বেতন-ভাতার বিষয়ে সরকার ‘রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছেন না’: দেবপ্রিয়
তিনি মনে করেন, সরকার ক্ষমতায় এসেই ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা দিয়ে বাকিটুকু বাস্তবায়নে জন্য সময় চেয়ে নিতে পারত।
বিএনপি সরকারে আসার পর ছয় মাস পার হলেও সরকারি চাকুরেদের বেতন-ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি মনে করেন, সরকার ক্ষমতায় এসেই ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা দিয়ে বাকিটুকু বাস্তবায়নে জন্য সময় চেয়ে নিতে পারত।
সোমবার রাজধানীতে এক সংলাপে বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সিপিডির মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি চাকুরেদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এ বিষয়ে কথা বলেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় একটা কথা আমি বারবার আপনাদের বলব—এই শব্দটা আমি সচেতনভাবে ব্যবহার করছি। উনারা রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছেন না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং সংস্কারের ক্ষেত্রে।
“এবং এটার সবচেয়ে বড় একটা জায়গা হল আমাদের সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়। দেখুন, ছয় মাস হয়ে গেছে, আপনি এই বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কেন নিতে পারছেন না?”
সরকারের আর্থিক সক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “এই জিনিসগুলো তো আপনার ছয় মাস আগে জানার কথা ছিল। রিপোর্ট একটা দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাকে আপনি মূল্যায়ন করে বলবেন যে আমরা (সরকার) কতদূর পারব, কতদূর পারব না। আপনি সিদ্ধান্ত করেছেন যে দুই বছর ভাগে ভাগে দিবেন, সেটাও সকলে কোনোভাবে মেনে নিয়েছে।
“আমাদের নিজেদের ভিতরে কথা হয়েছে, এই সরকার এত দেরি না করে প্রথমেই একটা মহার্ঘ্য ভাতা দিয়ে দিতে পারত ২০-২৫ শতাংশ। ২০-২৫ শতাংশ দিয়ে সে (সরকার) প্রার্থনা করত, ‘সময় দেন আরেকটু, আমি বিবেচনা করি এটার (সময়) ভিতরে।’ সেই সময়টার ভিতরে হত।”
সরকারের উদ্দেশে দেবপ্রিয় বলেনর, “এখন আপনি যেখানে নিয়ে এসেছেন, এখন তো বড় কিছু করা ছাড়া আপনার উপায় থাকবে না। আপনি এই জায়গাটায় নিয়ে এসেছেন। ধাপে ধাপে এটা করার যে সুযোগটা প্রথমেই ছিল, সরকার এসে রাজনৈতিকভাবে সেটা তো করল না।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২০ দিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন।
বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থ বরাদ্দ রাখার কথা বলেছিলেন। পে কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে তা পরীক্ষা করার জন্য কমিটি করে দেওয়ার কথাও তিনি সে সময় বলেছিলেন।
তবে নির্বাচন পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজে হাত দেওয়ায় অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
বিগত সরকারের বাজেটে সেই অর্থের সংস্থান না থাকায় নতুন করে বরাদ্দ পেতে বাড়তি বেতন বাস্তবায়নে যে অর্থ রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে খরচের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল।
তাছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাড়তি দামে জ্বালানি ও নিত্যপণ্য আমদানিতেও খরচ বাড়ছে।
এরপর নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও আদতে এর সুযোগ থাকছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের-আইএম কাছে সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরুর আগ্রহের আলোচনার মধ্যে তাদের তরফে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থ সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পরে ২০২৫ সালে নতুন বেতন কমিশন গঠিত হয়। গত ২১ জানুয়ারি কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করে।
সে সময় কমিশনপ্রধান বলেছিলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখে পড়েন; তখন বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও কবে নাগাদ বাস্তবায়িত হবে তার সঠিক সময় এখনও মেলেনি।
এরমধ্যে পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমে বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা বাড়ানো প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, “আসলে ইংরেজিতে বলে ‘মানি ইজ ফানজিবল’। আপনি টাকাটা এনে যখন কোষাগারে জমা দেন, এরপর কোন টাকাটা আপনি শিক্ষাতে দিচ্ছেন, কোন টাকাটা স্বাস্থ্যতে দিচ্ছেন, ওইটা টাকার গায়ে তো লেখা থাকে না। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় আপনি কত শতাংশ এখানে দিচ্ছেন, কত শতাংশ ওখানে দিচ্ছেন—এইটা দিয়ে আমরা বুঝতে পারি।
“কিন্তু আমি এটুকু বুঝি, রাজনৈতিক সাহস এখানে দেখানোর ব্যাপার। আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে, ৮-১০ বছর এই মানুষগুলোর বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এবং ওখানে অনেক ধরনের মানুষ আছে। সেখানে সচিবও আছে, ওখানে দারোয়ান কর্মচারীও আছে। তাদের কথাও আপনার চিন্তা করতে হবে। সেহেতু ওইটা চিন্তা করে আপনার একটা রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে, নৈতিক ভিত্তিতে এইটার সমাধান করতে হবে।”
সরকার এ সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখলে ‘পরিস্থিতি আরও জটিল হবে’ বলে মনে করেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, “এটা যত দেরি হবে, তত বেশি কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে আমাদের মনে হয় এবং এটার ফলে সরকারের অন্যান্য কাজকর্মও কিন্তু ব্যাহত এবং বিঘ্নিত হবে।”
