অটোরিকশার ধাক্কায় সন্তান আহত, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ফেইসবুকে পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষোভ
অটোরিকশার ধাক্কায় ছোট্ট শিশুটি মাথা, মুখ ও হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে।
চট্টগ্রামে বাসার সামনে বেপরোয়া গতির ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় নিজের ৯ বছর বয়সি মেয়ে মারাত্মক আহত হওয়ার পর ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
তার ভাষ্য, “নিজের সন্তানের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে পারি না, অন্যের নিরাপত্তা কিভাবে দেব?”
খুলশী জালালাবাদ সোসাইটিতে সোমবার দুপুরের ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সেদিন রাতে ফেইসবুকে মেয়ের রক্তাক্ত ছবিসহ একটি পোস্ট দেন নাওয়াল আনসারি নামে শিশুটির বাবা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে পরিদর্শক পদে কর্মরত আনসারুল করিম। তার পোস্টটি এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ওই পোস্টে সাত শতাধিক মানুষ কমেন্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শেয়ার হয়েছে দেড় হাজারবারেরও বেশি। কমেন্টকারীদের অনেকেই ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করার দাবি তোলেন।
ছোট্ট নাওয়াল আনসারী নগরীর নাসিরাবাদ ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। অটোরিকশার ধাক্কায় সে মাথা, মুখ ও হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। ঘটনার পর দায়ি রিকশাচালক পালিয়ে যাওয়ায় তার পরিবার এখনো পুলিশে অভিযোগ করেনি।
এছাড়া মঙ্গলবার রাত মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে এখনো পুলিশের কাছে যাননি বলে জানান আনসারুল করিম।
ছোট্ট নাওয়ালের বর্তমান শারীরিক অবস্থা জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে আনসারুল করিম আরেকটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমার ছোট্ট অবুঝ মেয়েটার ৫ মাস আগের তোলা ছবি, গতকালের এক্সিডেন্টের পরের ছবি এবং এইমাত্র তোলা ছবির পার্থক্যটা একটু কষ্ট করে আপনারা নিজেরাই দেখেন। আমাদের অবুঝ সন্তানদের চেহারা থেকে শুরু করে শারীরিকভাবে বিকৃত করে দেওয়ার লিজ নিয়েই কি এই অবৈধ অটোরিক্সাগুলো রাস্তায় নামানো হয়েছে? এই বাংলাদেশে অবৈধ অটোরিক্সা চালানো ছাড়া কি অন্য কোনো কর্ম নাই, যে কর্ম করে তিনবেলা ভাত খাওয়া যায়?
“আজকে আমার অবুঝ সন্তানের জায়গায় আপনাদের অবুঝ সন্তানদের যদি এই বিকৃত চেহারায় দেখা লাগত, তখন আপনারা কি নিজেদেরকে কন্ট্রোল করতে পারতেন? মানবতাবাদী এমন কোনো মহামান্য বিচারপতি এবং এমন কোনো বিজ্ঞ আইনজীবী কি দেশে নাই যে, যিনি বা যারা এই বাংলাদেশের মানুষ আজরাইল রূপী এই অটো রিক্সা গুলো থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে একেবারেই নিষিদ্ধ করতে পারবেন?”
নাওয়ালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিদর্শক আনসারুল করিম মঙ্গলবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিকিৎসকের পরামর্শে নাওয়ালকে বাসায় আনা হয়েছে। বুধবার আবার হাসাপাতালে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করানোর নির্দেশনা দিয়েছেন চিকিৎসক।
“মেয়ের এখন যে চেহারা হয়েছে, চেনার উপায় নেই। খুব টেনশনে আছি। একবার সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। ডাক্তার আবার আগামীকাল নিয়ে যেতে বলেছেন। আগামীকাল আবার সিটি স্ক্যান করা হবে। তারপর ডাক্তার নিশ্চিত হতে পারবেন। আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এই বাবা বলেন, “প্রতিদিন আমি মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে তারপর অফিসে যাই। সোমবারও সকাল ৮টায় তাকে স্কুলে নামিয়ে দিই। কখনো ওর মা গিয়ে স্কুল থেকে আনে। অথবা প্রতিবেশী আরেক বাচ্চার মা দুজনকে সঙ্গে করে ছুটির পর বাসায় নিয়ে আসে।
“সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে উনাদের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরছিল টেক্সিতে করে। ঠিক বাসার সামনে টেক্সি থেকে নামে। এ সময় অতর্কিত একটা ব্যাটারি রিকশা আমার মেয়েকে ধাক্কা মারলে ও রাস্তায় পড়ে যায়। ওর মাথায়, মুখে ও দুই হাতে গুরুতর জখম হয়। ঘটনার পর শুরুতে নাওয়ালকে বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে এবং পরে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।”
ঘটনার বিষয়ে সোমবার রাতে ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে আনসারুল করিম লেখেন, “আমার এই মাসুম বাচ্চাটা তো কোন অপরাধ করে নাই। আমার এই বাচ্চাটি যদি নিজের বাসার নিচেও নিরাপদ না থাকে তাহলে আমার অথবা আমাদের এইরকম মাসুম বাচ্চারা অন্য কোথাও নিরাপদ বলে আমার মনে হয় না।
“বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামের প্রত্যেক সদস্যদের নিকট আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশ নামক এই পুরো দেশটাই কি তাইলে অবৈধ অটো রিকশা চালকদের কাছেই জিম্মি হয়ে থাকবে? দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করার বিধান এবং নিয়ম থাকলেও প্রশিক্ষণ এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন এই অবৈধ অটো রিকশা চালকদের বিরুদ্ধে কি দেশের প্রচলিত কোন আইনই প্রযোজ্য নয়?”
অবৈধ অটোরিকশার মাধ্যমে প্রশিক্ষণবিহীন চালকরা আর কত মায়ের বুক খালি করলে এবং আর কত অবুঝ বাচ্চাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে তাদের উপরও দেশের প্রচলিত আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত আসবে বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের সদয় দৃষ্টি কামনা করেন আনসারুল ইসলাম।
তিনি লেখেন, “সরকারি চাকরি করে নিজের অবুঝ সন্তানদের নিরাপত্তা যেখানে আমরা নিশ্চিত করতে পারি না, সেখানে আমরা কিভাবে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব, এটাই আমার প্রশ্ন।”
চট্টগ্রাম নগরী জুড়ে বিশেষ করে অলিগলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। পুলিশ নিয়মিত এসব রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তারপরও অধিক রাতে ও সকালের দিকে পুরো নগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে দেখা যায়।
