এখনো বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত হয়নি সীতাকুণ্ডের সেই জাহাজ
জাহাজটিতে বিপজ্জনক মাত্রায় প্রাণঘাতী গ্যাস জমে থাকার কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির এক দিন পরও ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজটির বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসমুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি।
শনিবার দিনভর চেষ্টার পরেও ওই জাহাজের দুর্ঘটনা ঘটা অংশে গ্যাস ‘বিপজ্জনক মাত্রার নিচে’ নামানো সম্ভব হয়নি। বিকালে বিশেষজ্ঞরা গ্যাস মুক্ত করার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। রোববার আবার ওই কাজ শুরু হবে।
প্রাণহানির ওই ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সভা করেছে। ১১ সদস্যের ওই কমিটি রোববার ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজটি পরিদর্শনে যাবে।
শনিবার দুপুরে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, “আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে।”
‘ওয়াটার ট্যাংকে জমেছিল’ বিষাক্ত গ্যাস
২৮০ মিটার দৈর্ঘে্যর এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ নামের জাহাজটি ভাঙার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
শুক্রবার সকালে ওই জাহাজের নিচের দিকের একটি অংশে কাটার কাজ চলছিল। একটি ট্যাংকারের একাংশ কাটার পর সেটি সরিয়ে নিতে গেলে গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে যান কয়েকজন। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে বাকিরাও অচেতন হয়ে যান।
ওই ঘটনায় নয়জনের প্রাণ যায়; চিকিৎসাধীন আছেন ৭ জন।
জাহাজটি কাটার আগে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাহাজ বিচিং (তীরে ভেড়ানো) এর সময় আমরা কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে থাকি। তেল ও গ্যাস কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন শেষে আমরা অনুমতি দিই।
“এটারও কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন করা হয়েছিল। কার্গো ট্যাংকে কিছু হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ওয়াটার ট্যাংকে। তাতে গ্যাস জমে গিয়েছিল। সেটা কীভাবে ও কেন হয়েছে, তা তদন্ত শেষে জানা যাবে।”
শনিবার দুপুরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “শুক্রবার বিকালে আমরা দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করি। মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত মাত্রায় ছিল বলে শনাক্ত করতে পেরেছি। আমাদের ধারণা ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।”
তিনি বলেন, “সমন্বিত যে কমিটি হয়েছে, কমিটির মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি সেটাকে বের করে নিরাপদ করা হবে। পরে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে।”
ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের ওই অংশে যান। তারা শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন।
রাতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে মিশে থাকে এমন একটি ভারী গ্যাস। এই গ্যাস সরাতে হলে পানি দিয়ে বের করতে হবে। কিন্তু এটা করার মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই আজ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত হাইড্রোজেন সালফাইড সহনীয়। ২০-১০০ পিপিএম হল বিপজ্জনক মাত্রার। ১০০ পিপিএম এর উপর এই গ্যাস প্রাণঘাতী।”
স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার দুর্ঘটনার পর অচেতন হয়ে পড়াদের উদ্ধারে যারা জাহাজের ওই অংশে গিয়েছিল তারাও অচেতন হয়ে পড়ে। আর যারা ওই জাহাজটির কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিলেন তারাও তীব্র গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ (শনিবার) বিকালে পরিবেশ অধিদপ্তর মাল্টি ডিটেকটর দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছে। সেখানে ৮৪ পিপিএম, মানে উচ্চমাত্রার গ্যাস রয়ে গেছে।
“গ্যাসের এরকম উপস্থিতি থাকায় আজ আর কাজ করা হয়নি। কাল আবার কাজ শুরু হবে।”
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) এর মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুর্ঘটনাস্থলে পানি দিলে বিষাক্ত গ্যাস সরে যাচ্ছিল। পরে আবার গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ায় আজ (শনিবার) কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।”
জাহাজটি সাগরের তীরে ভিড়িয়ে ভাঙার কাজ চলছে। জাহাজের দুর্ঘটনা যে অংশে ঘটেছে সেখানে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দুর্ঘটনাস্থলে জমা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জোয়ারের পানিতে মিশে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে।
মামলা হয়েছিল
ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় গত জুলাই মাসে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করালেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা না দেওয়ার অনিয়ম ধরা পড়ে ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়গুলো সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেয় কলকারখানা অধিদপ্তর। তবে যথাযথ জবাব না পেয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করি। সেখানে শ্রমিকরা যাযথ বেতন-বোনাস ও চাকরির বেনিফিট পান কিনা, নিরাপত্তার জন্য সরঞ্জাম আছে কিনা এবং আরো কিছু বিষয় আমরা দেখি।
“এরকম নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।”
কোনো জাহাজ কাটার আগে গ্যাস মুক্ত করেই তা কাটতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা, তা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।”
জাহাজটিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
রিলেটেড লিংক-
