংবেদনশীল। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন যখন গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই আমদানির বিকল্প পথটিও দামি ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে; দুটি ঝুঁকি একসঙ্গে মিলে একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ একা নয়। ভারতেও ২০২৬ সালের মার্চে জ্বালানি সংকটের কারণে মাসিক ইউরিয়া উৎপাদন আড়াই মিলিয়ন টন থেকে নেমে দেড় মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছিল এবং একই হরমুজ সংকট ভারতের গ্যাস-নির্ভর সার কারখানাগুলোকেও চাপে ফেলেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত সংকট মোকাবিলায় যে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ব্যবহার করেছে তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি স্তরায়িত। ভারতের সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (আইএফএমএস) প্রতিটি রাজ্যে সারের চলাচল অনলাইনে ট্র্যাক করে; ই-উর্বরক প্ল্যাটফর্মে বিক্রি নিবন্ধিত না হলে কোম্পানি ভর্তুকির টাকা পায় না; এবং পয়েন্ট অব সেল যন্ত্র দিয়ে প্রকৃত কৃষকের কাছে বিক্রি নিশ্চিত হওয়ার পরই সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (যা সংক্ষেপে ডিবিটি) চালু করা হয়। ফলে সার কালোবাজারে পাচার করে ভর্তুকির সুবিধা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

২০২৫ সালেই ভারত সরকার কালোবাজারি ঠেকাতে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে। একই সঙ্গে ভারত কৃষিজমির রেকর্ড অনুযায়ী রাজ্যভিত্তিক বরাদ্দ যৌক্তিকীকরণ এবং ন্যানো ইউরিয়া ও ন্যানো ডিএপির মতো বিকল্প প্রযুক্তি প্রসারের কথাও ভাবছে, যাতে বস্তাবন্দী সারের ওপর নির্ভরতা কমে। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের সমস্যা ভিন্ন মাত্রার। ভারতে বছরে চার কোটি টন ইউরিয়া ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নীতিগত শিক্ষা এখানেই। সংকট মোকাবিলার আসল অস্ত্র বাড়তি ভর্তুকি নয়, বরং প্রতিটি বস্তার গতিপথ দৃশ্যমান করে তোলার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

বাংলাদেশ এই দিক থেকে একেবারে শূন্য হাতে নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় গত ৩০ অগাস্ট ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ প্রকাশ করেছে এবং কৃষি সচিব সারের অনিয়ম-দুর্নীতিতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়েছেন। এটি সঠিক পদক্ষেপ, কিন্তু নীতিমালা কাগজে থাকলেই যথেষ্ট নয়; এর বাস্তবায়ন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, যা বর্তমানে অসম। রৌমারীর কৃষি কর্মকর্তা যখন বলেন যে পরদিন থেকে খোলাবাজারে সার বিক্রি শুরু হবে যাতে গুজব দূর হয়, তখন বোঝা যায় যে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ঘটনার পরে আসছে, ঘটনার আগে নয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাপনাই এখনো নিয়ম।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে নীতিনির্ধারকদের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট করণীয় প্রস্তাব করা যায়।

প্রথমত, প্রতিটি সার ডিলার পয়েন্টে বিতরণের প্রতিদিনের হিসাব মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএসভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে বাধ্যতামূলকভাবে আপলোড করতে হবে, যাতে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষক উভয়েই বাস্তব সময়ে মজুত পরিস্থিতি দেখতে পারেন। এতে গুজব ছড়ানোর সুযোগ কমবে এবং প্রশাসনও আগাম হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম কত দিনের চাহিদার সমান সার মজুত থাকা বাধ্যতামূলক তার একটি নির্দিষ্ট ‘বাফার স্টক নর্ম’ নির্ধারণ করে তা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনা দরকার।

তৃতীয়ত, গ্যাস বণ্টন নীতিতে সার কারখানাগুলোকে মৌসুমি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত; ঠিক যেভাবে বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং সময়সূচি করা হয়। রোপা আমন ও রবি মৌসুমের আগে অন্তত ৪৫-৬০ দিনের জন্য সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার নীতি ঘোষণা করা প্রয়োজন, যাতে কারখানা বন্ধ-চালুর পুনরাবৃত্তিতে যন্ত্রপাতির ক্ষতি ও উৎপাদন অনিশ্চয়তা কমে।

চতুর্থত, আমদানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি; মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমিয়ে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পটাশ ও ফসফেট উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-সরকারি চুক্তি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যেমনটি মরক্কোর সঙ্গে ইতিমধ্যে হয়েছে।

পঞ্চমত, ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি নাম-পরিচয় প্রকাশ্যে প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা উচিত, যাতে জবাবদিহি দৃশ্যমান হয়।

সবশেষে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জরুরি পরিস্থিতিতে জেলা সদর দপ্তরের অনুমতির অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে খোলাবাজারে সার বিক্রির নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা পূর্ব-অনুমোদিতভাবে দেওয়া দরকার, যাতে প্রতিক্রিয়ার সময় ঘণ্টার হিসাবে নামিয়ে আনা যায়, দিনের হিসাবে নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে রেখে শেষ করা যাক; বাংলাদেশ কি প্রকৃত অর্থে একটি জাতীয় সার সংকটের মুখোমুখি? উপাত্ত বলছে, এখনো নয়, অন্তত সামগ্রিক মজুত-চাহিদার হিসাবে। কিন্তু ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে একটি সতর্কবার্তা নেওয়া জরুরি; তাদের হিসাবে চলতি খরিফ মৌসুম বিদ্যমান মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া গেলেও অক্টোবর-ডিসেম্বরের রবি মৌসুমেই আসল ঝুঁকি লুকিয়ে আছে, যদি সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত থাকে। বাংলাদেশেও রবি মৌসুমের ঠিক প্রাক্কালে, যখন একদিকে গ্যাস সংকটে কারখানা পুনরায় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি আছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে অস্থির হলে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে; এই দুই ঝুঁকি একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে কুড়িগ্রামের বিক্ষিপ্ত ঘটনাগুলো জাতীয় পর্যায়ের সংকটে রূপ নিতে পারে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট; সংকট আসার অপেক্ষা না করে, এখনই বিতরণ-স্বচ্ছতা, গ্যাস-অগ্রাধিকার ও আমদানি-বৈচিত্র্যের কাঠামোগত সংস্কার শুরু করতে হবে। কৃষকের গুদাম ভাঙা কোনো অপরাধপ্রবণতার লক্ষণ নয়; এটি একটি ব্যবস্থার প্রতি হারানো আস্থার সবচেয়ে জোরাল প্রকাশ। ওই আস্থা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব এখন সরকারের।

এম এম মুসা উন্নয়নকর্মী ও গবেষক। ই-মেইল: musamiah@gmail.com