মিয়াঁ তানসেন: তার সুরে কি সত্যিই বৃষ্টি নামত?
কথিত আছে, তিনি দীপক রাগ গাইলে প্রদীপ আপনাআপনি জ্বলে উঠত। এমনকি একবার নিজেই সেই আগুনে দগ্ধ হয়েছিলেন।
সুরে কি সত্যিই প্রকৃতিকে বদলে দেওয়া যায়? প্রদীপ জ্বালানো বা মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামানো—এমন ক্ষমতা কি আদৌ কোনো মানুষের কণ্ঠে থাকতে পারে? ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমন প্রশ্নই বারবার উঠে আসে মিয়াঁ তানসেনের নাম উচ্চারিত হলে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাকে ঘিরে যে বিস্ময় জমা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে এমন সব কিংবদন্তির ওপর, যার বাস্তবতা যাচাই করা আজ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই আবরণ সরিয়ে দেখলে কেমন মানুষটিকে পাওয়া যায়? সত্যিই কি তার কণ্ঠে ছিল প্রকৃতিকে বদলে দেওয়ার কোনো ‘অলৌকিক শক্তি’, নাকি প্রতিভা, সাধনা ও সংগীতের প্রতি নিবেদনই তাকে মানুষের কল্পনায় এমন কিংবদন্তির উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে?
তানসেনের জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের পাশাপাশি রয়েছে নানা মতভেদ ও পরস্পরবিরোধী বর্ণনা। তার জন্মসন, পারিবারিক পরিচয়, শিক্ষাগুরু ও ধর্মান্তর—এমন অনেক বিষয়েই ইতিহাসের সূত্রগুলো একমত নয়। আবার তার সংগীতজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন কিছু কাহিনি, যার ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণ করা কঠিন। ফলে তানসেনকে নিয়ে লিখতে গেলে একদিকে যেমন কিংবদন্তির আকর্ষণ এড়িয়ে যাওয়া যায় না, অন্যদিকে তেমনি ইতিহাসের সীমারেখাটিও মনে রাখা জরুরি।
তবু কিংবদন্তির বাইরে যে তানসেনকে পাওয়া যায়, তিনিও বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন স্থির সাধনায় গড়ে ওঠা এক সংগীতশিল্পী, ধ্রুপদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক এবং সম্রাট আকবরের দরবারের অন্যতম প্রধান সংগীতজ্ঞ। তার সংগীতচর্চা ও উত্তরাধিকার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমন ছাপ রেখে গেছে, যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায়।
তানসেনের সংগীতশিক্ষা কার কাছে শুরু হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পৌঁছাতে হয় বৃন্দাবনের স্বামী হরিদাসের কাছে। ভক্তিরসে নিবেদিত অসংখ্য ধ্রুপদ রচনার জন্য নিজ গুণেই তিনি সংগীতের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিলেন; তবে আজ তার নামটি বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় কারণ তানসেনই ছিলেন তার সুযোগ্য শিষ্য।
হরিদাসের সময়কালের কিছুটা আগে থেকেই অবশ্য ধ্রুপদের জনপ্রিয়তার ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছিল—বাংলায় নয়, বরং উত্তর ভারতের গোয়ালিয়রে। ১৪৮৬ থেকে ১৫১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে গোয়ালিয়র শাসন করা রাজা মানসিংহ তোমর এই সংগীতরীতির প্রতি এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে তার পৃষ্ঠপোষকতাতেই ধ্রুপদ রাজদরবারের গণ্ডি পেরিয়ে পরিচিতি পায়। ধ্রুপদের উৎস অবশ্য আরও পুরনো—প্রাচীন প্রবন্ধ-সংগীতের ধারা থেকেই এটি বিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। যদিও ১৩০০ সালের দিকেও এই রীতি প্রচলিত ছিল কি না, তার সপক্ষে নিশ্চিত কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই।
তানসেনের জন্মসাল নিয়ে সূত্রভেদে অন্তত ছয়টি ভিন্ন বছরের কথা পাওয়া যায়—১৪৯৩, ১৫০৬, ১৫১৬, ১৫২০, ১৫৩১ (কোথাও কোথাও ১৫৩২) ও ১৫৪৮। প্রভাত কুমার গোস্বামী তার ‘ভারতীয় সঙ্গীতের কথা’ বইয়ে স্বীকার করেছেন যে, এই বছরগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে তিনি দুটি বিষয় মাথায় রাখার কথা বলেছেন—আকবরের রাজসভায় আসার সময় তানসেন কেবল বিবাহিতই ছিলেন না, তার পুত্ররাও ততদিনে সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন।
আবার দরবারে আসার সময় তিনি খুব বৃদ্ধও ছিলেন না। এই দুই শর্ত সবচেয়ে ভালোভাবে মেলে ১৫০৬ থেকে ১৫২০-এর মাঝামাঝি কোনো একটি বছরের সঙ্গে। সেই যুক্তিতেই সংগীত-গবেষক বিমল রায় নির্দিষ্টভাবে ১৫১৬ সালকে তানসেনের জন্মসন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ম. ন. মুস্তাফা উল্লেখ করেছেন ১৫৩২ সালের কথা—যদিও তিনি নিজেই বলেছেন যে এই তারিখের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। আবার করুণাময় গোস্বামী তার ‘বাংলা গানের বিবর্তন’ বইয়ে তানসেনের জীবনকাল ধরেছেন ১৫০৫-১৫৮৫ সাল। এই মতভেদই বলে দেয়, তানসেনের প্রকৃত জন্মসাল আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।
তার প্রকৃত নাম নিয়েও মতভেদ কম নয়—কেউ বলেন রামতনু পাণ্ডে, কেউ বলেন তন্না মিশ্র বা তান্না মিশ্র। তার পিতার নাম মকরন্দ (বা মুকুন্দ) মিশ্র বা পাণ্ডে হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি ‘তানসেন’ নামটি যে আসলে একটি উপাধি, তার প্রকৃত নাম নয়—এ নিয়ে অনেক জীবনীকারই একমত। তবে এই উপাধি ঠিক কার কাছ থেকে এসেছিল তা নিয়ে মতান্তর আছে। কারও মতে গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের দরবার থেকে তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন, আবার কারও মতে স্বয়ং সম্রাট আকবরই তাকে এই নামে ভূষিত করেন। অধিকাংশ জীবনীকারই একমত যে গোয়ালিয়রের কাছাকাছি এক গৌড় ব্রাহ্মণ পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল।
তানসেনের ধর্মীয় পরিচয় ও সম্ভাব্য ধর্মান্তর নিয়ে পরবর্তী জীবনী ও জনশ্রুতিতে নানা পরস্পরবিরোধী কাহিনি পাওয়া যায়। তিনি আদৌ ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন কি না, হয়ে থাকলে ঠিক কবে ও কী কারণে হয়েছিলেন, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য নেই। একটি কাহিনি অনুযায়ী, মোগল ইতিহাসবেত্তা শাহনওয়াজ খাঁ তার ‘মিরাত-ই-আফতাবনামা’ বইয়ে লিখেছেন যে, তানসেনের জন্মই নাকি হয়েছিল গোয়ালিয়রের সুফি সাধক হজরত মুহাম্মদ গাউসের আশীর্বাদে।
কথিত আছে, পাঁচ বছর বয়সে তাকে আশীর্বাদের জন্য পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে পীর তার মুখে নিজের চিবানো পান তুলে দেন। এই দৃশ্য দেখে বাবা মকরন্দ মিশ্রের ধারণা হয় যে ছেলের জাতধর্ম নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে তিনি ছেলেকে পীর সাহেবের কাছেই রেখে চলে যান। এরপর ১৫৬২ সালে পীর সাহেবের মৃত্যু পর্যন্ত তানসেন নাকি তার কাছেই ছিলেন। আরেকটি জনশ্রুতিতে সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে বলা হয় প্রেমকুমারী নামক এক মারাঠি ব্রাহ্মণকন্যাকে ঘিরে, যিনি রাজা মানসিংহ তোমরের পতœী মৃগনয়নীর প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যাপীঠের ছাত্রী ছিলেন এবং সামাজিক চাপে পরিবারসহ ধর্মান্তরিত হয়ে হোসেনী নাম গ্রহণ করেন।
এই বর্ণনা অনুসারে, তাকে বিয়ে করার জন্যই রামতনু পাণ্ডে ইসলাম গ্রহণ করে ‘আতা আলী খাঁ’ নাম নিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। এসবের বাইরেও আরও কিছু ভিন্ন জনশ্রুতি প্রচলিত থাকলেও কোনোটির সপক্ষেই জোরালো বা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ফলে এই কাহিনিগুলোকে প্রামাণ্য ঘটনা হিসেবে নয়, বরং জনশ্রুতি হিসেবেই গণ্য করা প্রয়োজন।
সাধারণভাবে ধরা হয় যে, তানসেনের সংগীতজীবনের ভিত তৈরি হয়েছিল দুই ভিন্ন ধারার গুরুর সান্নিধ্যে—বৃন্দাবনের স্বামী হরিদাস, যিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা বহন করতেন এবং শেখ মুহাম্মদ গাউস কিংবা আদিল শাহ শূর, যারা পারস্য সংগীতের ঐতিহ্য বহন করতেন। এই দুই স্রোতের মিলনই পরবর্তীতে তার সংগীতে এক স্বতন্ত্র রূপ দেয়। এছাড়া গোয়ালিয়রের রাজসভার সংগীতজ্ঞ নায়ক বাইজু, গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের দরবার-গায়ক এবং কালাঞ্জরের শাসনকর্তার দরবার-গায়কের কাছেও তিনি তালিম নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আকবরের দরবারে আসার আগে তিনি রেওয়া রাজ্যের রাজা রামচন্দ্র বাঘেলার সভাগায়ক ছিলেন এবং সেখানেই যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
আকবর সিংহাসনে বসার সপ্তম বছরে (অর্থাৎ প্রায় ১৫৬২-৬৩ সালে) সম্রাট তানসেনের সুখ্যাতি শুনে তাকে আগ্রায় আনার জন্য দূত পাঠান। রাজা রামচন্দ্র তখন সম্রাটের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে বাদ্যযন্ত্র ও উপঢৌকনসহ তানসেনকে পাঠিয়ে দেন। সম্রাটের সামনে প্রথম সংগীত পরিবেশনের দিনই আকবর তাকে দুই লাখ টাকা ইনাম দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মোগল দরবারে তানসেনের এই প্রথম সংগীত-নিবেদনের মুহূর্তটি সম্রাটের নির্দেশে একটি চিত্রকর্মেও ধরে রাখা হয়েছিল, যার প্রতিলিপি পরে পার্সি ব্রাউনের ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান পেইন্টিং’ বইয়ে পুনর্মুদ্রিত হয়। আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরী’তে তানসেন সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন, তার মূল কথা হলো—শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এমন প্রতিভার দেখা মেলা ভার।
তানসেনের সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো ধ্রুপদ সংগীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাওয়া। তার হাতে সৃষ্ট বা পরিমার্জিত রাগগুলোর মধ্যে মিয়াঁ-কি-মালহার, মিয়াঁ-কি-টোড়ি, মিয়াঁ-কি-সারং এবং মিয়াঁ-কি-জয়জয়ন্তী উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নামের শুরুতে ‘মিয়াঁ’ যুক্ত অন্য যেসব রাগ প্রচলিত আছে, সেগুলোকেও প্রথাগতভাবে তানসেনেরই সৃষ্টি বলে ধরে নেওয়া হয়।
জনশ্রুতি আছে, কানাড়া অঙ্গের একটি রাগ গেয়ে তিনি আকবরের দরবারকে এমনভাবে মুগ্ধ করেছিলেন যে তখন থেকেই রাগটি ‘দরবারি কানাড়া’ নামে পরিচিতি পায়, যদিও এই কিংবদন্তির সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সূত্র যাচাই করা কঠিন। ধ্রুপদের গায়নরীতির পরিমার্জনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধ্রুপদের প্রচলিত গঠন—স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ—এই চার অঙ্গের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। তানসেন এই ধ্রুপদ-পরম্পরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে এর গায়নরীতি ও পরিবেশনশৈলীকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
যন্ত্রসংগীতেও তার অবদান অপরিসীম। তাকে রবাব যন্ত্রের বিকাশে এবং কারও কারও মতে রুদ্রবীণা ও রবাব উভয় যন্ত্রের উদ্ভাবনে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। আকবরের রাজসভার যে ছত্রিশ জন সংগীতজ্ঞের পরিচয় আবুল ফজল লিপিবদ্ধ করেছেন, সেই তালিকাতেও তানসেনের পুত্র তানতরঙ্গ খাঁ একজন কণ্ঠসংগীতশিল্পী হিসেবে স্থান পেয়েছিলেন। গোয়ালিয়রকেন্দ্রিক ধ্রুপদ-চর্চায় প্রচলিত চারটি প্রধান ‘বাণী’ বা গায়নরীতির (গৌড়হার, খাণ্ডার, ডাগর ও নওহার) মধ্যে তানসেন গৌড়হার বা গৌড়ী বাণীর চর্চাই বেশি করতেন। তার কন্যা সরস্বতীর সঙ্গে বীণাবাদক নবাৎ খাঁর বিবাহের সূত্রে তানসেনের বংশধারাও পরবর্তীকালে বীণা-চর্চার এক পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হয়, যা ‘বীণকার বংশ’ নামে পরিচিত।
কবি হিসেবেও তানসেনের কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য, যদিও তা তার গায়ক-খ্যাতির আড়ালে অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। তিনি ব্রজভাষায় পদ রচনা করতেন এবং তার রচনায় হিন্দু পুরাণ, প্রকৃতির বর্ণনা এবং সম্রাট আকবরের প্রশস্তি—উভয় ধারারই মিশ্রণ দেখা যায়। শিব, বিষ্ণু, সূর্য, গণেশ ও সরস্বতী প্রভৃতি দেবদেবীর মহিমা নিয়ে রচিত তার পদগুলোতে একজন প্রকৃত ভক্তহৃদয়ের পরিচয় স্পষ্ট। ‘রাগমালা’ ও ‘সঙ্গীতসার’ নামে দুটি সংগীত-গ্রন্থও তার রচনা বলে জানা যায়।
তানসেনের চার ছেলে—তানতরঙ্গ খাঁ, সুরত সেন, বিলাস খাঁ ও শরৎ সেন এবং এক মেয়ে সরস্বতীর কথা প্রচলিত আছে। এদের মধ্যে বিলাস খাঁ পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের দরবারে প্রধান সংগীতজ্ঞের মর্যাদা পান এবং ‘বিলাসখানি টোড়ি’ নামে নিজস্ব রাগ সৃষ্টি করেন। কন্যা সরস্বতীর বংশধারা থেকেই পরবর্তীকালে সদারঙ্গ (নিয়ামত খাঁ) আসেন, যিনি আঠারো শতকের প্রথমার্ধে খেয়াল গায়কিকে নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন।
তানসেনকে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত কিংবদন্তিটি দীপক রাগকে কেন্দ্র করে। কথিত আছে, এই রাগ গাইলে প্রদীপ আপনাআপনি জ্বলে উঠত। এমনকি একবার তিনি গাওয়ার সময় নিজেই আগুনের তাপে দগ্ধ হয়েছিলেন এবং তার মেয়ে সরস্বতী ও সাধিকা রূপবতী মেঘমল্লার গেয়ে বৃষ্টি নামিয়ে তাকে সুস্থ করেন।
এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণসাপেক্ষ হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তার কণ্ঠস্বর মানুষের মনে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে বাস্তব আর কিংবদন্তির পার্থক্য মুছে গিয়েছিল। তানসেনকে ঘিরে জনশ্রুতি এতটাই গভীরে গেঁথে গিয়েছিল যে, কালক্রমে তাকে ভুলবশত সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নবরতœ সভার সদস্য বলেও ধরে নেওয়া হতো, যদিও দুজনের সময়ের ব্যবধান প্রায় হাজার বছরের। এই জনপ্রিয় ভুল ধারণা নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তার ‘হাসির গান’ (১৯০০) সংকলনে ‘তানসান-বিক্রমাদিত্য-সংবাদ’ নামে একটি ব্যঙ্গ-রচনা লিখেছিলেন, যেখানে কবি নিজেই কৌতুকের ছলে এই কালানুক্রমিক অসংগতিটি তুলে ধরেন।
তানসেনের মৃত্যুসন নিয়েও মতভেদ রয়েছে; বিভিন্ন বিবরণে ১৫৮৬ ও ১৫৮৯ সালের উল্লেখ পাওয়া গেলেও ১৫৮৯ সালটিই বহুল স্বীকৃত। গোয়ালিয়রে তার গুরু হজরত মুহাম্মদ গাউসের মাজারের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।
তানসেনের কণ্ঠে সত্যিই প্রদীপ জ্বলেছিল কি না, কিংবা মেঘমল্লারের সুরে সত্যিই বৃষ্টি নেমেছিল কি না—ইতিহাস আমাদের সেই নির্ভরযোগ্য উত্তর দেয় না। কিন্তু ইতিহাস যে সত্যটি স্পষ্ট করে, তা হয়তো অলৌকিকতার চেয়েও বড়। তার সাধনা, সৃষ্টিশীলতা ও সংগীতচর্চা এমন এক উত্তরাধিকার তৈরি করেছিল, যার প্রভাব তার মৃত্যুর বহু শতাব্দী পরেও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে অম্লান। হয়তো সেখানেই তানসেনের আসল জাদু—প্রকৃতিকে বদলে দেওয়ার কোনো অলৌকিক ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের মন ও সংগীতের জগৎকে বদলে দেওয়ার অসামান্য ক্ষমতায়। তাই আজও দরবারি কানাড়ার আলাপে কিংবা মিয়াঁ-কি-মালহারের বর্ষণমুখর সুরে তানসেন চিরকাল বেঁচে থাকেন।
