০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মভূমি: বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’

শোনা যায়, যুদ্ধে পরাজিত সম্রাটদের কাছে স্বর্ণের বদলে বই দাবি করতেন খলিফা আল-মামুন।

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মভূমি: বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’
আব্বাসীয় লাইব্রেরিতে পণ্ডিতরা (মাকামাত আল-হারিরি), চিত্রশিল্পী: ইয়াহয়া ইবনে মাহমুদ আল-ওয়াসিতি, ১২৩৭ খ্রিস্টাব্দ, ছবি: সংগৃহীত।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Aug 2026, 02:01 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস যখন আমরা পড়ি, তখন বড় একটি শূন্যস্থান চোখে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্যের পতন আর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কিংবা কলম্বাসের আগমনের মধ্যবর্তী প্রায় এক হাজার বছর ইউরোপের জন্য ছিল অন্ধকার সময়। এই সময়টাকে চার্লেমেন, ক্রুসেড কিংবা নরম্যান বিজয়ের গল্প দিয়ে দ্রুত পার করে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাসের এই ইউরো-কেন্দ্রিক বয়ানে যা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হলো ঠিক এই অন্ধকার যুগেই পশ্চিম এশিয়ায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছিল সমান্তরাল এক সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার মহাবিপ্লব। 

৬৩২ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে স্পেন থেকে পারস্য পর্যন্ত বিশাল এক ভূখণ্ডে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বসন্ত এসেছিল, তার প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা ‘হাউস অব উইজডম’। ইরাকি বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ জিম আল-খালিলি তার ‘দ্য হাউস অব উইজডম’ বইয়ে এই বিস্মৃত অধ্যায়কে ইতিহাসের পাতায় তার যোগ্য স্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। 

তার বর্ণনা অনুযায়ী, এক হাজার বছর আগে যখন ইউরোপ অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন মুসলিম শাসকেরা তাদের প্রাসাদগুলোকে আধুনিককালের ‘থিংক ট্যাংক’-এ পরিণত করেছিলেন। সেখানে জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, চিকিৎসক এবং দার্শনিকেরা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞানকে একটি অভিজ্ঞতামূলক অনুসন্ধান বা ‘এম্পিরিক্যাল ইনকোয়ারি’ হিসেবে চর্চা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

৭৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফারা বাগদাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পাঁচ দশকের মধ্যেই এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং ঐশ্বর্যশালী নগরীতে পরিণত হয়, যার জনসংখ্যা তৎকালীন সময়ে প্রায় দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। খলিফারা, বিশেষ করে খলিফা আল-মামুন ছিলেন এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তার সময়কার বাগদাদকে তুলনা করা যায় রেনেসাঁ যুগের ফ্লোরেন্স কিংবা পেরিক্লিসের আমলের অ্যাথেন্সের সঙ্গে।

খলিফা আল-মামুন ছিলেন জ্ঞান সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রায় একরোখা। তিনি কনস্টান্টিনোপল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে দূত পাঠাতেন প্রাচীন গ্রিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য। এমনকি যুদ্ধে পরাজিত সম্রাটদের কাছ থেকে সন্ধির শর্ত হিসেবে স্বর্ণের বদলে প্রাচীন লাইব্রেরির বই দাবি করতেন তিনি। এই মহাযজ্ঞের ফলে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস এবং ইউক্লিডের মতো মনীষীদের কাজগুলো আরবিতে অনূদিত হয়। 

ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকা-র ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরবি অনুবাদ, ছবি: সংগৃহীত।

ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকা-র ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরবি অনুবাদ,

এই অনুবাদ প্রক্রিয়াটি কেবল রাষ্ট্রীয় প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না, লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল। এই জোয়ারকে ত্বরান্বিত করেছিল কাগজ তৈরির প্রযুক্তি, যা আরবরা চিনা যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে শিখেছিল। চর্মচক্ষু বা প্যাপিরাসের চেয়ে কাগজ অনেক সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় জ্ঞানচর্চা কেবল উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে।

ইসলামী বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল অনুবাদকে কেবল স্রেফ অনুবাদে আটকে না রেখে তাতে মৌলিক গবেষণার সংযোগ ঘটানো। এই সময়ের বিজ্ঞানীদের মধ্যে আল-খোয়ারিজমি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম। তাকে ‘বীজগণিতের জনক’ বলা হয়। তার বিখ্যাত বই ‘কিতাব আল-জাবর’ থেকেই আজকের ‘অ্যালজেব্রা’ শব্দটির উৎপত্তি। তিনি এবং আল-কিন্দী মিলে হিন্দু দশমিক সংখ্যা পদ্ধতিকে আরবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যা আজ আমরা বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করি।

জিম আল-খালিলির তালিকায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর হলেন ইবনে আল-হাইথাম। আর্কিমিডিস ও নিউটনের মধ্যবর্তী সময়ে তাকে পৃথিবীর ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং চোখের গঠন নিয়ে সাত খণ্ডের এক বিশাল গবেষণা লিখেছিলেন। প্রাচীন গ্রিকরা মনে করত চোখ থেকে আলো বের হয়ে বস্তুর ওপর পড়ে, কিন্তু ইবনে আল-হাইথাম প্রমাণ করেন যে আলো আসলে বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে।

আবার আল-বিরুনি ছিলেন এমন এক প্রতিভা, যিনি অ্যারিস্টটলের নিছক যুক্তিবিদ্যার সমালোচনা করেছিলেন। তার মতে, বিজ্ঞান কেবল শুদ্ধ চিন্তার ওপর ভিত্তি করে চললে ভুল হতে পারে; এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং হাতে-কলমে পরীক্ষা। এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বীজ বপন করেছিলেন আল-বিরুনিই। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান ছিল অপরিসীম। তার ‘কানন অব মেডিসিন’ বা চিকিৎসা শাস্ত্রের কানুন কয়েকশ বছর ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি এবং শরীরতত্ত্ব নিয়ে তার ধারণাগুলো ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

বাগদাদের এই স্বর্ণযুগে কেবল তাত্ত্বিক বিজ্ঞান নয়, ফলিত বিজ্ঞানেও বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছিল। ‘বানু মুসা’ নামে পরিচিত তিন ভাই ছিলেন প্রকৌশলী। তাদের ‘কিতাব আল-হিয়াল’ বা ‘ইঞ্জিনিয়াস ডিভাইসেস’ বইয়ে এমন সব যন্ত্রের বর্ণনা আছে যা আজকের রোবোটিকসের আদি রূপ। উদাহরণ হিসেবে, তারা একটি যান্ত্রিক বাঁশি বাদক রোবট তৈরি করেছিলেন যা প্রথম প্রোগ্রামযোগ্য যন্ত্রের একটি উদাহরণ।

হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ অবরোধ (১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ), ছবি: সংগৃহীত।

হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ অবরোধ (১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ),

বসরার আল-জাহিজ ছিলেন আরেকজন বিচিত্র স্বভাবের পণ্ডিত। মাছ বিক্রেতার এ সন্তান প্রাণিবিজ্ঞানের ওপর সাত খণ্ডের বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি পিঁপড়াদের সামাজিক সংগঠন, প্রাণীদের যোগাযোগ এবং পরিবেশের প্রভাবে প্রাণীদের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। জনশ্রুতি আছে, ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বিশাল বইয়ের স্তূপ গায়ের ওপর ধসে পড়ায় ৯২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। আল-মাসউদির মতো পর্যটকেরা প্রথম বায়ুকল বা উইন্ডমিলের কথা উল্লেখ করেন এবং ভূমিকম্পের ভূ-তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিলেন।

খলিফা আল-মামুন আধুনিক যুগের ‘বিগ সায়েন্স’ বা বড় মাপের বিজ্ঞান প্রকল্পের ধারণা প্রবর্তন করেন। তিনি নবম শতাব্দীতে বাগদাদে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির বা অবজারভেটরি তৈরি করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রিক বা ভারতীয় মানচিত্রের নির্ভুলতা পরীক্ষা করা। তার নির্দেশে গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, যা বর্তমানকালের অত্যাধুনিক পরিমাপের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

ইসলামী বিজ্ঞানের এই গৌরবময় সময় চিরস্থায়ী হয়নি। ১২৫৮ সালে মোঙ্গলদের বাগদাদ আক্রমণ ছিল এই সভ্যতার জন্য এক বড় আঘাত। বলা হয়ে থাকে, মোঙ্গলরা যখন বাগদাদ ধ্বংস করে, তখন টাইগ্রিস নদীর পানি বইয়ের কালিতে কালো হয়ে গিয়েছিল। তবে কেবল বহিরাগত আক্রমণই নয়, অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিজ্ঞানের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ধীরে ধীরে এই মহান ঐতিহ্যের টুঁটি চেপে ধরে।

জিম আল-খালিলির এ গবেষণার উদ্দেশ্য কেবল হারানো গৌরব গাথা শোনানো নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মকে এটি মনে করিয়ে দেওয়া যে বিজ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের সম্পত্তি নয়। এক সময় আরবরা কেবল তর্জমা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা গ্রিকদের হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানকে রক্ষা করেছে, সমৃদ্ধ করেছে এবং পরবর্তীতে তা লাতিনে অনুবাদ হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত গড়ে দিয়েছে।

ইতিহাসের সেই অন্ধকার যুগে বাগদাদ যা অর্জন করেছিল, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস। বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তা যখন কোনো সমাজের প্রাণকেন্দ্রে থাকে, তখনই সেই সমাজ সভ্য ও আলোকিত হয়ে ওঠে। আল-খোয়ারিজমি, ইবনে সিনা কিংবা ইবনে আল-হাইথামদের সেই আলোকবর্তিকা আবারও যদি প্রজ্বলিত করতে হয়, তবে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই যুক্তিবাদ ও গবেষণার মূলে, যা একদা মরুভূমির বুকে এক বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যান তৈরি করেছিল।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য অবজার্ভার।