আকাশের মুখে হাসি মনে ক্যান্সারের মেঘ
এজবাস্টনে ১০ উইকেট নিয়ে ভারতকে ম্যাচ জেতিয়ে বাংলার পেসার খোলাসা করলেন বোনের ক্যান্সার আর পরিবারের লড়াইয়ের গল্প।
বার্মিংহামের আকাশে সেদিন মেঘ জমেছিল বেশ। আকাশের কান্না হয়ে তা ঝরেছিল কিছুটা। শেষ দিনের খেলা শুরু হতে দেরি হয়েছিল। খেলা শুরুর পর তো ভারতকে আনন্দে ভাসালেন আকাশ দিপ। দারুণ বোলিং করে দলকে এনে দিলেন স্মরণীয় এক জয়। কিন্তু কে জানত, হাসি মুখের ছেলেটির মনেও জমে আছে ঘন কালো মেঘ। জমাট সেই আঁধারের নাম ‘ক্যান্সার।’
মাস দুয়েক আগে ক্যান্সার ধরা পড়েছে তার বোনের। গোটা পরিবার লড়ছে সেই বিপর্যয়ের সঙ্গে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আকাশ সবার ছোট হলেও পরিবারের কর্তা আসলে তিনিই। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি তাই জীবনের ময়দানেও কঠিন এক লড়াই চলছে তার। এতদিন তা চেপে রেখেছিলেন ২৮ বছর বয়সী পেসার। ১০ উইকেট নিয়ে ভারতকে ম্যাচ জেতানোর পর বাংলার এই পেসার খোলাসা করেন বোনের ক্যান্সারের খবর।
ব্যাট হাতে অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে এই টেস্টে ম্যান অব দা ম্যাচ হয়েছেন শুবমান গিল। তবে আকাশের দারুণ বোলিং না হলে হয়তো ম্যাচ জিততে পারত না ভারত। ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে প্রথম ইনিংস চার উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে অসাধারণ বোলিংয়ে ছয় উইকেট শিকার করেন তিনি।
ম্যাচে ১৮৭ রানে ১০ উইকেট, ভারতের টেস্ট ইতিহাসে যা ইংল্যান্ডের কোনো মাঠে সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। আকাশ পেরিয়ে যান ৩৯ বছর আগে গড়া চেতান শার্মার রেকর্ড।
ম্যাচের পর আরেক ভারতীয় ক্রিকেটার ও এই সিরিজের ধারাভাষ্যকার চেতেশ্বর পুজারার সঙ্গে জিওহটস্টারে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি আকাশ দিপ।
“কাউকে বলিনি এতদিন। আমার বড় বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত। মাস দুয়েক আগে ধরা পড়েছে। এখন ও ঠিকঠাক আছে, থিতু আছে। আমার পারফরম্যান্সে অনেক খুশি হবে ও। গত দুই মাস ধরে মানসিকভাবে এত কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ওকে…।”
“আমার এই পারফরম্যান্স উৎসর্গ করছি ওকে। আমি স্রেফ চেয়েছিলাম, পারফরম্যান্স দিয়ে যেন ওকে খুশি করতে পারি।”
লড়াই অবশ্য আকাশের জীবনেরই প্রতিশব্দ। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বিহারে। ছেলেবেলায় যখন ক্রিকেট খেলতেন, বাবার কাছ থেকে বকুনি শুনতে হতো নিত্যই। টানাটানির সংসারে ক্রিকেটের জায়গা কোথায়! পরিবারের সহায় হতেই একটি কাজের আশায় ১৪ বছর বয়সে পশ্চিম বাংলার দুর্গাপুরে আসেন তিনি। সেখানে এক আত্মীয়ের সহায়তা স্থানীয় এক একাডেমিতে ক্রিকেটও চালিয়ে যেতে থাকেন। ছোট ছোট ক্লাবের হয়ে খ্যাপ খেলে সামান্য যা আয় করতেন, এর কিছুটা পাঠিয়ে দিতেন বাড়িতে।
কিন্তু হঠাৎ তাদের পরিবারে নেমে আসে মহাবিপর্যয়। স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন আকাশের বাবা। এক পর্যায়ে পাড়ি জমান পরপারে। এর মাস দুয়েক পর সামান্য ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন আকাশের বড় ভাই। সেই সাধারণ ঠাণ্ডাই ঘাতক হয়ে ওঠে দ্রুত। ঠিকঠাক চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য ছিল না। সেই ভাইকেও বাঁচানো যায়নি।
খুব বেশি দিন নয়, আট বছর আগের ঘটনা এসব। ক্রিকেটের স্বপ্ন মনের খাঁচায় বন্দি করে জীবনযুদ্ধে নামতে হয় আকাশকে। বছর তিনেক একরকম দূরে থাকেন ক্রিকেট থেকে।
একটু থিতু হওয়ার পর ক্রিকেটের স্বপ্ন আবার জেগে ওঠে তার মনে। এবার কলকাতায় চলে আসেন ক্রিকেটের পথে কিছু একটা করার আশায়। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের দ্বিতীয় বিভাগে ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে খেলা শুরু করেন। নজর কাড়তে থাকেন দ্রুত। বাংলার অনূর্ধ্ব-২৩ দল হয়ে রাঞ্জি ট্রফির স্কোয়াডেও জায়গা করে নেন।
সৌভাগ্যবশত, সেসময় মোহাম্মদ শামির সংস্পর্শ পান তিনি। শামির কাছ থেকে বোলিং আর ফিটনেস নিয়ে অনেক পরামর্শ পান। নিজেকে সেভাবেই গড়ে তোলেন। দারুণ সুইং বোলার হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান ভারতীয় ক্রিকেটে। ঘরোয়া ক্রিকেট রাঙিয়ে জায়গা করে নেন ভারতের টেস্ট দলে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে টেস্ট অভিষেকে রাঁচিতে তিন উইকেট নিয়ে নাড়িয়ে দেন ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার।
এরপর থেকে টেস্ট স্কোয়াডে মোটামুটি নিয়মিতই উপস্থিতি তার। ম্যাচ খেলছিলেন, দারুণ বোলিংও করছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের সহায়তা পাচ্ছিলেন না। প্রতি ম্যাচেই বারবার তার সুইংয়ে পরাস্ত হচ্ছিলেন ব্যাটসম্যানরা। ভালো বোলিং করেও তাই বোলিং ফিগার খুব নজর কাড়ার মতো ছিল না। সাত টেস্টে উইকেট ছিল ১৫টি।
অবশেষে এজবাস্টনে তিনি আদায় করে নিলেন প্রাপ্য সাফল্য। ব্যাটিং বান্ধব উইকেটে প্রাণের সঞ্চার করলেন দারুণ বোলিংয়ে। ভারতকে জেতানোর পর তার বোলিংয়ের স্তুতি ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে।
কিন্তু তার মনের ভেতর কেবলই বোনের ছবি। ম্যাচের পর পুজারার সঙ্গে সেই কথোপকথনেই বার্তা দিলেন প্রিয় বোনকে।
“বোন, এটা তোমার জন্য। যখনই আমি বল হাতে নিয়েছি, আমি তোমার কথা ভাবছিলাম, তোমার মুখ বারবার ভেসে উঠছিল। আমি স্রেফ তোমাকে খুশি উপহার দিতে চেয়েছি। আমরা সবাই তোমার সঙ্গে আছি।”
বোনের ক্যান্সারের কথা বলার পর সংবাদমাধ্যমের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে আসেন আকাশের সেই বোন আখান্ড জ্যোতি সিং। আজ তাকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আবেগময় প্রতিক্রিয়া জানান তার বোনও।
“জানতাম না আকাশ এরকম কিছু বলেছে। প্রকাশ্যে এসব নিয়ে কথা বলতে আমরা সম্ভবত প্রস্তুত ছিলাম না। তবে সে যেভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছে এবং আমাকে বলেছে, আমাকে উৎসর্গ করেছে… এটা অনেক বড় ব্যাপার।”
“এতে ফুটে উঠেছে, আমাকে ও গোটা পরিবারকে কতটা ভালোবাসে ও। বাড়িতে এই অবস্থা, তার পরও ওখানে গিয়ে পারফর্ম করছে ও উইকেট নিচ্ছে, বিশাল ব্যাপার এটি। আমিই ওর সবচেয়ে কাছে মানুষ।”
আখান্ড জানালেন, আগে-পরে নিয়মিতই তার সঙ্গে ও পরিবারের অন্য সঙ্গে কথা বলেন আকাশ।
“ম্যাচ শেষে দুইবার ভিডিও কলে কথা হয়েছে আমাদের। পরে ভোর ৫টায় আরেক দফায়। আকাশ আমাকে বলেছে, ‘চিন্তা করো না, গোটা দেশ তোমার সঙ্গে আছে।’ আরও বলেছে, ‘এটা আর চেপে রাখতে পারিনি। চেষ্টা করছিলাম অনেক, কিন্তু কালকে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।”
“প্রতি ম্যাচের আগে ও পরে বাড়িতে ভিডিও কল দেয় ও। এবার ম্যাচের পর বলেছে, ‘এই পারফরম্যান্স তোমার জন্য ও দেশের জন্য। তোমার জন্য উইকেট নিয়েছি।”
আখান্ড জানালেন, তার ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আইপিএলের মাঝেই হাসপাতালে যাওয়াসহ নানা কিছু করেছেন আকাশ। বোনের প্রতি ভাইয়ের যেমন ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ, তেমনি ভাইয়ের জন্যও বোনের মনে বইছে আবেগ-ভালোবাসার স্রোত।
“এই ধরনের ভাই পাওয়া বিরল ব্যাপার। সবসময় আমাদের পাশে থাকে ও, আমাদের সঙ্গে কথা না বলে কিছুই করে না। সবকিছুই পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে। যেহেতু আমাদের বাবা ও বড় ভাই আমাদের সঙ্গে আর নেই, বাড়ির সবকিছু এখন আকাশই সামলাচ্ছে।”
“আমার ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা জুগিয়েছে আকাশ। আমি ওকে বারবার বলেছি, ‘এত ভাবতে হবে না, আমার স্বামী সঙ্গে আছে’, কিন্তু ও সবসময় বলে, ‘আমার সবকিছু তো বোন ও পরিবারের জন্যই।’ আমরা তিন ভাই তিন বোন। একজন চলে গেছেন, আকাশই সবার ছোট।”
সেই ছোট আকাশ যেমন পরিবারের সবার ‘বড়’ হয়ে উঠেছেন, ভারতীয় দলের জন্যও এখন তিনি বড় ভরসা। এজবাস্টনের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে যেমন বোলিং তিনি করেছেন, পরের টেস্টে লর্ডসে তার সুইং বোলিং আরও কার্যকর হবে এবং জাসপ্রিত বুমরাহর সঙ্গে জুটি জমে উঠবে বলেই ধারণা অনেকের।
অ্যান্ডারসন-টেন্ডুলকার ট্রফির পাঁচ ম্যাচের দুটি শেষে এখন ১-১ সমতা। লর্ডস টেস্ট শুরু বৃহস্পতিবার।
