২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শতভাগ জিপিএ-৫: বিদ্যালয়ের সাফল্যের পূর্ণ মাপকাঠি কী?

৩৮২ শিক্ষার্থীর শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জন নাকি একই প্রতিষ্ঠানের টেস্ট পরীক্ষা থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বাদ পড়া ১০৭ জন; সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড আসলে কোনটি?

শতভাগ জিপিএ-৫: বিদ্যালয়ের সাফল্যের পূর্ণ মাপকাঠি কী?
শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ায় উল্লসিত নাসিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা, কিন্তু এই রঙিন উদযাপনের ফ্রেমে অনুপস্থিত টেস্টে বাদ পড়া তাদের ওই ১০৭ সহপাঠী।

খালিদুর রহমান খালিদুর রহমান

Published : 14 Aug 2026, 07:30 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষার্থীদের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৮৯ জনের মধ্যে ৩৮২ জন চূড়ান্ত এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান এবং তাদের সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করেন। নিঃসন্দেহে এমন ফল প্রশংসনীয়। ৩৮২ পরীক্ষার্থীর সবার সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য গর্বের বিষয়। তবে একই সঙ্গে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ কেন শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, ওই প্রশ্ন সামনে এলে আলোচনাটি আর শুধু কোনো বিদ্যালয়ের ফলাফল কিংবা টেস্ট পরীক্ষার কঠোরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন মূল প্রশ্ন হয়ে ওঠে, বিদ্যালয়ের শিক্ষা-সাফল্য আসলে কীভাবে পরিমাপ করা উচিত?

বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই বিদ্যালয়ের মান বিচারের প্রধান সূচক ধরা হয় পরীক্ষার ফলকে। কতজন জিপিএ-৫ পেল, পাসের হার কত কিংবা ভালো কলেজে কতজন সুযোগ পেল; অভিভাবকদের কাছে এসব পরিসংখ্যানই প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। ফলে ভালো ফলের চাপ তৈরি হয় স্কুলের ওপরও। যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি সুনাম; আর সুনাম বাড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বাড়ে। এ বছর সারা দেশে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে। তবে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান যেভাবে টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে মূল পরীক্ষায় বসা থেকে বিরত রেখেছে, তা শিক্ষার সাফল্য মূল্যায়নের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ, জিপিএ-৫ আর প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার এই তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকেই আড়ালে ঠেলে দেয়।

তবে টেস্ট পরীক্ষার গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেবল ফরম পূরণ করিয়ে শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষায় পাঠিয়ে দিলে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থী কতটা প্রস্তুত, তার মৌলিক জ্ঞানের ভিত কতটা শক্ত কিংবা কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং তা পূরণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব পরখ করা জরুরি। ওই বিবেচনায় টেস্ট পরীক্ষা একটি কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি হতে পারে। সারা বছর ঢিলেঢালা পড়াশোনার পর কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বোর্ড পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিলে শিক্ষার সার্বিক মান বজায় রাখা কঠিন।

সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন টেস্ট পরীক্ষাকে দুর্বল শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের হাতিয়ার না বানিয়ে স্কুলের পাসের হার বা জিপিএ-৫ এর সংখ্যা উঁচু রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার মূল কাজ সেরা শিক্ষার্থী বাছাই করে চমকপ্রদ ফল দেখানো নয়; বরং বিভিন্ন স্তরের মেধাবীদের নিজ নিজ সম্ভাবনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। তাই টেস্টে খারাপ করা শিক্ষার্থীকে মূল পরীক্ষা থেকে বাদ দেওয়ার আগে দেখা প্রয়োজন, তার দুর্বলতার পেছনের কারণ কী এবং তার উন্নতির পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।

অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষকদের পরামর্শ, অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা এবং পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকা দরকার। এসব উদ্যোগের পরও যদি শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত মান স্পর্শ করতে না পারে, কেবল তখনই তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় না পাঠানোর সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তখন এই কঠোরতাকে শাস্তি নয়, বরং একাডেমিক মান ধরে রাখার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তাই কঠোর সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় সহায়তার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব তুলে ধরে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নে শিক্ষকের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেখানে মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য কে ভালো আর কে দুর্বল ওই বিভাজন তৈরি করা নয়; বরং শিক্ষার্থী কোন অবস্থায় আছে এবং তাকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশেও পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর এই ধারাবাহিক অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একইভাবে ইংল্যান্ডের ‘প্রগ্রেস ৮’ পদ্ধতিতে বিদ্যালয়ের সাফল্য মাপা হয় শিক্ষার্থীর পূর্ববর্তী অবস্থানের তুলনায় তার ফলাফলের অগ্রগতির ভিত্তিতে। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। কোনো বিদ্যালয়ের সাফল্য যদি শুধু চূড়ান্ত জিপিএ-৫ দিয়ে বিচার করা হয়, তবে শুরু থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো প্রতিষ্ঠানগুলোই সবসময় সুবিধা পাবে। অথচ যে বিদ্যালয় দুর্বল শিক্ষার্থীকে উন্নত করেছে, মাঝারি মানের শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নিয়েছে এবং পিছিয়ে পড়াদের শিক্ষার মূল ধারায় ধরে রেখেছে; শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অবদান নিঃসন্দেহে অনেক গভীর।

ধরা যাক, ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জন শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, ৩০ জন মাঝারি, ৩০ জন দুর্বল এবং ২০ জন অনেক পিছিয়ে পড়া। পাঁচ বছর পর একটি বিদ্যালয় যদি কেবল ওই ২০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে নিয়ে দুর্দান্ত ফল দেখায়, তবে তাদের পরিসংখ্যান উজ্জ্বল দেখাবে। অপরদিকে, অন্য একটি বিদ্যালয় যদি ওই দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশকে টেনে তুলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করায়, তবে তাদের জিপিএ-৫ এর সংখ্যা হয়তো কম হবে কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত অবদান হবে অনেক বেশি। বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন ভীষণ প্রয়োজন।

তাই নরসিংদীর ওই বিদ্যালয়ের ফলাফলের ক্ষেত্রে কেবল ৩৮২ জনের জিপিএ-৫ পাওয়ার তথ্য দেখলেই চলবে না, তার পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষা দেওয়া ৪৮৯ জনের বাকি শিক্ষার্থীরা কেন পরীক্ষা দিতে পারল না, ওই তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। দুটি তথ্য পাশাপাশি না রাখলে ফলাফলের পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন। অবশ্যই কোনো বিদ্যালয় সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে তাদের টেস্ট পরীক্ষার মানদণ্ড, নিয়মের সঠিক প্রয়োগ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া সহায়তা এবং পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ছিল কি না, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে জানা দরকার।

একই সঙ্গে আমাদের দেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল প্রকাশের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবা দরকার। পাসের হার আর জিপিএ-৫ এর পাশাপাশি যদি শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক অবস্থান, শেখার অগ্রগতি, ফল উন্নয়নের হার, ঝরে পড়ার সংখ্যা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রকাশ করা হলে বিদ্যালয়ের প্রকৃত অবদান আরও স্পষ্ট হবে। এতে শুধু পরীক্ষার দিনের ফল নয়, শিক্ষার্থীর কয়েক বছরের অগ্রগতিও মূল্যায়নের অংশ হবে।

জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘শিক্ষার্থী অগ্রগতি সূচক’ চালুর কথা ভাবা যেতে পারে। প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর ভিত্তিগত দক্ষতা, মাধ্যমিকে তার শেখার অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে কোনো বিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছে। তখন অভিভাবকরাও শুধু ‘কতজন জিপিএ-৫ পেল’ জানতে চাইবেন না; জানতে চাইবেন, ‘শিক্ষার্থীরা কতটা এগিয়েছে’।

এই পরিবর্তন বিদ্যালয়গুলোর ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু সেরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফল তৈরির প্রবণতা কমে দুর্বল ও মাঝারি শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে গুরুত্ব বাড়বে। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীর অগ্রগতির তথ্য ব্যবহার করে পাঠদান পরিকল্পনা করতে পারবেন। বিদ্যালয়ের সাফল্যও তখন পরীক্ষার ফলের বাইরে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে।

তাই ‘সেরা বিদ্যালয়’ ধারণাটিও নতুনভাবে ভাবা প্রয়োজন। সর্বাধিক জিপিএ-৫ পাওয়া বিদ্যালয় অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে শিক্ষাগত উৎকর্ষের পূর্ণ মূল্যায়নে আরও প্রশ্ন থাকা দরকার। কোন প্রতিষ্ঠান দুর্বল শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নিয়েছে, মাঝারি শিক্ষার্থীকে উন্নত করেছে, মেধাবী শিক্ষার্থীকে আরও উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে এবং শক্তিশালী একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে ওই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের ঘটনাটি তাই কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রশংসা কিংবা সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। শিক্ষার মান রক্ষায় কঠোরতা প্রয়োজন, প্রস্তুতিহীন শিক্ষার্থীকে শুধু সংখ্যার স্বার্থে পরীক্ষায় পাঠানোও দায়িত্বশীলতা নয়। একই সঙ্গে ভালো ফলের হার ধরে রাখার জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়াও শিক্ষার আদর্শ হতে পারে না। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে নির্ধারিত মান অর্জনের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে যথেষ্ট সহায়তা দেওয়া হবে এবং ওই সহায়তার পরও প্রয়োজন হলে একাডেমিক মানদণ্ডে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

শতভাগ জিপিএ-৫ নিঃসন্দেহে গর্বের অর্জন, কিন্তু শিক্ষার সাফল্যের চূড়ান্ত সংজ্ঞা নয়। সত্যিকারের ভালো বিদ্যালয় শুধু সর্বোচ্চ গ্রেডের সংখ্যা বাড়ায় না; শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষমতা বাড়ায়, দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে, সম্ভাবনাকে বিকশিত করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষার সাফল্যের বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেল তা নয়, বিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের আগের অবস্থান থেকে কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছে।

খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: khalid_sust@yahoo.com