পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত গান কোনটি
তামা-ব্রোঞ্জ যুগের যে ফলক বদলে দিয়েছে গানের ইতিহাস।
কয়েক হাজার বছর আগের এক ফালি কাদামাটির ফলক। আর তাতেই লুকিয়ে রয়েছে মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন সুরের রহস্য। সিরিয়ার প্রাচীন বন্দরনগরী উগাড়িতের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩ হাজার ৪০০ বছর পুরনো এই ফলকটিকে ঘিরেই আজ বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ ও সংগীতপ্রেমীদের এত কৌতূহল।
১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে একদল ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক এই ব্রোঞ্জযুগীয় রাজপ্রাসাদের আর্কাইভাল উইং থেকে ২৯টি মাটির ফলক আবিষ্কার করেন। এর মধ্যে মাত্র একটি ফলকই প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল, যা পরে রূপ নেয় ইতিহাসের পাতায় অন্যতম মূল্যবান এক আবিষ্কারে।
ফলকগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ হিসেবে এটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল বলেই বর্তমানে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘হুরিয়ান হাইম নং ৬’। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দ নাগাদ রচিত এই গানটি মূলত উৎসর্গ করা হয়েছিল ফলন, উর্বরতা এবং চাঁদের দেবদেবী হুরিয়ান দেবী নিক্কালকে। ফলকের ওপরের অংশে প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের ‘হুরিয়ান’ ভাষায় কিউনিফর্ম আকৃতির লিপিতে খোদাই করা রয়েছে এর মূল কথামালা।
তবে কেবল প্রাচীন সুর বা লেখার সন্ধান মেলেই এর গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। ফলকটির নিচের অংশে লুকিয়ে রয়েছে কোডের মতো সুরের সংকেত এবং একটি তারের বাদ্যযন্ত্র সুর বাঁধার নির্দিষ্ট নির্দেশিকা। প্রাচীনকালে বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ বা প্রাচীন সুমেরীয় ও মিশরীয় সভ্যতার চিত্রকর্ম কিংবা কবিতার দেখা এর আগেও মিলেছে। যেমন, ‘হুরিয়ান হাইম নং ৬’-এর প্রায় ৫০০ বছর আগের একটি সুমেরীয় ফলকে রাজা লিপিত-ইশতারের প্রশংসায় গীত এক গানের কথা পাওয়া যায়।
কিন্তু কোনোটিতেই সরাসরি বা সুরের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। এখানেই হুরিয়ান হাইমের অনন্যতা। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সংগীতের ব্যবধান নির্দেশকারী সংখ্যাসূচক প্রতীক এবং তারের বাদ্যযন্ত্র সুর করার পদ্ধতি। আর এই জাদুকরী মিশ্রণই আধুনিক গবেষক ও সংগীতশিল্পীদের মনে জুগিয়েছে এই প্রাচীন মেলোডিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার অদম্য কৌতূহল।
এই ফলকটির রচয়িতা অবশ্য একজন হুরিয়ান লিপিকার, তবে নির্দিষ্ট করে তার নাম এখনও নিশ্চিত নয়। গবেষকদের কেউ কেউ আম্মুরাবি নামের কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির ইঙ্গিত পেলেও তার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ মেলেনি। মূলত লুপ্ত প্রায় হুরিয়ান ভাষায় লেখা এই গানটির ভেতরের কথাগুলো দেবীকে নিবেদন করা একটি প্রার্থনামাত্র।
কোনো কোনো গবেষক একে সন্তানহীনা এক তরুণীর উর্বরতা লাভের আকুতি হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন। এ ছাড়া প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানে বহুল ব্যবহৃত তিল বা তিলের তেল বোঝাতে ‘শাম-শাম’ নামক উপাদানের নৈবেদ্যের কথাও উল্লেখ রয়েছে এই প্রাচীন কথায়।
আবিষ্কারের পর দীর্ঘ দশক ধরে এই ফলকের সংকেত ছিল গভীর এক রহস্য। ১৯৭০-এর দশকের দিকে গবেষকরা এর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্কেতগুলোর পাঠোদ্ধার করার উপায় খুঁজতে শুরু করেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিরিওলজির সাবেক অধ্যাপক অ্যান দ্রাফকর্ন কিলমার ফলকটির পুনর্গঠনে মত দেন যে, এখানে সুর এবং লিরিক্স ছাড়াও একটি লিয়ার বা প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র টিউন করার নির্দেশিকা রয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ পণ্ডিত মার্টিন এল. ওয়েস্টের ব্যাখ্যায় উঠে আসে, কীভাবে একজন সংগীতশিল্পী লিয়ারের তারের ওপর নিজের হাত অবস্থান করাবেন, সংকেতগুলো সম্ভবত সেই নির্দেশই দিচ্ছে। তবে এই সংকেতের সঠিক পাঠ নিয়ে আজও সব গবেষকের মধ্যে পূর্ণ মতৈক্য নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ধারার নোট-বাই-নোট কোনো পূর্ণাঙ্গ স্কোর নয়, বরং ‘হুরিয়ান হাইম নং ৬’ পরিবেশিত হতো মূলত একটি সুরের কাঠামো হিসেবে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন সুরটি বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে পেয়েছে আধুনিক রূপ। প্রত্নসংগীত বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ডামব্রিল যেমনটি পছন্দ করেন, তার সহকর্মী সিরীয় বংশোদ্ভূত আর্মেনিয়ান সোপ্রানো ও সংগীত গবেষক সেভান হাবিবের কণ্ঠে এই গানটি পেয়েছে অনন্য এক রূপ। সংগীতশিল্পী মাইকেল লেভিও লিয়ার বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে এই প্রাচীন সুরের আধুনিক পুনর্গঠন পরিবেশন করে চলেছেন। এমনকি ডামব্রিলের কথায়, বৈদ্যুতিক গিটার ও অন্যান্য যন্ত্রের মিশেলে এই প্রাচীন সুরকে পপ সংগীতের আদলে রূপ দেওয়ার পরীক্ষামূলক চেষ্টাও বাদ যায়নি।
সূত্র: হিস্ট্রি ডটকম।
