ভারতীয় গণমাধ্যমে মুজিব হত্যাকাণ্ড

পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্টের পর মাত্র একদিনের ব্যবধানে নিজেদেরকে বদলে ফেলেছিল বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি সংবাদপত্র। ১৬অগাস্ট ১৯৭৫ দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল দেশে কী ঘটেছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে কী লেখা হবে জানতে। 

>>চৌধুরী শহীদ কাদেরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 August 2020, 09:46 PM
Updated : 14 August 2020, 09:52 PM

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবরটি প্রত্যাশিতভাবেই এসেছিল প্রতিটি পত্রিকায়। কিন্তু কোথাও প্রধান সংবাদ হিসেবে নয়, এমনকি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যসহ বাকিদের হত্যার বিষয়টিও চেপে যাওয়া হয়েছিল। ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভারের মতো প্রভাবশালী পত্রিকা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিরব ছিল।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক শাসনের ভয় কিংবা পত্রিকাগুলোর সুবিধাবাদী নীতি হয়তো সংবাদপত্রগুলোকে ভোল পাল্টাতে বাধ্য করেছিল। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সংবাদপত্রের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বড় ধরনের হতাশার সংবাদ। তারা অনেকটা স্বাধীন ছিলেন সংবাদ পরিবেশনে। তাই ভারতের সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে।

১৫ অগাস্ট ভোররাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হন, ফলে ১৫ অগাস্টের পত্রিকায় এই সংবাদ আসার সুযোগ ছিল না। ভারতে ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসের ছুটির কারণে ১৬ অগাস্ট পত্রিকা প্রকাশ হয়নি। ১৭ অগাস্ট ১৯৭৫ সর্বপ্রথম ভারতীয় সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড উঠে আসে।

ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া স্টেটম্যান, কিংবা প্রভাবশালী বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজার, যুগান্তর এর ১৭ অগাস্টের সংবাদ বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া সানডে স্ট্যান্ডার্ড, ইকোনমিক টাইমসে বেশ গুরুত্ব পায় বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের সহায়তায়, বিশ্ব জনমত তৈরি কিংবা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার, স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ বিষয়ে আনন্দবাজারের এই আগ্রহ এবং গুরুত্ব বজায় ছিল। বিশেষ করে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের লোকজনের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে জানার অন্যতম উৎস ছিল আনন্দবাজার। 

পঁচাত্তরের ১৭ আগস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, ত্রিপুরার আগরতলাসহ বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোর সাধারণ মানুষজনের কাছে বাংলাদেশ কী হয়েছে সেটা জানার মূল তথ্যসূত্র হয়ে দাঁড়ায় আনন্দবাজার। 

পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল বাংলাদেশে বিষয়ে সর্বশেষ। শিরোনাম ছিল, ‘পূর্র্ণ মর্যাদায় মুজিব স্বগ্রামে সমাহিত, নতুন বাংলাদেশ সরকারের নীতি সম্প্রীতি: রাষ্ট্রপতি খন্দকার।’
যদিও পত্রিকার শিরোনাম পূর্র্ণ মর্যাদায় মুজিব স্বগ্রামে সমাহিত কিন্তু সংবাদে এই বিষয়ে মাত্র তিন লাইন ছিল। “সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানের মৃতদেহ শনিবার স্বগ্রাম ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পূর্ণ মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়। তখন বিকেল চারটে।”

সংবাদটিতে এই তিন লাইনের পাশে আরো বেশ কয়েকটি তথ্য সংযুক্ত করা হয়। যেমন- বাংলাদেশ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, দেশের সবকিছু স্বাভাবিক চলছে, মেজর ডালিমের বেতার ঘোষণা ইত্যাদি। তবে বেশ কয়েকটি তথ্য পাওয়া যায় যেগুলো অন্য কোন সংবাদপত্রে পাওয়া যায়নি। যেমন- সেদিনের জুমার নামাজে ঢাকার সব কটি মসজিদে অভূতপূর্ব জনসমাবেশ ঘটে। মসজিদে এতো মানুষ অতীতে দেখা যায়নি বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেন। এছাড়া সংবাদে জানা যায়, কারফিউ শিথিল করার পরও দেশের কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। 

১ম পৃষ্ঠার ৮ম কলাম জুড়ে আলাদা বক্স করে আনন্দবাজার এইদিন কয়েকটি সংবাদ ছাপায়। প্রথম সংবাদ ‘প্রথম খবর দিন কে?’ সংবাদটি থেকে জানা যায় বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রথম বিশ্ববাসীকে জানায় ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। এরপর সকাল ৮টায় প্রথম খবর দিল রেডিও বাংলাদেশ, ‘মুজিব নিহত’ এরপর পিটিআই এর ঢাকা ব্যুরো রেডিও বাংলাদেশের উদ্ধৃতি দিয়ে মুজিব হত্যাকা-ের খবর প্রচার করে। 

এরপরের সংবাদ ‘ঘটনার নায়ক কে’। যেখানে বলা হয়,বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থানের নায়ক একজন বরখাস্ত সামরিক অফিসার, মাস কয়েক আগে তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার বিরাগভাজন হন। এই নেতার এক ছেলে একটি বিয়ের আসরে একজন মেয়ের প্রতি অশ্লীল আচরণ করেছিল। এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ বাদেই অফিসারটিকে সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। 

এই বক্সের তৃতীয় সংবাদটি ছিল ‘কলকাতা-ঢাকা বিমান চলছে না’। 

আনন্দবাজার, ১৭ আগস্ট ১৯৭৫ - এর প্রথম পৃষ্ঠায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে ভারত শোকাহত। ১৭ অগাস্টের ভারতের অধিকাংশ সংবাদপত্রে এই তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের বিদেশ দপ্তরের একজন মুখপাত্রের বারতে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। তবে আনন্দবাজার এই সংবাদে আরও যুক্ত করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার ১৬ আগস্ট দিল্লী থেকে কলকাতায় আসেন। এবং গণমাধ্যমকে বলেন, “পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি’। উল্লেখ্য তিনি ১২ অগাস্ট ঢাকা থেকে দিল্লী যান।

প্রথম পৃষ্ঠার আরেকটি উল্লেখযোগ্য খবর ‘বেগম মুজিব নিহত’। ইসলামাবাদের কুটনৈতিক মহলের অসমর্থিত খবর উদ্ধৃত করে রয়টার্স এই সংবাদের উৎস। এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে বেগম মুজিব ছাড়াও তার পরিবারের অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। পাক বেতারের বরাতে আরেকটি সংবাদে বলা হয়েছে মনসুর আলী নিহত এবং শেখ মুজিবের দুই ভাগ্নে শেখ মনি ও শেখ শহীদুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এছাড়া কামাল হোসেন ও নজরুল ইসলামকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়।

প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয় কামরুজ্জামান ও আবদুস সামাদ আজাদকেও মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়েছে। কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন অফিস পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। 

প্রথম পাতায় বড় করে কলকাতার ডেপুটি হাই কমিশনার এ এস কে চৌধুরীর সঙ্গে দমদম বিমান বন্দরে কুয়ালালামপুর থেকে ফেরার পথে ট্রানজিটে প্রধান বিচারপতি এ এম সায়েম ও আইন সচিব এম এইচ রহমানের একটি ছবি ছাপা হয়। 

‘শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে ভাসানী খুশি’ এমন সংবাদ প্রথম পাতায় প্রকাশ করা হয়। ভাসানী এটিকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। 

১৭ অগাস্ট ১৯৭৫ এর আনন্দবাজারের ওই সংখ্যায়  শেখ মুজিবের ওপর চমৎকার একটি নিবন্ধ ছাপিয়েছে এইদিন পত্রিকাটি, শিরোনাম ছিল ‘যখন শেখ কথা ছিল শেষকথা’। লেখক ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি শেখ মুজিবের সাথে কাটানো নিজের অভিজ্ঞতা নিবন্ধে তুলে ধরেন। নিবন্ধটির শেষ অংশে লেখক লিখেছেন, ‘যে কোন জনসভায় যে কোন ঘোষণার সময়, যে কোন হুকুম দেওয়ার সময় শেখ বলতেন: আমি শেখ মুজিবর রহমান বলছি...। শেখ মনে করতেন বাংলাদেশ এইটাই শেষ কথা। শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটায় বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ সামরিক অফিসার ঘোষণা করলেন। না ওটাই শেষ কথা নয়।’

১৭ অগাস্ট টাইমস অব ইন্ডিয়ার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিস্থিতি। বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, মুজিব হত্যাকাণ্ড, নতুন মন্ত্রিসভা, বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া সবমিলিয়ে প্রায় ১৬টি পৃথক সংবাদ ছেপেছে পত্রিকাটি। 

‘Bangla is still cut off’ শিরোনামের সংবাদে সামরিক অভ্যুত্থানকালে ৩৬ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ অবরুদ্ধ থাকা এবং পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কথা বলা হয়েছে। এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ তার মন্ত্রিসভার সাথে বৈঠকে সার্বিক বিষয় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পত্রিকাটি লিখছে- ‘...expressed satisfaction at the overall situation.’

এছাড়া এই সংবাদে সারাদেশে কার্ফু জারি, সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া, কলকাতার সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি সংবাদে মুজিবের হত্যায় ভারতের গভীর শোকের কথা বলা হয়েছে। পিটিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বিদেশ মন্ত্রকের একজন মুখপত্রের ভাষ্য এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন- এই ঘটনায় ভারত সরকার গভীরভাবে শোকাহত এবং ভারত বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

Bangladesh Events শিরোনামে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এই দিনের পত্রিকায় ছাপানো হয়। যেখানে মুজিব হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঢাকা বেতারের প্রথম সংবাদ First Report শিরোনামে ছাপানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে- 

The first report about the Coup from Dacca Radio said, This step had been taken in the greater interests of the country. Sheikh Mujubur Rahman has been killed and his autocratic Government toppled.

এই সংবাদে ঢাকা রেডিওয়ের বরাতে নতুন মন্ত্রিসভার নাম দেওয়া হয়। তাদের শপথের কথা উল্লেখ করা হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার আরেকটি সংবাদে বলা হয়, ‘Bangladesh becomes Islamic Republic.’ 

সংবাদটিতে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন হয়ে বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। 

পত্রিকাটির ১৭ অগাস্টের সংবাদের বড় অংশ জুড়ে ছিল বৃহৎ শক্তিগুলো ঘটনাটিকে কীভাবে দেখছে সেই বিষয়টি।  US watching events, Soviet media Report Coup without comment শিরোনামে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া উঠে আসে। Reaction of various countries শিরোনামে জাপান, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এর প্রতিক্রিয়া জানা যায়।  Foreign Reaction শিরোনামের সংবাদ থেকে মিশর, মালেশিয়া ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া জানা যায়।

আরেকটি সংবাদে দেখা যায় খন্দকার মোশতাক বাংলাংদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই সংবাদে দেখা যায় পাকিস্তান বাংলাদেশে ৫০০ মেট্টিক টন চাল ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

১৬ অগাস্ট বন্ধ থাকার কারণে পত্রিকাটি সংবাদ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে করা চমৎকার সম্পাদকীয়তে, Father of ‘‘Sonar Bangla” শিরোনামে করা এডিটোরিয়ালে বঙ্গবন্ধুর জীবন, রাজনীতিতে উত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে তার ভূমিকা, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা উঠে এসেছে।

১৭ অগাস্ট ইকোনমিক টাইমস তাদের শিরোনাম করে- ‘India shocked at Mujub’s death.’    সংবাদটি অনেকটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতোই বিদেশ মন্ত্রকের মুখপত্র বলেছেন, “মুজিব হত্যায় ভারত গভীরভাবে শোকাহত, তবে এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, ভারত প্রতিবেশি রাষ্ট্রের এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।” এ সংবাদে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান, চাল ও অন্যান্য সহায়তা পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত হয়েছে বাংলাদেশের ইসলামিক রিপাবলিকে পরিণত হওয়ার কথা।

এছাড়া এই সংবাদে আরও বেশ কিছু বিষয় উঠে আসে যেগুলো মোটামুটি সব গণমাধ্যমেই ছিল। যেমন- সীমান্ত বন্ধ, বিমান চলাচল ব্যাহত, বিদেশী প্রতিক্রিয়া, মোশতাকের নতুন মন্ত্রিসভা। তবে অন্যান্য ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর মতো ইকোনমিক টাইমসও দিতে পারেনি ১৫ অগাস্টে কাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের তালিকা। উল্টো ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সপরিবারে নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরেন। 

১৭ অগাস্ট সানডে স্ট্যান্ডার্ড তাদের শিরোনাম করে- ‘Mujib: Liberator of 75 m Bengali’. ইকোনমিক টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো তাদেরও তথ্যসূত্র ইউএনআই এবং পিটিআই। 

সানডে স্ট্যান্ডার্ডে মেজর ডালিমের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে মেজর ডালিম এর সাথে গোলাম মোস্তফার ছেলের দ্বন্দ্ব, নারীঘটিত বিষয় আলোচনা করা হয়। তুলে ধরা হয় ডালিমের পরিচয়, সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের নানা কারণ।

এই পত্রিকায় অন্যান্য সাধারণ বিষয়গুলোর সাথে সরকারের নানা দপ্তরে পরিবর্তন তুলে ধরা হয়। জেনারেল সফিউল্লাহসহ তিন বাহিনীর আনুগত্য স্বীকারের তথ্য পাওয়া যায়। ‘Mujib: Liberator of 75 m Bengali’ এর শিরোনামে পত্রিকাটি একটি সম্পাকীয় প্রকাশ করে, যেটির শুরু ছিল- 

Sheikh Mujibur Rahman, who was overthrown in a military coup, is the father of the four-year-old nation and known to his 75 million people as “Banga Bandhu” (brother of Bengalis).

Sheikh Mujib was the inspiration for the declaration of nationhood by the second largest Muslim group in the world and for the liberation of the former East Pakistan while death sentence hung over his head in a West Pakistani jail in Decemeber 1971.

এই সম্পাদকীয়তে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ উঠে আসে। আলোচিত হয বাকশাল ও রক্ষীবাহিনী গঠনের কথা।

পত্রিকাটির আরেকটি সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশ ইসলামিক রিপাবলিকে পরিণত হয়েছে। টিভিতে ও বেতারে বাংলা গান প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদগুলোতে নতুন সরকারের জন্য দোয়া কামনা করে প্রার্থনা করা হয়েছে।

প্রভাবশালী পত্রিকা স্টেটসম্যান এদিন তাদের মূল শিরোনাম করে- India keeping watch on Events  in Bangladesh Grief over Mujib’s Tragic Death. 

যেটিতে বলা হয়-

India is ‘‘carefully studying” reports of events in Bangladesh and ‘‘watching developments” but an official spokesman made it clear today that these are considered ‘‘internal matters of Bangladesh”.

প্রকাশিত রিপোর্টটিতে শেখ মুজিব মন্ত্রীসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: কামাল হোসেনের জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট থেকে ফেরার সময় দিল্লী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আরেকটি প্রতিবেদনে মুজিবকে নিজ জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সমাহিত করার কথা বলা হয়, তবে বঙ্গবন্ধুর সাথে আর কে অভ্যুত্থানে মারা গিয়েছে সেই সংবাদ পাওয়া যায়নি। খন্দকার মোশতাককে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত হয় আরেকটি সংবাদ।

স্টেটসম্যান শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুতে প্রায় অর্ধেক পৃষ্ঠাজুড়ে একটি জীবনী ছাপে। যেটির শুরু করেছিল চমৎকার একটি লাইন দিয়ে, 

Sheikh Mujibur Rahman was the inspiration behind the declaration of Independence by the country of 75 million Bangladesh.

এতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য শেখ মুজিবের আত্মত্যাগ, দীর্ঘ কারাজীবন, নেতৃত্বের কথা আলোচিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশ পুর্ণগঠনে শেষ মুজিবের ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। 

১৭ অগাস্ট ১৯৭৫ দৈনিক যুগান্তর শিরোনাম করে, ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থান: মুজিব ও মনসুর আলী নিহত সামরিক আইন জারি’ সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয় ১৫ অগাস্ট ভোর রাত ৫.১৫ মিনিটে এই অভ্যুত্থান হয়। অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের সাথে তার দুই ভাগ্নেও নিহত হন। 

উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক অবস্থায় যেসব টুকরো খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে জানা যায় যে পশ্চিমী সমর্থক রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর লোকেরা এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। শেখ মুজিবের ভারত ও সোভিযেত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় যারা ঘোরবিরোধী ছিলেন খন্দকার মোস্তাক আহমেদ তাদেরই একজন। 

একটি আলাদা বক্স করে ‘ভারত মর্মাহত’ সংবাদটি ছাপানো হয়। খুব ছোট করে উল্লেখ করা হয়- ‘মুজিব সমাহিত’। ভুট্টোর সাত তাড়াতাড়ি স্বীকৃতি শিরোনামে প্রথম পাতার অষ্টম কলামে সংবাদ ছাপানো হয়, সংবাদে বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তার কথা উঠে আসে।

‘রাষ্ট্রপতি খোন্দকারের বেতার ভাষণ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে জাতির উদ্দেশ্যে ১৫ অগাস্ট সকাল ৮.৪৫ মিনিটে দেওয়া বেতার ভাষণের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হয় এ পত্রিকায়। যেখানে খোন্দকার মোস্তাক বলেন, তার সরকার যে কোনও প্রকার দুর্নীতি, স্বজন পোষণ ও পক্ষপাতিত্বের সঙ্গে কোনরূপ আপস করবে না।

১৭ অগাস্ট ১৯৭৫ এর সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায় ভারতের অধিকাংশ সংবাদপত্র বাংলাদেশে কী হয়েছে সেটি সঠিকভাবে জানে না। কারণ তাদের সংবাদের যে উৎস রেডিও বাংলাদেশ, বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদপত্র সেখানেই এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত গোপন করা হয়েছে। 

বঙ্গবন্ধুর সাথে তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিষয়টি তাই পত্রিকার সংবাদে পাওয়া যায় না। শুধু আনন্দবাজার বেগম মুজিব নিহত হওয়ার সংবাদ দেয়। দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় চিন্তা করে ভারত সরকারও কোন মন্তব্য করেনি। এটি তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।

এমনকি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত শুরুতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে শোক জানাননি। ১৮ অগাস্ট ১৯৭৫ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী  শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, যেটি ১৯ তারিখের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। 

বেশ কিছু ভুল তথ্য এই সময় পত্রিকাগুলোতে দেখা যায়, যেমন যুগান্তরের মূল শিরোনাম করেছে ‘মুজিব ও মনসুর আলী’ নিহত, প্রায় সব পত্রিকায় এই তথ্য পাওয়া যায়। যদিও ১৮ অগাস্ট তারা আবার সংবাদ প্রকাশ করে মনসুর আলী জীবিত। এদিকে ১৭ তারিখের যুগান্তর পত্রিকায় মুজিব হত্যার জন্য পশ্চিমা পক্ষকে দায়ী করা হয়। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত একটি উপ-সম্পাদকীয়তে মুজিব হত্যার জন্য সরাসরি সিআইএকে দায়ী করা হয়। এতে ক্ষেপে যায় মার্কিন দূতাবাস। পরে অবশ্যই যুগান্তর এটার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। 

যদিও ১৮ আগস্ট থেকে পত্রিকাগুলোতে বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে সঠিক তথ্য আসতে শুরু করে। আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করে সংবাদের ধরন। পুরো অগাস্ট মাস জুড়েই ভারতীয় গণমাধ্যমে মুজিব হত্যাকাণ্ড ও সমসাময়িক বাংলাদেশ পরিস্থিতি আলোচিত হয়েছে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক