১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মৃতির আয়নায় তাকিয়ে আমিনুলদের রজতজয়ন্তী উদযাপন

টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনে স্মৃতির জানালায় ফিরে তাকালেন আমিনুল ইসলাম, মেহরাব হোসেন, হাবিবুল বাশাররা।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Jun 2025, 10:12 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:16 PM

‘পোর্টসমাউথ ক্লাবে ক্রিকেট খেলি তখন। একটি টিভি চ্যানেল লর্ডসে লাইভ অনুষ্ঠান করছিল যে, বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে পারে। ওই অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছিল। সেদিন উপস্থিত থাকতে পেরে সবসময় গর্ববোধ করি’- বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ২৫ বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের চোখেমুখে খেলে গেল অন্যরকম আভা। 

টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির রজতজয়ন্তী উদযাপনের আয়োজনে পুরো সময়ই সাদা পোশাকে দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ানের মুখে লেগে ছিল হাসি। এখন অবশ্য তার মূল পরিচয় বিসিবি সভাপতি। মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ঘণ্টা দেড়েকের আয়োজনের পুরো সময়ই মঞ্চে থেকে প্রথম টেস্টের সতীর্থদের বিশেষ ব্লেজার উপহার ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি। তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন মজার সব গল্প, শুনিয়েছেন দেশের ক্রিকেট নিয়ে অনেক আশার কথা। সবশেষে উন্মোচন করেছেন দেশের ক্রিকেটের প্রথম অনার্স বোর্ড।

নানা ঘটনাপ্রবাহে ২০০০ সালের ২৬ জুন বিশ্বের দশম দেশ হিসেবে আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ অর্থাৎ টেস্ট খেলার মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। স্মরণীয় মাইলফলকের ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার দিন প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটার, কোচ ও ম্যানেজারকে সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন করে বিসিবি।

রজতজয়ন্তীর আয়োজন অবশ্য গত শনিবার শুরু করে দিয়েছে বিসিবি। সারা দেশে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার যে মূল লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন আমিনুল, এর অংশ হিসেবে ৭ বিভাগীয় শহরে অনূর্ধ্ব-১২ সিক্স-এ-সাইড ক্রিকেটসহ নানা কিছুর আয়োজন করেছে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা। 

সেই ধারাবাহিকতায় মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রথম টেস্ট সদস্যদের নিয়ে করা হয় এক পুনর্মিলনী। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

হোম অব ক্রিকেটের নর্থ প্লাজায় তাবুর মতো সাজানো আঙিনা আলোকিত করেন আমিনুল, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিকসহ দেশের প্রথম টেস্টের স্বপ্নসারথিরা। ব্যক্তিগত কারণে এদিন থাকতে পারেননি প্রথম টেস্টের অধিনায়ক নাইমুর রহমান, আকরাম খান, খালেদ মাসুদ, আল শাহরিয়ার রোকন, মঞ্জুরুল ইসলাম।

মঞ্চের বাইরে ব্যানারে বিভাগীয় শহরগুলোর আয়োজনে করা চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা থেকে বাছাইকৃত সব ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর মতো করা হয়। শিশু-কিশোরেদের আঁকা সেসব ছবিতে উঠে আসে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় অনেক মুহূর্ত।  

মূল আয়োজনের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ওই দিনের স্মৃতিচারণ করেন আমিনুল। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন ক্রিকেট বিকেন্দ্রীকরণের কথা। বিসিবি সভাপতি বলেন, সারা দেশকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে ‘মিনি বিসিবি’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

প্রথম টেস্টে থাকা ক্রিকেটারদের পরিসংখ্যান তেমন সমৃদ্ধ নয় মেনেই দেশের ক্রিকেটে তাদের অবদানের কথা আলাদা করে বলেন আমিনুল। ৫০ বছর পূর্তি আয়োজন আরও বড় পরিসরে আয়োজনের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।  

“আমরা পঞ্চাশ বছর পূর্তির যে আয়োজন করব, সেটা হয়তো এতো ছোট পরিসরে করব না। বেঁচে থাকব কিনা জানি না, তবে আমাদের হয়তো (উদযাপন করতে) একটা স্টেডিয়াম ভাড়া করতে হবে। তখন হয়তো ১০০ টেস্ট জয় দেখতে পারব। আমরা অনেক স্বপ্ন দেখছি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করি।”

টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির প্রথম ২৫ বছরে বাংলাদেশের জয় মাত্র ২৩টি। এখন পর্যন্ত ১৫৪ ম্যাচে ১১১টিই হেরেছে তারা। জয়-পরাজয়ের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ অবশ্য শোনান সামনের দিনের সম্ভাবনার কথা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রথম ২৫ বছরে অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। 

ক্রিকেট উন্নয়নে বিসিবির সঙ্গে মিলে কাজ করার আশ্বাস দেন আসিফ মাহমুদ। সারা দেশে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য পূরণে জাতীয় স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা থেকে বাছাইকৃত ১০০টি বিদ্যালয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে সিনথেটিক ক্রিকেট পিচ স্থাপনের ঘোষণা দেন তিনি। 

এরপর প্রথম টেস্টের সদস্যদের বিশেষ ব্লেজার পরিয়ে দেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আর ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান বিসিবি সভাপতি। ব্লেজার গায়ে জড়িয়ে বাংলাদেশের একটি টেস্ট জার্সিতে অটোগ্রাফ দেন সাবেক ক্রিকেটাররা। কেউ কেউ ফিরে যান প্রথম টেস্ট খেলার সেই দিনে। কেউ আবদার জানান, সামনের দিনেও ধারাবাহিকভাবে এমন আয়োজনের।

ভারতের বিপক্ষে দেশের প্রথম টেস্টের প্রথম বল মোকাবিলা করা শাহরিয়ার হোসেন এদিনও সবার আগে ব্লেজার গায়ে জড়ান। তার পরে মঞ্চে উঠে ওই ম্যাচের মজার এক গল্প শোনান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মেহরাব হোসেন। 

“দুষ্টুমির একটা স্মৃতি আছে আমার। ম্যাচের জন্য সবাইকে টি-শার্ট দেওয়া হয়েছিল। ম্যাচের বাইরে সেটি পরার নিয়ম করেছিলেন (প্রধান কোচ) সরওয়ার ইমরান ভাই। কেউ না পরলে ৫০০ টাকা জরিমানা!। আমি নিজের টি-শার্ট এক বল বয়কে দিয়ে দিয়েছিলাম।”

“খেলার পর টিম বাসে ওঠার সময় তো টি-শার্ট নেই আমার। ইমরান ভাইয়ের ডাবল এক্সএল টি-শার্টের ট্যাগটা কলম দিয়ে এক্সএল বানিয়ে আমি পরে ফেলি। এভাবে জরিমানা থেকে বেঁচে যাই। পরে অবশ্য ইমরান ভাইকে বলে দিয়েছিলাম।”

এরপর একে একে মঞ্চে ওঠেন হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, হাসিবুল হোসেন, মাহমুদুল হাসান রানা (তখনকার নাম বিকাশ রঞ্জন দাস), রাজিন সালেহ, এনামুল হক মনি, জাভেদ ওমর ও ফাহিম মুন্তাসির সুমিত। 

পরে প্রধান কোচ সারোয়ার ইমরানকে ডেকে নেওয়া হয় মঞ্চে। ক্রিকেটারদের সবাই তখন দাঁড়িয়ে নিজেদের কোচের প্রতি সম্মান দেখান। এসময় টিম ম্যানেজার আজিজ আল কায়সারকেও সম্মানিত করে বিসিবি। 

সবার আগে মঞ্চে উঠলেও, সবার শেষে শুভেচ্ছা উপহার গ্রহণ করেন আমিনুল। আবার তিনি তিনি ফিরে যান প্রথম টেস্টের স্বরণীয় মুহূর্তে। ম্যাচের দ্বিতীয় দিন সেঞ্চুরি ছুঁয়ে দেশের টেস্ট ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যান বর্তমান বিসিবি সভাপতি।

সেদিন ছিল সংবাদমাধ্যমের সরকারি ছুটির দিন। তাই পর দিন কোনো পত্রিকা ছাপা হবে না। তবে আমিনুলের সেঞ্চুরির প্রামাণ্য দলিল রাখতে প্রেসবক্সে উপস্থিত সাংবাদিকরা নিজেদের উদ্যোগে 'প্রেসবক্স' নামে চার পাতার বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেন। সেই বুলেটিন এখনও নিজের কাছে সযত্নে রেখেছেন আমিনুল।

পরে পঞ্চাশ বছরের আয়োজন আরও বড় পরিসরে করার আশার কথা শুনিয়ে অনার্স বোর্ড উন্মোচনের জন্য বিসিবি ভবনে চলে যান আমিনুল। 

ড্রেসিং রুমের প্রবেশ পথে টাঙানো বোর্ডের নাম 'অনার্স বোর্ড' রাখা হলেও, এটি মূলত দেশের টেস্ট ক্রিকেটারদের তালিকা। টেস্ট ক্যাপ নম্বর অনুযায়ী ক্রমানুসারে লেখা হয়েছে এখন পর্যন্ত অভিষেক হওয়া ১০৭ ক্রিকেটারের নাম।