৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

খরতাপে ঘি ঢালে রান্নার চুলার তাপ, নারীর শরীরে আর কত সয়

“বাইরেত গরম, লগে চুলার আগুন– মাইঝে মাইঝে মনে অয় দোজখের সমান গরম,” বলেন গৃহকর্মী শিলা।

খরতাপে ঘি ঢালে রান্নার চুলার তাপ, নারীর শরীরে আর কত সয়
ঢাকার কমলাপুরে ‘সর্দার কলোনি’ নামে পাঁচতলা এ ভবনে রয়েছে কয়েকটি রান্নাঘর; সেগুলোতে দিনভর পালাক্রমে রান্না করেন গৃহকর্মীরা।

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Sep 2026, 01:51 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

প্রচণ্ড গরমে যখন হাঁসফাস করছে মানুষ, সেই মুহূর্তে দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ করছেন গৃহকর্মী শিলা।

ভাদ্রের তাল পাকা গরম শরীর ঘামালেও রান্নার চুলার তাপে তার শরীর জ্বলে। সংসারের হালে পানি দিতে এ কাজ ছেড়ে থাকারও উপায় নেই। দিনভর বাসাবাড়িতে রান্না সেরে রাতে বাসায় ফিরে স্বামী-সন্তানদের জন্যও চলে সেই একই কাজ।

রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডির রায়েরবাজার এলাকার ভাড়া বাড়িতে থাকেন শিলা। পুরনো সেই বাড়িতে সাত-আটটি পরিবারের বসবাস। তবে সবার ঘর আলাদা হলেও রান্নার ঘর একটিই। ফলে সিরিয়াল ধরে দিনের প্রায় সবসময়ই চলে রান্না। তাতে রান্নার ঘর হয়ে থাকে ইটভাটার মত।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে শিলা বলেন, “গ্যাসের চুলা থাকলেও রান্ধন ঘরডার জানলা অনেক ছোড। এত ছোড যে, বাতাস ঢুকতে পারে না। বাইরেত গরম, লগে চুলার আগুন– মাইঝে মাইঝে মনে অয় দোজখের সমান গরম।

“সারাডা দিন মাইনষের বাড়িত আর রাত্তিরে এই ছোড রান্দনের ঘরে রান্দি। ঘুমের সময় শরীর জ্বলে। গরমে মাথা ঘুরায়, জ্বরও আয় মাইঝে-মইধ্যে। কিন্তু কী করমু, কাম তো করতেই হইব।”

‘চুলার তাপ ও ধোঁয়া থেকে’ ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালে মারা যান নওশিন মৌলির দাদি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ‘ব্র্যাক জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথে’ কর্মতর আছেন মৌলি।

সংসারের চাকা ঘোরাতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও বিভিন্ন বাসাবাড়ি বা মেসে রান্নার কাজ করছেন নারীরা। ঢাকার কমলাপুরের ‘সর্দার কলোনি’ থেকে তোলা।

সংসারের চাকা ঘোরাতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও বিভিন্ন বাসাবাড়ি বা মেসে রান্নার কাজ করছেন নারীরা। ঢাকার কমলাপুরের ‘সর্দার কলোনি’ থেকে তোলা।

তিনি বলেন, “চিকিৎসকরা বলেছিলেন দীর্ঘদিন খড়ির চুলার তীব্র তাপ ও ধোঁয়াতে রান্না করার কারণে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন দাদি এবং পরে তিনি মারা যান।

“চুলার ধোঁয়া, তাপের কারণে বিভিন্ন রোগ বা মৃত্যু হলেও অনেক নারীই এর মূল কারণ জানতে পারছেন না। চুলার তাপ স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা নারী-পুরুষ সবার কাছে মারাত্মকভাবে অবেহেলিত।

“ধোঁয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কিছুটা আলোচনা হলেও চুলার তীব্র তাপ ও তাপদাহের উত্তাপ নারী স্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা উপেক্ষা করেন পরিবারের সদস্যরাও।”

চুলা থেকে নির্গত তাপ অর্থাৎ ‘রেডিয়েন্ট’ (চুলার আগুন বা গরম ধাতব পৃষ্ঠ থেকে সরাসরি বিকিরিত তাপ) ও ‘কনভেকটিভ হিট’ (চুলার আগুন থেকে সৃষ্ট গরম বাতাস বা ধোঁয়ার মধ্যে থাকা উত্তাপ) নারীর শরীরে চাপ সৃষ্টি করে। নানা রকমের শারীরিক জটিলতা তৈরি হলেও সে নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা নেই।

আবার তাপপ্রবাহ ও চুলার তাপের কারণে পানিশূন্যতা, হিট-র‍্যাশ, মাথাঘোরা, রক্তচাপ ওঠানামা থেকে শুরু করে গর্ভবতী নারীর অতিরিক্ত ঝুঁকি— সবই এই দীর্ঘ তাপপরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন বিষয় সংশ্লিষ্টরা।

রান্নাঘর কেমন হওয়া দরকার?

গ্রাম বা শহরে ছোট রান্নাঘর, পাতলা টিন/টালি ছাউনি, জানালা-ভেন্টিলেশনের ঘাটতিসহ নানা সমস্যাই পরিচিত। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তির রান্নাঘর টিনের। নেই ভালো চুলা। সিরিয়াল দিয়ে দিনভর রান্নার কারণে ঘর প্রচুর গরম হয়ে থাকে।

বাসা-বাড়িতেও তাপবান্ধব চুলা ও চিমনির সুবিধাও খুব বেশি দেখা যায় না। কাঠামোগত এসব সীমাবদ্ধতায় চুলার তাপ জমে থাকে ভেতরে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ: হেলদিয়ার হোমস থ্রু ইমপ্রুভড কুকস্টোভস’ এর তথ্য অনুযায়ী, উন্নত চুলা ব্যবহারে রান্নাঘরের ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা ২০ শতাংশের বেশি এবং কার্বন মনোক্সাইড প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে। এতে রান্নাঘরের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে সহনীয় হয় এবং নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমে।

ঢাকার কমলাপুরে ‘সর্দার কলোনি’ নামে পরিচিত পাঁচতলা এ ভবনটিতে থাকেন শিক্ষার্থী-চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের সবার জন্য পালাক্রমে দিনভর চলে রান্না।

ঢাকার কমলাপুরে ‘সর্দার কলোনি’ নামে পরিচিত পাঁচতলা এ ভবনটিতে থাকেন শিক্ষার্থী-চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের সবার জন্য পালাক্রমে দিনভর চলে রান্না।

একই প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, রান্নাঘরের তাপ ও দূষণজনিত কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৪৩ লাখ মানুষ মারা যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় এক লাখের বেশি মৃত্যু ঘটে। 

গবেষণাটিতে আরো দেখা গেছে, প্রচলিত চুলায় উৎপন্ন তাপের ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ অপচয় হয়, যা রান্নাঘরকে আরও গরম করে তোলে। উন্নত চুলা এই অপচয় কমিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর পার্ট–৩ (হাউজিং), ধারা বি.৪.৫ (রান্নাঘর) অনুযায়ী, দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি বাড়িতে আলাদা রান্নাঘর থাকলে তার ন্যূনতম আয়তন ৩ দশমিক ২৫ বর্গমিটার এবং ন্যূনতম প্রস্থ ১ দশমিক ৬ মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে রান্নাঘর বা রান্নার স্থানের ন্যূনতম উচ্চতা কমপক্ষে ২ দশমিক ১৫ মিটার থাকতে হবে।

অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট বাসায় এই নিয়ম না মানা প্রসঙ্গে আর্কিটেক প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ এর স্থপতি অনুপ কুমার বসাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকা শহরে বেশিরভাগ ফ্ল্যাটই ১১০০ থেকে ১২০০ বর্গফুটের হয়। এসব বাসার রান্নাঘর ৫/৭ বা ৭/৯ ফুটের বেশি হয় না। আর জানালা বা ভেন্টিলেশনের জন্য স্থান থাকে ৩/৪ ফুট। অথচ নিয়ম মেনে করলে রান্নাঘর অবশ্যই দুই-তিনজন একইসঙ্গে কাজ করতে পারবেন, এমন আয়তনের হওয়া উচিত। অর্থাৎ মাঝারি আকারের এমন ফ্ল্যাটে ৯/১১ ফুট রান্নাঘর ও জানালা ৭/৭ ফুট হওয়া উচিত।”

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রান্না করতে গিয়ে চুলার উত্তাপে শরীর চুইয়ে ঘাম ঝরে, তবুও এই কাজ ছাড়া তাদের উপায় নেই।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রান্না করতে গিয়ে চুলার উত্তাপে শরীর চুইয়ে ঘাম ঝরে, তবুও এই কাজ ছাড়া তাদের উপায় নেই।

নব্বইয়ের দশকের বাসাবাড়ির উদাহরণ টেনে অনুপ কুমার বসাক বলেন, “এখন ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্টগুলো খুব কমপ্যাক্ট হয়। কিন্তু ২০ বছর আগের নির্মাণে সঠিক কাঠামো ও নিয়ম কম্প্রোমাইজ করা হত না। রান্নাঘরে ব্যবহার হত খোলা জানালা, যা তাপ ও ধোঁয়া বের করার জন্য সহায়ক। আর এখন রান্নাঘরে থাই গ্লাস ব্যবহার হয় যা জানালার অর্ধেক জায়গাই বন্ধ করে দেয়। সেক্ষেত্রে গ্রিল ব্যবহারে গরম বাতাস ও তাপ বের হওয়ার বেশি স্থান পাওয়া যায়।।”

তার পরামর্শ, “গরমকালে বাতাস দক্ষিণ–পূর্ব দিক থেকে আসে। তাই রান্নাঘর হতে হবে উত্তর–পশ্চিম দিকে যেন বাতাস প্রাকৃতিকভাবেই বের হয়ে যায়। এছাড়া এখন একজনের চিন্তা করে রান্নাঘর নকশা করা হয়, এতে রান্নাঘর আর অন্য ঘরের মধ্যে বৈপরীত্ব আসে।

“একক পরিবারে রান্নাঘর অন্য স্থানের সঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা উচিত। সেক্ষেত্রে খোলা রান্নাঘর ভালো বিকল্প। তাপ ধরে রাখে না এমন ইট, রঙ, পুটিংয়ের মতো উপাদান রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের রান্নাঘরে রান্নার ধরন অনুযায়ী তা উপযোগী নয়। সেক্ষেত্রে গ্লাস বা টাইলসে জমা তেল ও মসলা পরিষ্কার করা যায়। এ ছাড়া অন্য ঘরের সঙ্গে ভিজ্যুয়াল যোগাযোগ রাখা, ইন্ডাকশন বা তাপবান্ধব চুলা, চিমনি, এগজস্ট ফ্যান সবই স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘরে থাকা উচিত।” 

ব্র্যাকের রিসার্চ অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিভিশনের (আরইডি) মাঠসমীক্ষা ‘বাংলাদেশে বিদ্যমান উন্নত চুলার মূল্যায়ন’ এ দেখা গেছে, চিমনিযুক্ত উন্নত চুলা এবং রান্নাঘরের বিন্যাস রান্নার সময় নারীদের আরাম বাড়াতে সহায়ক। কারণ এই ধরনের চুলায় উৎপন্ন তাপ ও গরম গ্যাস সহজেই বাইরে বের হয়ে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিমনিভিত্তিক চুলায় জ্বালানি দহন ও তাপ বিনিময়ের দক্ষতা বেশি হওয়ায় রান্নাঘরে জমে থাকা অতিরিক্ত উত্তাপ ও অস্বস্তি অনেকটাই কমে।

‘অদৃশ্য হিট জোন’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০২১’ অনুযায়ী, নারীরা তাদের দৈনন্দিন সময়ের বড় অংশ ব্যয় করেন অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে, যার মধ্যে রান্না ও খাবার তৈরি অন্যতম। এই কাজে নারীদের সময় ব্যয় পুরুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তথ্য বলছে, নারীরা দিনে প্রায় ৭ ঘণ্টা অবৈতনিক কাজ করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের এক গবেষণা বলছে, এই অবৈতনিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ‘প্রায় ১৫ শতাংশের সমান’। নারীদের দীর্ঘ সময় ঘরের কাজে বিশেষ করে রান্নাঘরে ব্যয় করতে হয়, যা তাদের শারীরিক পরিশ্রম ও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

চুলার তাপ আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ— এ দুইয়ের মাঝে লম্বা সময়ে আটকে থাকা নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি ‘অনেকটাই উপেক্ষিত’, বলেন ব্র্যাকের ‘ব্র্যাক জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ এর সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা মিশা। 

ঢাকার কমলাপুরে ‘সর্দার কলোনি’ নামে পাঁচতলা এ ভবনের একটি রান্নাঘরে রান্নার কাজ করছেন গৃহকর্মীরা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা রান্না করতে গিয়ে তারা হাঁপিয়ে ওঠেন।

ঢাকার কমলাপুরে ‘সর্দার কলোনি’ নামে পাঁচতলা এ ভবনের একটি রান্নাঘরে রান্নার কাজ করছেন গৃহকর্মীরা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা রান্না করতে গিয়ে তারা হাঁপিয়ে ওঠেন।

রান্নাঘরকে ‘অদৃশ্য হিট জোন’ বর্ণনা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অধ্যাপক ফারজানা মিশা বলেন, “চুলা জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই রান্নাঘরের বায়ুর মান খারাপ হতে থাকে। আর এই অবস্থার মধ্যেই কয়েক ঘণ্টা বসে রান্না করতে হয় নারীকে। খড়ির চুলা, প্রাকৃতিক গ্যাস অথবা এলপিজি সিলিন্ডার চুলা- সবগুলোর প্রভাবই একই।

“এ বিষয়ে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক কাজও রয়েছে, যার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘বন্ধু চুলা’। এই চুলা এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যে চুলার ধোঁয়া কাছে আসবে না এবং দূষণও অনেকটা কম থাকবে।”

নারীর স্বাস্থ্যে প্রভাব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রা বেড়েছে ‘অস্বাভাবিকভাবে’। তাপপ্রবাহ ও রান্নার চুলা থেকে তৈরি তাপ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নারীর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।

‘অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল স্টাডি অন টেম্পারেচার, রিলেটিভ হিউমিডিটি অ্যান্ড কনসেন্ট্রেশনস অব সিও অ্যান্ড সিওটু ডিউরিং ডিফারেন্ট কুকিং প্রসিডিউরস’ গবেষণায় দেখা গেছে, রান্নার সময় চুলার আশেপাশের বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় ‘১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস’ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাই তাপপ্রবাহ চলার সময় রান্নাঘরে যোগ হয় বাড়তি তাপমাত্রা।

গত কয়েক বছরে নারীদের তাপজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ‘কয়েকগুণ বেড়েছে’ মন্তব্য করে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, “তাপজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা দুই রকম হতে পারে। প্রথমত যা সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় অর্থাৎ মাথা ঘোরানো, বমিভাব, জ্ঞান হারানো, ঘাম হওয়া, হৃদকম্পন বেড়ে যাওয়া, মাথা ব্যথা, দুর্বলতা, শরীর জ্বালা করা, চোখ লাল হওয়া, ডায়াবেটিসের জটিলতা বাড়া।

“আর দ্বিতীয়ত দীর্ঘমেয়াদি অসুখ এবং ধীরে ধীরে শরীরে তৈরি হয়। শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে সংক্রামণ, চোখের সমস্যা, কিডনি, ইউটিআই বা ইউরিন ইনফেকশন, ক্যানসার, হৃদরোগ, মাথার নানা অসুখ।”

তিনি বলেন, “তীব্র গরমে গর্ভবতী নারীদের পানিশূন্যতা হলে অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা তরল কমে যায়, যা প্রসবে জটিলতা তৈরি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত তাপে মাসিক চলাকালীন নারীদের ‘হট ফ্লাশ’ (সাধারণত শরীরের হরমোন পরিবর্তনের কারণে) হতে পারে। মাসিক চক্রে অনিয়ম হয়, তীব্র অবসাদ, দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সংকটও দেখা যায়।”

উপায় কী

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালের ব্রেস্ট, কলোরেক্টাল এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ রাকা মুস্তারী খান বলেন, “তীব্র তাপদাহ ও চুলার কাছে রান্নার সময়ে মায়েদের অতিরিক্ত ঘাম হয়, যা ব্রেস্ট ফিডিংয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শিশু পরিমাণ মতো মায়ের দুধ না পাওয়ায় তৈরি হয় অপুষ্টি। শহরের বাসাবাড়ির গ্যাসের চুলা বা গ্রামের মাটির চুলা দুটোরই স্বাস্থ্য ক্ষতি একইরকম।”

রান্নাঘরের জানালা খুলে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা বা ফ্যান/এক্সহস্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসক রাকা মুস্তারী খান।

এ ছাড়া হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক ও বিছানার চাদর ব্যবহার, ঠান্ডা পানিতে গোসল করা, ভেজা কাপড় বা হালকা ভিজে জামা দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখা, নিয়মিত প্রতি ঘণ্টায় এক কাপ এবং প্রতিদিন অন্তত ২–৩ লিটার পানি পানের পরামর্শও দিচ্ছেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন নারী স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব ফেলছে, সেখানে যথাযথ গুরত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন অন হিট-রিলেটেড ইলনেস’ (২০২৪) এ তাপজনিত রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনো পেশাভিত্তিক ‘হিট ইনস্যুরেন্স’ বা ছুটি অন্তর্ভুক্ত কিংবা পলিসি মেকিংয়ে নারীদের তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সংক্রান্ত তেমন কোনো কার্যক্রম সম্পর্কে জানা নেই।”

জনসংখ্যার দিক দিয়ে নারী-পুরুষ ‘সমান’ হলেও স্বাস্থ্য সুবিধায় নারীরা অনেক বেশি পিছিয়ে আছে বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিষয়ে সিধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণত পুরুষদেরই হয় এবং এ বিষয়ে পুরুষদের মনোযোগও কম থাকে। আবার অনেকক্ষেত্রে নারীরাও স্বাস্থ্যজনিত বিষয়গুলো চেপে রাখেন। তাই তাপদাহসহ যেকোনো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে নারীরাই বেশি থাকেন এবং তাদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি একেবারেই অবহেলিত থাকে।

“বর্তমানে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা যথেষ্ট না। আরও নারীবান্ধব ইতিবাচক উদ্যোগ প্রয়োজন।”