‘ডেথ অব দ্য পাস্টর’স ওয়াইফ’: মিকার মৃত্যুর আগের ঘটনা তুলে ধরল যে সিরিজ
মিকার মৃত্যুর জন্য জন-পলকে দায়ী করেন কেউ কেউ, যদিও তদন্তে প্রমাণ মেলেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার একটি স্টেট পার্কে দুবছর আগে মিকা মিলার নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনার ১০ দিন পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মিকা আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ বলেছিল, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও, সাক্ষাৎকার, ঘটনাস্থলের আলামত এবং নর্থ ক্যারোলিনা মেডিকেল এক্সামিনারের পরীক্ষার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।
নেটফ্লিক্সের তিন পর্বের ডকুসিরিজ ‘ডেথ অব দ্য পাস্টর’স ওয়াইফ’-এ সেই ঘটনাগুলোই নতুন করে সামনে এনেছে।
৩০ বছর বয়সি মিকার মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও, তিনি মারা যাওয়ার আগে কী ঘটেছিল এবং কেন তিনি এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিলেন—সেটিই অনুসন্ধান করেছে সিরিজটি।
টাইম ম্যাগাজিন জানিয়েছে, মিকা মিলার ছিলেন এক পাদরির স্ত্রী। তার স্বামী জন-পল মিলার সলিড রক চার্চের ধর্মীয় নেতা। মৃত্যুর আগে মিকা তার পাদরি স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হতে চেয়েছিলেন। তিনি বাড়িও ছেড়ে আলাদা থাকছিলেন।
পাশাপাশি পুলিশের কাছে মিকা একাধিকবার অভিযোগ করেছিরেন, তাকে অনুসরণ ও হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি নিজের গাড়িতে একটি ট্র্যাকিং ডিভাইসও উদ্ধার করেন মিকা।
এরপর প্রাণনাশের ভয় পাচ্ছেন বলে পুলিশকে বলেছিলেন।
‘ডেথ অব দ্য পাস্টর’স ওয়াইফ’ সিরিজে অপ্রকাশিত ভিডিও, ব্যক্তিগত ডায়েরি, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের বক্তব্যের মাধ্যমে মিকার জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৯৪ সালে কানসাসের উইচিটায় জন্ম নেওয়া মিকা ফ্রান্সিস ছিলেন পরিবারের ছয় ভাইবোনের একজন।
মিকা কিশোরী বয়সে সলিড রক চার্চে যেতেন। তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় জন-পল মিলারের। ওই সময়ে জন-পল ছিলেন বিবাহিত এবং পাঁচ সন্তানের বাবা। পরে মিকা তার সন্তানদের দেখাশোনার কাজও করতেন।
২০১৫ সালে মিকা ও জন-পলের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় বলে মিকার পরিবারের ভাষ্য। তখন মিকার বয়স ২০, জন-পলের ৩৫।
জন-পল তার আগের সংসার থেকে বের হয়ে আসলে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর তারা বিয়ে করেন। মিকার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি।
বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই দুজনের দাম্পত্যে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে বলে দাবি করেছে মিকার বোন সিয়েরা ফ্রান্সিসের ।
তিনি বলেন, সমস্যা বাড়তে থাকায় মিকা ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর জন-পলও বিচ্ছেদের আবেদন করেন, সেটিও খারিজ হয়।
এর মধ্যেই মিকা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, তার গাড়ির চাকা কাটা হয়েছে। তার সন্দেহ ছিল কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
মৃত্যুর পর তার বোন সিয়েরা জানান, মিকা তাকে আগে বলেছিলেন, তার (মিকা) মাথায় গুলি লাগলে সেটি যেন আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া না হয়।
সিয়েরার ভাষ্য, মিকা স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও করেন পরিবারের সদস্য ও গির্জার লোকজনের কাছে।
২০২৪ সালের মার্চে মিকা স্বামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ চেয়েছিলেন। ১৫ এপ্রিল তিনি আবার বিচ্ছেদের আবেদন করেন। শুনানি হওয়ার কথা ছিল ৫ জুন।
এর মধ্যে তিনি জন-পলকে ছেড়ে আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে চলে যান।
২৫ এপ্রিল জন-পলকে বিচ্ছেদের কাগজও দেওয়া হয়।
এর দুদিন পর ২৭ এপ্রিল, নর্থ ক্যারোলিনার লাম্বার রিভার স্টেট পার্কে মিকার মরদেহ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে জন-পল দাবি করেন, তাদের সংসার কোনো সমস্যা ছিল না। তার কথায়, মিকা কেবল তার স্ত্রী ছিলেন না, পাশপাশি গির্জার সৃজনশীল পরিচালক ও তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও কাজ করতেন।
পুলিশের তদন্তে মিকা ‘আত্মহত্যা করেছেন’ বলে উঠে এলেও, তার পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের বক্তব্য এবং মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কয়েকজন সরাসরি জন-পলকে মিকার মৃত্যুর জন্য দায়ি করেছেন।
তবে কর্তৃপক্ষের ‘মিকার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত’ অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তার মৃত্যুর জন্য জন-পলের বিরুদ্ধে কোনো হত্যা মামলা হয়নি।
তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি জন-পলের বিরুদ্ধে সাইবার-স্টকিং এবং ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনে।
প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে মিকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার স্ত্রীকে নিয়মিত হয়রানি করেছেন, আর্থিক ও দৈনন্দিন জীবনে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং গাড়িতে ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এ ছাড়া মিকার অনুমতি ছাড়া তার একটি নগ্ন ছবি অনলাইনে প্রকাশ এবং গাড়ির টায়ার নষ্ট করার অভিযোগও আনা হয়েছে। জন-পল সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি ১ লাখ ডলারের বন্ডে মুক্ত আছেন।
তথ্যচিত্রে কী রয়েছে?
মৃত্যুর দিন বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে নিজের বাসা থেকে বের হন মিকা। দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে একটি পন শপ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি কেনেন।
এরপর উত্তর ক্যারোলাইনার একটি স্টেট পার্কে যান দিনি। বেলা ২টা ৫৪ মিনিটে ৯১১-এ ফোন করে জানিয়েছিলেন তিনি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন।
পরিবারের লোকজন যেন তার মরদেহ খুঁজে পান, সে জন্য ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার অনুরোধও করেন মিকা।
পরে একটি নদীতে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। মাথায় গুলির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছিল।
জন-পল মিকার মৃত্যুর খবর জানার পর বলেছিলেন, তার স্ত্রী মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন।
জুলিয়া উইলবি নাসন ও মাইকেল গ্যাসপারোর পরিচালনায় তথ্যচিত্রটি বানানো হয়েছে। নির্মাতারা জানিয়েছেন, মিকার পরিবারের অনুমতি নিয়ে তারা এসব ব্যক্তিগত আর্কাইভ সংগ্রহ করেছেন।
জন-পলকে মিকার হত্যার জন্য দায়ী করেন কেউ কেউ। তদন্তে অবশ্য সেই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পুলিশ বলছে, মিকা যেদিন মারা যান, জন-পল তখন সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টনে ছিলেন এবং সন্তানদের স্কুলের একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে উপস্থিত ছিলেন।
তবে মিকার মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত থামেনি।
