১৪ বছর ধরে ইন্টারপোলে ঝুলছে রেড নোটিস, সাজ্জাদকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেই
“ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন, মোবারক তাদের সবার নিয়ন্ত্রক বড় সাজ্জাদ। বিদেশে বসে সে তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ করিয়ে থাকে। তার পক্ষে যারা টাকা নিয়ে থাকেন সে টাকা বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে তার কাছে পাঠিয়ে দেন।”
ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির ১৪ বছর পরও চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদকে দেশে ফেরানো যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বিদেশে অবস্থান করেও তিনি অনুসারীদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গুলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও চাঁদা দাবির কয়েকটি ঘটনাতেও বড় সাজ্জাদের নাম এসেছে। এসব ঘটনায় তার অনুসারীদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের কাছে মূর্তিয়মান আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন এই বড় সাজ্জাদ। দেশ থেকে পাঠানো চাঁদাবাজির টাকায় বিদেশে তার বিলাসী জীবনের খবর আসছে। তারপরও তাকে ফেরানোর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সাজ্জাদ নিজের নাম-পরিচয় গোপন করে বিদেশে অবস্থান করছেন। এ কারণে তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাজ্জাদ আলী খান ইন্টারপোলে ‘সাজ্জাদ হোসেন খান’ নামে রেড নোটিসভুক্ত। ২০১২ সালে বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের পর তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হয়।
ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২০১৩ সালে
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০১২ সালে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিস জারি হওয়ার পর ২০১৩ সালে ভারত থেকে দুবাই যাওয়ার পথে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন সাজ্জাদ।
“বিষয়টি ওই সময় বাংলাদেশ পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সাজ্জাদকে ফেরানো যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ওই সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল।”
কয়েক বছর ভারতের কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে যান সাজ্জাদ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে সাজ্জাদ ভারতে অবস্থান করছেন মো. আব্দু্ল্লাহ নামে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে। সেখানে তার বাবার নাম দেওয়া হয়েছে হাজী শুক্কুর, মায়ের নাম দেওয়া হয়েছে হাজী জাহানারা বেগম। ঠিকানা লেখা হয়েছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা।
কে এই বড় সাজ্জাদ?
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলী এলাকার আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদের নাম আলোচনায় আসে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। তখন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত এই যুবক খুনসহ অনেক মামলার আসামি হন।
১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান নিজের বাড়ির সামনে খুন হয়। ওই সময় লিয়াকত হত্যায় সাজ্জাদের নাম উঠে আসে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে ওই মামলা থেকে খালাস পেয়ে যান তিনি। এরপর থেকে অপরাধ জগতে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে।
২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যায় জজ আদালতে সাজ্জাদের ফাঁসির রায় হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত থেকে এ মামলায় তিনি খালাস পান।
২০০০ সালে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে সাজ্জাদ দুবাই পালিয়ে যান বলে গুঞ্জন খবর আসে।
২০১২ সালে তাকে ধরতে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহায়তা চায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। এরপর তারে নামে ‘রেড নোটিস’ জারি হয় ইন্টারপোলে।
চট্টগ্রামে থাকাকালে নুরুন্নবী ম্যাক্সন ও সরোয়ার হোসেন বাবলাকে নিয়ে অপরাধ জগৎ দাপিয়ে বেড়াতেন সাজ্জাদ। তবে বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে বিরোধের পর ছোট সাজ্জাদ, রায়হান ও বোরহানদের দিয়ে দল পরিচালনা শুরু করেন বড় সাজ্জাদ।
বিয়ে করে ভারতে স্থায়ী হওয়া ম্যাক্সন ২০২২ সালে সেখানে মারা যায়। তার পরিবার বাংলাদেশের পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তার স্ত্রী তাকে খুন করে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রচার করেছে।
গত বছর নভেম্বরে বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকীয়া পাড়ায় জনসংযোগ করছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। সে সময় গুলিতে নিহত হন সরোয়ার; আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন। ওই ঘটনায় সরোয়ারের বাবার করা মামলায় বড় সাজ্জাদকে এক নম্বর আসামি করা হয়।
বায়েজিদ কেন্দ্রিক চাঁদাবাজি এখন নগর জুড়ে
এক সময় বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ভবন নির্মাণকারীদের কাছ থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না পেলে পেট্রোল বোমা, গুলি ছোড়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাজ্জাদের সহযোগীদের নাম আসত। তবে ইদানিং বায়েজিদ এলাকার বাইরেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে আসছে বড় সাজ্জাদের নাম।
চট্টগ্রাম জেলা ও নগর পুলিশের সাবেক বর্তমান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, বিদেশে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে সাজ্জাদের হয়ে ‘বেশকিছু গ্রুপ’ কাজ করে। তাদের একটি গ্রুপ চাঁদা দাবির আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে সাজ্জাদকে জানায়।
এ তথ্য সংগ্রহকারীদের মধ্যে কেউ আছেন ব্যবসায়ীদের তথ্য সংগ্রহকারী, কেউ ভবন মালিক ও ভবন নির্মাণকারী ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহকারী।
সাজ্জাদকে তথ্য জানানোর পর সে বিষয়টি চট্টগ্রামে তার সহযোগী ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন, বোরহান ও মোবারকদের ফোনে জানিয়ে দেওয়া হত। তারাই তখন সাজ্জাদের হয়ে ওইসব ব্যবসায়ী বা ভবনমালিকদের ফোন করে সাজ্জাদের নামে চাঁদা দাবি করতেন। আবার সাজ্জাদ নিজেও অনেককে সরাসরি ফোন করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির পর তারা টাকা না দিলে হামলাসহ বিভিন্ন ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। পরে চাহিদামত টাকা পেলে সে টাকা সাজ্জাদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাবেক সংসদ সদস্য ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে চাঁদা না পেয়ে তার বাসায় গুলি ছোড়া হয়।
গত জুনে বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ইন্টারনেট সেবার কোম্পানি ডিডিএন-এ ফোন করে এককালীন দুই কোটি এবং মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন সাজ্জাদের সহযোগী ডেভিড ইমন। চাঁদা না পেয়ে সেখানে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের চাঁদাবাজি এক সময় বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার মধ্যে অক্সিজেন, চালিতাতলী, কুয়াইশ এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালের পর তা নগরীর অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুসারীদের মধ্যে ছোট সাজ্জাদকে গত ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। ভারতে পালানোর চেষ্টার সময় ২৬ জুলাই যশোরে গ্রেপ্তার হয় ডেভিড ইমন। আর গত ২৮ অগাস্ট পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির পর ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন মোবারক ওরফে গলাকাটা মোবারক।
যা বলছে পুলিশ
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন, মোবারক তাদের সবার নিয়ন্ত্রক বড় সাজ্জাদ। বিদেশে বসে সে তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ করিয়ে থাকে। তার পক্ষে যারা টাকা নিয়ে থাকেন সে টাকা বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে তার কাছে পাঠিয়ে দেন।”
এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততা আছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, “তাদের অনেকের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি আছে। তবে গ্রেপ্তার ডেভিড ইমন, মোবারকসহ অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদে কোনো রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবুও আমরা খতিয়ে দেখছি কোন রাজনৈতিক যোগসাজশ সেখানে আছে কি না।”
পুরনো খবর
