০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

৫০ ওভার কিপিং, ৪৮ ওভার ব্যাটিং, ১৬২* রান, ধোনির পরামর্শ এবং অতিমানবীয় হোপ

ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা সময় মাঠে ছিলেন শেই হোপ, রেকর্ডময় দিয়ে গড়েছেন অসাধারণ সব কীর্তি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Oct 2026, 10:43 AM

Updated : 04 Oct 2026, 10:43 AM

নিউ চন্ডিগড়ের প্রচণ্ড গরমে ৫০ ওভার কিপিং ও অধিনায়কত্ব পর শেই হোপ ভেবেছিলেন, একটু দম ফেলার ফুরসত পাবেন। ব্যাটিংয়ে তার নামার কথা চার নম্বরে। কিন্তু জানতে পারলেন, ফিল্ডিংয়ের সময় চোট পাওয়া ওপেনার জুয়েল অ্যান্ড্রু ব্যাট করতে পারবেন না। কী আর করা, ইনিংস শুরুর দায়িত্বও নিজের কাঁধে নিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক।

শুধু দায়িত্ব নেওয়াই নয়, অবিশ্বাস্য রান তাড়ায় সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিলেন দলকে। একটা প্রান্ত আগলে রাখলেন, কখনও ঝড় তুললেন, ক্র্যাম্পের সঙ্গে লড়লেন, শেষ দিকে আবার দ্রুত রানের দাবি মেটালেন এবং অসাধারণ রান তাড়ায় দলকে অবিস্মরণীয় এক জয় এনে দিয়ে তবেই মাঠ ছাড়লেন।

ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত মাঠে ছিলেন হোপ। দলকে জেতানোর পর ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক শোনালেন তৃপ্তির কথা। ভারতীয় কিংবদন্তি মাহেন্দ্র সিং ধোনির একটি পরামর্শ রান তাড়ার সময় দারুণ কাজে লেগেছে বলেও জানালেন তিনি।

ম্যাচের প্রথম ভাগে দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন ভারতের কিপার লোকেশ রাহুলও। তবে ওপেনিংয়ে নয়, পাঁচে নেমে। দল যখন একটু বিপাকে ছিল, সেখান থেকে টেনে নিয়ে দলকে ৩৫১ রানে নিয়ে যান তিনি। ৮৭ বলে বলে ১২৯ রানের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলেন তিনি। ওপেনিংয়ে রোহিত শার্মা করেন ৮৫ বলে ৯২।

ওয়ানডেতে ৩২৮ রানের বেশি তাড়ায় জয়ের নজির ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিল না। কাজটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে অ্যান্ড্রুকে হারিয়ে। তবে কঠিনেরেই ভালোবাসলেন হোপ। ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ফিরলেন ১০ রানেই। দ্বিতীয় উইকেটে আমির জাঙ্গুর সঙ্গে হোপের জুটি হলো ১০০ বলে ১০৯ রানে। সিরিজজুড়ে দারুণ খেলা জাঙ্গু ফিরলেন ৫৬ বলে ৬৭ রান করে।

এরপর বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান বলতে ছিলেন কেবল শেরফেন রাদারফোর্ড। তিনি থামলেন ২৪ রান করেই। তবে অলরাউন্ডাররা ভরসা জোগালেন অধিনায়ককে। পাঁচে নামলেন কিমো পল। ক্যারিয়ারে প্রথমবার সাত নম্বরের ওপরে নামলেন তিনি। তার ব্যাট থেকে এলো ৩৫ বলে মহামূল্য ৪৪।

আরেকপ্রান্তে হোপ তো অপ্রতিরোধ্য। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নানা রূপে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি। ফিফটি করতে তার লাগে ৪৬ বল। সেখান থেকে শতরানে যেতে বল খেলেন ৫৮টি। সেঞ্চুরি থেকে দেড়শ করে ফেলেন আবার ৩৫ বলেই!

এক পর্যায়ে পায়ে টান লাগায় ভুগছিলেন। দৌড়াতে পারছিলেন না ঠিকমতো। সম্ভাব্য কিছু ডাবলস তখন সিঙ্গল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবু হাল ছাড়েননি।

ম্যাথু ফোর্ড ১২ বলে ৭ রান করে অবশ্য কাজ কঠিন করে তুলেছিলেন। গুডাকেশ মোটিও শুরুতে ছন্দ পাচ্ছিলেন না। শেষ ৫ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৫৬ রান।

সেই চ্যালেঞ্জও জিতেছেন হোপ অনায়াসেই। মাঠের সব প্রান্তে পাঠিয়েছেন বল। মন্থর ওভাররেটের কারণে শেষ চার ওভারে একজন বাড়তি ফিল্ডার বৃত্তের ভেতরে রাখতে হয়েছে ভারতকে। সেটিও হোপ কাজে লাগিয়েছেন নিখুঁতভাবে।

১০ বল আগেই ম্যাচ শেষ করে যখন বের হচ্ছে, তার নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছে ১৭ চার ও ৩ ছক্কায় ১৪৩ বলে ১৬২ রান!

ওয়ানডে ক্রিকেটের ৫৫ বছরের ইতিহাসে কোনো কিপার-অধিনায়কের দেড়শ রানের ইনিংস এটিই প্রথম! পেছনে পড়ে গেছে এবি ডি ভিলিয়ার্সের ১৪৯ রান।

রান তাড়ায় ভারতের বিপক্ষে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস এটিই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে রান তাড়ার রেকর্ডে স্পর্শ করেছেন তিনি ক্রিস গেইলকে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজও প্রথমবার রান তাড়ায় ৩৩০ ছাড়িয়ে এমনকি ৩৫০ রানের সীমানাও ছাড়িয়ে গেল।

রাতে কিছুটা শিশির পড়ায় রান তাড়ার কাজটা সহজ হয়েছিল বলে মনে করেন হোপ। আগের ম্যাচে ৪০৫ রান করেও বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছিল তাদের। শেষ ম্যাচের জয়টা স্বস্তি দিয়েছে ক্যারিবিয়ান অধিনায়ককে।

“ভারতে ব্যাপারটা সবসময়ই অনেক সহজ, বিশেষ করে যখন শিশির পড়ে। আমরা সিরিজটি ভালোভাবে শেষ করতে চেয়েছিলাম। তাই আমি খুশি যে, ছেলেরা আজ জয়টা আদায় করে নিয়েছে।”

চোটের সঙ্গে লড়াই করে ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার কথাও বললেন তিনি, “সম্ভবত ৩০ ওভার পর, কুঁচকির দিকে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।”

ব্যাটিং স্কিলের কথা তো বলাই বাহুল্য। তবে রান তাড়ায় তার মূল চ্যালেঞ্জ ছিল মনস্তাত্ত্বিক। ইনিংসের বিভিন্ন পর্যায়কে নানাভাবে ভাগ করেছেন। ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতির হিসাব কষেছে তার মস্তিষ্ক। তার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে ধোনির পরামর্শ।

“প্রথমত, আমাদের একজন ব্যাটসম্যান কম ছিল, ভাইটেল লজকেও ধরলে সম্ভবত দুজন। তাই জানতাম, ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে এসব পরিস্থিতি নিয়ে গ্রেট এমএস ধোনির সঙ্গে আমার দারুণ কথা হয়েছিল। তিনি বলছিলেন যে, ‘তোমার ধারণার চেয়ে বেশি সময় তোমার আছে।’ তাই শেষ ফলাফলের উপর খুব বেশি মনোযোগ না দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। শুধু প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখছিলাম, যতটা সম্ভব খেলাটাকে ভেঙে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছিলাম এবং শেষের দিকে বাউন্ডারি মারার উপায় খুঁজছিলাম।

ভারতীয় দল কত ওভারে পিছিয়ে ছিল, সেটাও আমি ভেবেছিলাম। তাই জানতাম, শেষের দিকে ওদের দু-একজন ফিল্ডারকে ভেতরে আনতে হবে। স্কোর ডিফেন্ড করার সময় বৃত্তের ভেতর পাঁচজন ফিল্ডার রাখতে হলে কাজটা কঠিন হয়ে ওঠে। ব্যাটিং করার সময় এই সমস্ত বিষয় হিসাব করে নিয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত, শেষের দিকে সবকিছু আমাদের পক্ষেই কাজ করেছে।”

২০১৯ সালের পর ওয়ানডেতে ভারতের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম জয় এটি।

দুই দল এখন লড়বে টি-টোয়েন্টি সিরিজে। পাঁচ ম্যাচের সিরিজ শুরু মঙ্গলবার।