০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘বিশ্বাসই হচ্ছে না আপনি আর নেই’: নানা পাটেকরের প্রয়াণে সহশিল্পীদের শোক

নানা পাটেকরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে অভিনেতা অক্ষয় কুমার লিখেছেন, "এমন কণ্ঠ ও সততা বিরল।”

‘বিশ্বাসই হচ্ছে না আপনি আর নেই’: নানা পাটেকরের প্রয়াণে সহশিল্পীদের শোক

অভিনেতা ও নির্মাতা নানা পাটেকর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 07:35 PM

Updated : 08 Oct 2026, 07:35 PM

পর্দার নানা পাটেকরের সেই উদাত্ত কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ চাহনি আর বাঁধভাঙা অভিনয় সবই এখন স্মৃতি।

বৃহস্পতিবার ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই শক্তিমান অভিনেতা। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

তার আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গণের অভিনয়শিল্পীরা প্রকাশ করেছেন শোক, খুলেছেন স্মৃতির ঝাঁপি।

অক্ষয় কুমার, রিতেশ দেশমুখ, জুনিয়র এনটিআর, সঞ্জয় দত্ত থেকে শুরু করে, সানী দেওল, অনুপম খেরের মত অভিনয়শিল্পীরা সোশাল মিডিয়ায় প্রিয় ‘নানা জি’র সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ও তার অভিনয়ের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

এমন কণ্ঠ ও সততা বিরল: অক্ষয় কুমার

‘ওয়েলকাম’ ও ‘হাউসফুল ৫’ সিনেমায় নানা পাটেকরের সঙ্গে অভিনয় করা বলিউডি অভিনেতা অক্ষয় কুমার তার আকস্মিক মৃত্যুতে বিস্ময় প্রকাশ করে ফেইসবুকে লিখেছেন, "নানা জির প্রয়াণের খবরে অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি ছিলেন সেই বিরল অভিনেতাদের একজন, পর্দায় যার উপস্থিতি দর্শকদের সোজা হয়ে বসতে বাধ্য করত।

“তার সেই কণ্ঠ, অভিনয়ের সততা ও গভীরতা একেবারেই নিজস্ব ছিল। তিনি সত্যিই অনন্য ও অসাধারণ ছিলেন।”

অক্ষয় লিখেছেন, শুটিং সেটের বহু স্মৃতি সারা জীবন হৃদয়ে আগলে রাখব। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আপনি আর নেই। সব স্মৃতির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে কথা দিয়ে বোঝানোর চেয়েও বেশি মিস করব।"

‘গামন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা করা নানা পাটেকর ‘পরিন্দা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’ এর মত সিনেমার মধ্য দিয়ে পৌঁছে যান দর্শকের হৃদয়ে। যে কোনো চরিত্রে তার উপস্থিতিই ছিল পর্দার মূল আকর্ষণ।

বাস্তব জীবনে স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব আর সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার মনোভাব তাকে পৌঁছে দিয়েছিল অন্য উচ্চতায়।

মনে হচ্ছে যেন ট্রাক এসে ধাক্কা দিল: রিতেশ দেশমুখ

‘ব্লাফমাস্টার’ ও ‘হাউসফুল ৫’ চলচ্চিত্রে নানা পাটেকরের সঙ্গে পর্দা ভাগ করা অভিনেতা রিতেশ দেশমুখ এই খবরে বিরাট আঘাত পেয়েছেন।

এক্সে দেওয়া পরপর দুটি শোকবার্তায় রিতেশ লিখেছেন, "আমি কতটা স্তব্ধ তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন একটা ট্রাক এসে আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে গেল।

“নানা পাটেকরজির প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় অভিনেতা; নিজের অনন্য অভিনয়শৈলী দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। এমন কোনো চরিত্র ছিল না যা তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন না। নায়ক, ভীতিকর খলনায়ক কিংবা পোকার-ফেসড কৌতুক, সব কিছুতেই তিনি ছিলেন সেরা।"

পর্দায় কাজের বাইরে নানা পাটেকরের সামাজিক কাজের কথা স্মরণ করে রিতেশ লিখেছেন, "তিনি পর্দার বাইরেও আসল নায়ক ছিলেন। দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিরলস কাজ করে গেছেন।

“হিন্দি সিনেমায় উনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলেও, অন্তত একটি মারাঠি চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার একটি প্রবল ইচ্ছা ছিল, যা চিরকালের জন্য অপূর্ণই থেকে গেল। তার পরিবার, প্রিয়জন ও কোটি কোটি অনুরাগীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। সত্যি একটি যুগের অবসান।"

নানা পাটেকরকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের 'অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন দক্ষিণী চলচ্চিত্রের অভিনেতা জুনিয়র এনটিআর।

এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "নানা পাটেকর স্যারের প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। তার রূপায়িত প্রতিটি চরিত্রে এক ধরনের অকৃত্রিম সততা ও তীব্রতা থাকত। তার অভিনয় দেখে কখনো অভিনয় মনে হত না, মনে হত যেন পর্দার সামনে সত্যিকারের জীবন ফুটে উঠছে। তিনি এমন একজন মহান শিল্পী, যার অবদান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওম শান্তি।"

‘শো শেষে খবরটা পাই’: অনুপম খেরের আবেগঘন স্মৃতি

বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা অনুপম খের নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবরটি যখন শুনেছেন তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের একটি থিয়েটারে অভিনয় শেষ করেছেন। নাটক পরিবেশন শেষ করে ব্যাকস্টেজে যাওয়ার পর নির্দেশক গজেন্দ্র তাকে নানা পাটেকরের প্রয়াণের খবরটি দেন।

এক ভিডিও বার্তায় নানা পাটেকরকে নিয়ে শোক প্রকাশ করে অনুপম খের বলেন, "খবরটা শোনার পরও আমাকে বাইরে এসে ভক্তদের সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে, ছবি তুলতে হয়েছে, হাসতে হয়েছে এবং নৈশভোজে বসতে হয়েছে, যা ভেতর থেকে গিলে ফেলা ভীষণ কঠিন ছিল। তবে আমার মনে হয়েছে, নানা থাকলে হয়ত এটাই চাইতেন যে আমি যেন দর্শক ও কাজের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আগে শেষ করি।"

নানা পাটেকরের চিরচেনা স্পষ্টভাষী স্বভাবের কথা তুলে ধরে অনুপম খের বলেন, "নানা যদি এখন থাকত, তবে হয়ত আমাকে ধমক দিয়ে বলত, ‘আরে, তাতে কী হয়েছে? মরে গেছি তো কী এমন বড় ব্যাপার? সবাইকেই তো একদিন মরতে হবে!’ এমনই ছিলেন তিনি, একদম ঋজু, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়া।"

অনুপম খের বলেন, "তোমাকে খুব মিস করব বন্ধু! তোমার ভালোবাসার সেই উষ্ণতা, শক্ত করে জড়িয়ে ধরা, আর পর্দায় তোমার অসাধারণ সব অভিনয়। যখনই তোমার কথা খুব মনে পড়বে, তোমার সিনেমাগুলো দেখে নেব। যদিও আজকের এই দিনে বড্ড ইচ্ছে করছে, যদি আর একটিবার তোমাকে শুধু জড়িয়ে ধরতে পারতাম!"

ফেইসবুকে নিজের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত লিখেছেন, "এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে আমার ভাই, আমার বন্ধু নানা আর আমাদের মাঝে নেই। একসঙ্গে কাটানো সময়গুলোর এত সুন্দর সুন্দর স্মৃতি আছে, যা সারাজীবন আমার হৃদয়ে থাকবে।

“তার চলে যাওয়াটা শুধু তার ভালোবাসার মানুষের জন্যই নয়, পুরো চলচ্চিত্র জগতের জন্যই এক বিরাট ক্ষতি। আমরা একজন অসাধারণ অভিনেতা, এক মহান শিল্পী আর চমৎকার একটা ভালো মনের মানুষকে হারালাম।"

অভিনেতা ও সংসদ সদস্য রবি কিষাণ লিখেছেন, "এত বড় স্টার হয়েও নানা পাটেকর সবসময় মাটির কাছাকাছি থাকতেন। মুম্বাইয়ের চকমকে জগতের মাঝে থেকেও তিনি নিজের মূল্যবোধ ও শিকড় কখনো ভোলেননি।"

নানা পাটেকরকে ‘অভিনয়ের ঈশ্বর’ হিসেবে বর্ণনা করে শোক প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মা।

চলচ্চিত্র নির্মাতা আনন্দ মহাদেবন পুরনো ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, "এই খবর সহ্য করার মত নয়, স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসছে।"

এছাড়া অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, "এত স্বাস্থ্যবান ও ফিট একজন মানুষের এমন খবর সত্যিই ট্র্যাজিক।"

অন্য তারকাদের মধ্যে মাধবন, নিমরত কৌর, নীল নিতিন মুকেশ, প্রকাশ রাজসহ আরও অনেকে এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

অভিনেতা নানা পাটেকরকে বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকর অভিনয়ে আবেগ প্রকাশ, সংলাপ বলার ধরন এবং জটিল কিংবা প্রচলিত ধারার বাইরের চরিত্র ফুটিয়ে তোলায় দক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এ অভিনেতার ১৯৭৮ সালের ‘গামন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে। পরের দুই দশকে তিনি যেসব হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, তার মধ্যে রয়েছে—‘পরিন্দা’ (১৯৮৯), ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাক্ট’ (১৯৯১), ‘তিরঙ্গা’ (১৯৯৩), ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪) ও ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (১৯৯৬)।

শূন্য দশকের শুরুতে ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ (২০০২), ‘আব তাক ছাপ্পান’ (২০০৪), ‘অপহরণ’ (২০০৫) ও ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ (২০০৬) চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান।

নানা পাটেকর মারাঠি সিনেমাও করেছেন; তার মধ্যে রয়েছে ‘দেউল’, ‘ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো’, ‘নটসম্রাট’ ও ‘আপলা মানুষ’।

কমেডি চলচ্চিত্র ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭), এর সিক্যুয়েল ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ (২০১৫)-এ গ্যাংস্টার ‘উদয় শেঠি’ চরিত্রে অভিনয় করেও ব্যাপক প্রশংসা পান নানা পাটেকার। ‘হাউসফুল ৫’ কমেডি-থ্রিলার চলচ্চিত্রেও পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

২০১০ সালের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘রাজনীতি’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন নানা পাটেকর। এ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে পঞ্চমবারের মতো মনোনয়ন পান তিনি। নানা পাটেকর ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীও পেয়েছিলেন।