০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

সালমান শাহর সিনেমা শেষ করতে গিয়ে সেটে 'অঝোরে কেঁদেছিলেন' ওমর সানী

ওমর সানী বলেন, “অপরাধী যেই হোক না কেন, বিচারপ্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠু হয়। আশা করি সত্যিটা সবার সামনে আসবে।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Sep 2026, 02:59 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

চিত্রনায়ক সালমান শাহর অকালমৃত্যুর পর থমকে গিয়েছিল তার অভিনীত বেশ কিছু সিনেমার কাজ। সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল পরিচালক উত্তম আকাশের ‘কে অপরাধী’। 

পরবর্তীতে সালমান শাহর চরিত্রে অভিনয় করে সিনেমাটিকে আলোর মুখ দেখান নব্বই দশকের আরেক অভিনেতা ওমর সানী। 

অসমাপ্ত কাজটি সম্পন্ন করার নেপথ্য গল্প গ্লিটজের কাছে বলেছেন ওমর সানী। শুটিং করার সময় প্রয়াত সহশিল্পীর কথা মনে করে সে সময় নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারতেন না তিনি। রোববার সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। দিনটি ঘিরে গ্লিটজের সঙ্গে কথা হয় অভিনেতার।

ওমর সানী বলেন, ১৯৯৭ সালে মুক্তির পর ‘কে অপরাধী’ বড় ধরনের ‘ব্যবসায়িক সাফল্য পায়’।

তিনি বলেন, "নব্বইয়ের দশকে একের পর এক রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন পরিচালক উত্তম আকাশের বেশিরভাগ সিনেমাতেই আমি অভিনয় করেছিলাম৷ তবে ‘কে অপরাধী’ সিনেমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছিল।"

ওই সিনেমায় প্রথমে তার আর মৌসুমীর অভিনয় করার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন ওমর সানী। কিন্তু সে সময় তাদের কাজের ব্যস্ততা বেশি থাকায় পরিচালক উত্তমকে অন্য অভিনেতা-অভিনেত্রী খোঁজার নেওয়ার পরামর্শ দেন ওমর সানী।

“তখন প্রস্তাব আসে সালমান শাহ ও শাবনূরকে নেওয়ার, যা আমরা সানন্দে সমর্থন জানিয়েছিলাম।”

সালমান শাহকে মূল চরিত্রে নিয়ে সিনেমাটির শুটিং ঠিকঠাক শুরু হলেও তার মৃত্যুর পর তা মাঝপথে আটকে যায়। সিনেমাটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে এর পরিচালক ও প্রযোজক নতুন করে এতে লগ্নির কথা ভাবেন। শেষ পর্যন্ত প্রযোজক এবং সহশিল্পী শাবনূরের অনুরোধে অসমাপ্ত সিনেমাটিতে সালমান শাহর চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হন ওমর সানী।

তিনি বলেন, "উত্তমদা সেসময় আমার কাছে এসে বলেছিলেন, 'সানী কী করব, তুমি সিনেমাটা শেষ করে দাও', আমি তখন অঝোরে কেঁদেছিলাম, আমি যেদিন সিনেমার শুটিং করি, আমি বলছিলাম রেমুনারেশন আহামরি কোনো কিছু না। আমি এটা নিয়ে কোনো কথাও বলি নাই।" 

ওমর সানী যুক্ত হওয়ার পর নায়ক হিসেবে চরিত্রটি নতুন করে শুটিং করতে হয়। আবার আগে থেকে নায়িকা হিসেবে থাকা শাবনূরকেও দ্বিতীয়বারের মত দৃশ্যগুলোর শুটিংয়ে অংশ নিতে হয়েছিল।

ওমর সানী বলেন, "সিনেমাটিতে প্রথমে সালমান শাহকে যেভাবে লম্বা চুলে স্টাইলিশ লুকে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা ছিল, একইভাবে আমাকেও সেই লুকে ক্যামেরার সামনে আনা হয়। তবে আমরা তো দুইজন ভিন্ন মানুষ। একই রকম তো হয় না। আমি আমার মত সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”

গল্প ও লুকের বাইরেও নিজের আলাদা ব্যক্তিত্ব, সংলাপ পরিবেশন ও নিজস্ব বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে চরিত্রটিকে দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলেন বলে জানিয়েছেন ওমর সানী। 

অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘কে অপরাধী’। ওমর সানী ও শাবনূর জুটির ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম সফল ও আলোচিত সিনেমা হিসেবে স্থান করে নেয়।

‘ও আত্মহত্যা করার মত ছেলে ছিল না’

ওমর সানীর ভাষ্য, নতুন করে শুটিং শুরুর পর সেটে সালমান শাহর স্মৃতি সবসময় ছায়ার মত ঘুরে বেড়াত। ফ্লোরে সারাক্ষণই তাকে নিয়ে কথা হত বলে জানিয়েছেন ওমর সানী।

তিনি বলেন, “আমি সালমানকে খুব ভালোভাবে চিনতাম। ও কখনো আত্মহত্যা করার মত ছেলে ছিল না। ওর মৃত্যুর পর এফডিসিতে যখন মরদেহ আনা হয়, তখন আমি, মৌসুমী আর গুলজার ভাই সেখানে উপস্থিত ছিলাম। পরবর্তীতে যখন আমি ওর স্থলাভিষিক্ত হয়ে সিনেমাটির শুটিং করি, সেটে ওর কথা মনে করে অঝোরে কেঁদেছিলাম। আমি সবসময় সালমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করি।”

সালমান শাহর মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে ওমর সানী বলেন, “অপরাধী যেই হোক না কেন, বিচারপ্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠু হয়। আশা করি সত্যিটা সবার সামনে আসবে।”

সালমান শাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের আরও নানা স্মৃতি ও অজানা অধ্যায় রয়েছে জানিয়ে এই অভিনেতা বলেন, "সালমান শাহর সঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে, এখনো মনে পড়লে হাহাকার লাগে।"

চার বছরের অভিনয়জীবনে সালমান সিনেমা করেছেন ২৭টি। মৃত্যু রহস্য, অভিনয় ও ফ্যাশন নিয়ে সব প্রজন্মের কাছে এখনো চর্চিত নাম সালমান শাহ।

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দারিয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে জন্ম সালমান শাহর। শৈশবে সংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন ছায়ানটে, গেয়েছেন গানও।

বিনোদনজগতে সালমানের যাত্রা শুরু হয় বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে।

সোহানুর রহমান সোহানের পরিচালনায় নায়িকা মৌসুমীর বিপরীতে প্রথম সিনেমা 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' করে ১৯৯৩ সালে বাজিমাত করে দেন সালমান।

এ সিনেমার মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি উপহার পায় সালমান-মৌসুমী জুটি। তবে সালমানের ক্যারিয়ারের ২৭টি সিনেমার ১৩টির নায়িকাই ছিলেন শাবনূর।

'তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্নেহ’, ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘কন্যাদান’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘মহামিলন’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘প্রিয়জন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেমপিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুনের’ মতো সিনেমা উপহার দিয়েছেন সালমান।

সিনেমায় আসার আগেই সামিরা হককে বিয়ে করেছিলেন সালমান। ১৯৯৬ সালে ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।