০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শেষের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে রান তাড়ার রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশের জয়

তাওহিদ হৃদয়ের ফিফটির পাশাপাশি পারভেজ হোসেন ইমন ও শামীম হোসেনের দারুণ দুটি ক্যামিওতে দারুণ জয়ে সিরিজে এগিয়ে বাংলাদেশ।

শেষের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে রান তাড়ার রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশের জয়
হৃদয়ের অসাধার থ্রোয়ে উইকেটের আনন্দ বাংলাদেশের। ছবি: বিসিবি।

বিডিনিউজ২৪

ক্রীড়া প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Apr 2026, 07:01 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:30 PM

১০ ওভার তখন সবে শেষ হয়েছে। অদ্ভুতুড়ে এক ইনিংস খেলে আউট হয়ে গেলেন তানজদ হাসান। দল তখন প্রবল চাপে। লক্ষ্য মনে হচ্ছিল নাগালের বাইরে। কিন্তু তাওহিদ হৃদয় আর পারভেজ হোসেন ইমন হয়তো ভাবলেন, এ এমন কী! অসাধারণ পাল্‌টা আক্রমণে চোখের পলকে খেলার মোড় বদলে দিলেন দুজন। পরে শামীম হোসেন খেললেন চোখধাঁধানো কিছু শট। রান তাড়ার মাঝামাঝি পর্যন্ত মিইয়ে থাকা দল অবিশ্বাস্যভাবে দুই ওভার বাকি রেখেই জিতে গেল রেকর্ড গড়ে।

তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টিতে সিরিজের প্রথমটিতে নিউ জিল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারাল বাংলাদেশ।

চট্টগ্রামে সোমবার কাটেনে ক্লার্ক ও ডেন ক্লেভারের ফিফটিতে কিউইরা ২০ ওভারে তোলে ১৮২ রান। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য তাড়া করে ফেলে তুড়ি বাজিয়েই।

হৃদয় অপরাজিত থাকেন ২৭ বলে ৫১ রান করে। কার্যকর ছোট্ট ঝড়ে ১৪ বলে ২৮ করেন পারভেজ। ফিনিশার শামীম নিজের সেরা ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখিয়ে ১৩ বলে অপরাজিত থাকেন ৩১ রানে। 

প্রথম ৯ ওভারে ৬৬ রান করা দল পরের ৮ ওভারে তোলে ১১৭ রান! 

দেশের মাঠে বাংলাদেশের রান তাড়ায় জয়ের কীর্তি এটি। গত নভেম্বরে এই মাঠেই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭১ রান তাড়ায় জয় ছিল আগের রেকর্ড। 

টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম বলেই বাউন্ডারিতে ম্যাচ শুরু করে নিউ জিল্যান্ড। শরিফুল ইসলামের প্রথম ওভারে ক্লার্কের দুটি বাউন্ডারির পর দ্বিতীয় ওভারে বাংলাদেশ পায় ব্রেক থ্রু। বিপজ্জনক টিম রবিনসনকে দুর্দান্ত সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট করেন তাওহিদ হৃদয়।

তাতে অবশ্য কিউইদের পরিকল্পনায় বদল আসেনি। তিনে নামা ক্লেভার শুরু থেকেই আগ্রাসনের পথ বেছে নেন।। ক্লার্কও ছিলেন একই পথেরই সঙ্গী। পাওয়ার প্লেতে রান ওঠে ৬১। জুটির পঞ্চাশ আসে ২৮ বলে।

বাংলাদেশের কাছ থেকে কিছুটা সহায়তাও পান ক্লার্ক। ১২ রানে তাকে রান আউট করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন পারভেজ হোসেন ইমন, ১৮ রানে তাকে এলবিডব্লিউ দিতে পারতেন আম্পায়ার, ৪৪ রানে রিশাদের বলে তার সহজ ক্যাচ ছাড়েন সাইফ। 

ক্যারিয়ারের প্রথম দু্‌ই টি-টোয়েন্টিতে ১১ রান করা ব্যাটসম্যান প্রথম ফিফটির দখা পান ৩৪ বলে। আরেকপ্রান্তে ক্লেভার আরও আগেই ফিফটি করে ফেলেন ২৭ বলেই। দ্বাদশ টি-টোয়েন্টিতে তার দ্বিতীয় ফিফটি এটি।

ঝড়ো ফিফটিতে ম্যাচের সেরা হৃদয়। ছবি: বিসিবি।

ঝড়ো ফিফটিতে ম্যাচের সেরা হৃদয়

৫০ বলে ৮৮ রানের জুটি থামে ক্লেভারের বিদায়ে। রিশাদকে টানা দুটি বাউন্ডারিতে চার মেরে ফিফটি করে পরের বলেই বেজে যায় তার বিদায় ঘণ্টা (২৮ বলে ৫১)।

রিশাদ পরের ওভারে ফিরিয়ে দেন ক্লার্ককেও (৩৭ বলে ৫১)।

পরের উইকেটেও ছোঁয়া ছিল রিশাদের। চোট কাটিয়ে ফেরা তানজিম হাসানের বলে বেভন জ্যাকবসের ক্যাচ নেন তিনি। ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত পারফর্ম করা ডিন ফক্সক্রফটকে দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড করেন শেখ মেহেদি হাসান।

কিউইদের রানের গতিও কমে যায় ওই সময়। ১০ ওভারে ১০০ করা দল পরের ৫ ওভারে তুলতে পারে কেবল ৩০ রান। 

মেঘলা আকাশের কারণে ফ্লাড লাইটে চলছিল খেলা। ষোড়শ ওভারে ফ্লাড লাইটের সমস্যায় খেলা বন্ধ থাকে বেশ কিছুক্ষণ। 

রানের থমকে আসা গতিতে দম দেন অধিনায়ক নিক কেলি (২৭ বলে ৩৯)। শেষ দিক ক্যামিও খেলে দলকে ১৮০ পার করান জশ ক্লার্কসন (১৪ বলে ২৭)।

২০২৩ এশিয়ান গেমসে তিনটি ম্যাচ খেলা পেসার রিপন মন্ডল জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচে দারুণ কিছু করতে পারেননি। তবে তার বিশেষত্ব যেখানে, সেই ইয়র্কারের ঝলক কিছু দেখিয়েছেন। শেষ ওভারটিতে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন।

১৮৩ রান তাড়ায় যেমন শুরু দরকার, বাংলাদেশকে তা এনে দিতে পারেননি সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান। পাওয়ার প্লেতে রান আসে ৪৪। সাইফ বিদায় নেন ১৬ বলে ১৭ রান।

লিটন তিনে নেমে ইশ সোধির বলে একটি ছক্কা ও তিনটি চার মেরে রানের গতি একটু বাড়ান। কিন্তু সোধির বলে বোল্ড হয়ে যান তিনি ১৫ বলে ২১ রান করে।

তানজদ কী করছিলেন, বলতে পারবেন না হয়তো নিজেও। প্রথম ওভারে জীবন পেয়েও পারেননি কাজে লাগাতে। তার যন্ত্রণাময় উপস্থিতি শেষ হয় সোধির বলেই। টেস্‌ট দলে ডাক পাওয়া ওপেনার ২৫ বল খেলে রান করতে পারেন স্রেফ ২০।

ম্যাচের লাগাম তখন পুরোপুরি নিউ জিল্যান্ডের। সেটি যেন ছো মেরে নিয়ে নেন হৃদয় ও পারভেজ। তানজিদের বিদায়ের ওভারেই সোধিকে চার ও ছক্কা মারেন হৃদয়। ছক্কায় ওভার শেষ করেন পারভেজ।

ব্যস, সেই ছুটতে শুরু করল দল, আর পেছন ফিরে তাকানোর ব্যাপার নেই। চার-ছক্কার ঝড় চলতে থাকে। ক্লার্কসনের বল গ্যালারি আছড়ে ফেলেন পারভেজ, জুটির ফিফটি আসে ২৫ বলেই।

৯৪ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে আগে একবারই পাঁচ নম্বরে ব্যাট করছিলেন পারভেজ। ২০২৪ বিপিএলের সেই ম্যাচে আউট হয়েছিলেন শূন্য রানে। এবার পাঁচে নেমে করেন ১৪ বলে ২৮।

২৮ বলে ৫৭ রানের জুটি ভাঙলেও পরের জুটিতে তাণ্ডব চলে আরও বেশিও। শামীম ক্রিজে যাওয়ার পরপরই ন্যাথান স্মিথের বলে অবিশ্বাস্য এক ‘নো লুক’ শটে ছক্কা মারেন কিপারের পেছন দিয়ে। ওই ওভারে ছক্কা আসে হৃদয়ের ব্যাট থেকেও।

পরের ওভারেই ম্যাচের ফয়সালা হয়ে যায়। শামীমের দুই চার এক ছক্কার সঙ্গে ওয়াইড-নো মিলিয়ে ফিশারের ৯ বলের ওভার থেকে রান আসে ২৫। পরের ওভারেই খেলা শেষ।

২ চার ও ৩ ছক্কায় ২৭ বলে ৫১ রানের ইনিংসে ম্যাচের সেরা হৃদয়। মাত্র দুটি ডট বল খেলেছেন তিনি। ৩ চার ও ২ ছক্কায় ১৩ বলে অপরাজিত ৩১ শামীম।

ওয়ানডেতে প্রচণ্ড গরমে গ্যালারি ছিল প্রায় ফাঁকা। এই টি-টোয়েন্টিতে গ্যালারি ভরে না উঠলেও দর্শক ছিলেন বেশ। দারুণ আবহে তারা মাতিয়ে রেখেছিলেন চারপাশ। শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়েন তারা উচ্ছ্বাস নিয়েই। 

সিরিজের পরের ম্যাচ বুধবার।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

নিউ জিল‍্যান্ড: ২০ ওভারে ১৮২/৬ (ক্লার্ক ৫১, রবিনসন ০, ক্লেভার ৫১, কেলি ৩৯, জ‍্যাকবস ১, ফক্সক্রফট ৩, ক্লার্কসন ২৭*, স্মিথ ২*; শরিফুল ৪-০-৩৬-১, তানজিম ৪-০-৪০-১, রিপন ৪-০-৩৯-০, মেহেদি ৪-০-৩১-১, রিশাদ ৪-০-৩২-২)।

বাংলাদেশ: ১৮ ওভারে ১৮৩/৪ (সাইফ ১৭, তানজিদ ২০, লিটন ২১, হৃদয় ৫১*, পারভেজ ২৮, শামীম ৩১*; স্মিথ ৩-০-৩৩-১, ফিশার ৪-০-৫৩-০, লিস্টার ৪-০-২৩-০, সোধি ৪-০-৪০-২, ক্লার্কসন ৩-০-২৮-১)।

ফল: বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী।

সিরিজ: ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।

ম্যান অব দা ম্যাচ: তাওহিদ হৃদয় ।