২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

‘আমার হয়তো স্পেশাল কিছু নেই, কিন্তু ছোট ছোট ভালো অনেক কিছু আছে’

দেশের সফলতম টেস্ট বোলার তাইজুল ইসলাম ফিরে তাকালেন শৈশবের কষ্টের দিনগুলোয়, নাটোরের সন্তান মন খুলে কথা বললেন তার টেস্ট ক্যারিয়ার, বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়া, সাকিব আল হাসানের প্রত্যাশা, মাঠের বাইরের জীবনসহ আরও নানা কিছু নিয়ে।

‘আমার হয়তো স্পেশাল কিছু নেই, কিন্তু ছোট ছোট ভালো অনেক কিছু আছে’
চূড়ায় ওঠার সিরিজে ম্যান অব দা সিরিজও হয়েছেন তাইজুল। ছবি: রতন গোমেজ/বিসিবি।

আরিফুল ইসলাম রনি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Nov 2025, 09:56 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:11 PM

জীবন ছিল সংগ্রামমুখর, বেড়ে ওঠা ছিল কঠিন। তবু খেলার আনন্দে ক্রিকেটকে আঁকড়ে রেখেছিলেন, সেই তাইজুল ইসলাম এখন দেশের সফলতম টেস্ট বোলার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফিরে তাকালেন শৈশবের কঠিন দিনগুলোয়। কথা বললেন ক্রিকেটের পথ ধরে তার ছুটে চলা, টেস্ট ক্যারিয়ার, রাঙ্গানা হেরাথের বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়া, সাকিব আল হাসানের আশা, মাঠের বাইরের জীবনসহ আরও নানা কিছু নিয়ে। 

মাঠে খেলার চলার সময় বা খেলা শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অনেক কিছু তো আসলে বোঝা যায় না। এখন কিছু সময় পেরিয়েছে, নিজের মতো করে ভাবার সময় পেয়েছেন। দেশের সফলতম টেস্ট বোলার আপনি, ভাবতে কেমন লাগছে?

তাইজুল ইসলাম: আপনি যদি মাইলফলকের বিষয় চিন্তা করে বলেন, তাহলে বেশ বড় অর্জনই বলতে হবে। এটা নিয়ে সংশয় নেই। যখন ম্যাচের মধ্যে থাকি, একজন ক্রিকেটার যখন মাঠে খেলে, তখন সেরা পারফরম্যান্সই তার ভাবনায় থাকে। ম্যাচ চলার সময় আসলে অত কিছু চিন্তা করার সময়টা হয় না। তখন একটাই চিন্তা থাকে যে, আমি কী করলে আমার দলের লাভ হবে, কীভাবে দলকে সহায়তা করতে পারব। 

তখন ব্যক্তিগত রেকর্ড, অর্জন এসব ভাবলে আসলে স্বার্থপর ভাবনা চলে আসে। মাঠে থাকার সময় আমার সবসময় ফোকাস থাকে, দলের কোনটি প্রয়োজন, দলের উপকারে কীভাবে লাগতে পারি। 

দলের জন্য কিছু করার চেষ্টায় যখন নিজে এরকম কিছু পেয়ে যাই, তখন তো মনকে প্রচুর আনন্দ দেয়। যে কোনো পেশাতেই এটা হয়, বড় কিছু অর্জন করতে পারলে ভালো তো লাগবেই। আমরা যে পেশায় আছি, সেখানে দলগত অর্জনের চেয়ে বড় কিছু আর নেই। ব্যক্তিগত অর্জনগুলো যখন দলের কাজে লাগে, তখন ভালো লাগা বেশি কাজ করে। আমার রেকর্ড হয়েছে, দল জিতেছে, সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। 

আপনি তো এমনিতে ‘লেইডব্যাক’ ধরনের মানুষ, খুব জাঁকালো নন। আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। এত বড় মাইলফলক আপনি কিভাবে উদযাপন করলেন?

তাইজুল: তেমন কিছু নয়। আমি কখনোই খুব বেশি উদযাপন করি না। একটা জিনিস আমি মেনে চলি,  আমাদের ধর্মেও আছে, আপনি যখন ভালো কিছু পাবেন, তখন আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করবেন। দেওয়ার মালিক আল্লাহ। আপনার কাছে যখন বড় কিছু আসবে, তখন অনেক এক্সাইটেড হওয়ার কিছু নেই। স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবেন আর কৃতজ্ঞ থাকবেন। অতি উত্তেজনা ভালো কিছু বয়ে আনে না, এটা আমি বিশ্বাস করি। 

অনেকেই হয়তো আরও অনেক বেশি কিছু করতে পারে। অনেকে অনেকভাবে নাম করবে, আলোচনা ছড়াবে। সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমি এই ব্যাপারগুলোতে খুব আগ্রহী নই। আমার ধরন এরকম। আমার কাছে মনে হয়, ওসব নিয়ে যখন আমি বেশি মাথা ঘামাব বা চিন্তা করব, তখন তা আমার কাছে নাও আসতে পারে। আল্লাহ আমাকে যেখাকে রেখেছেন, সেভাবেই থাকার চেষ্টা করি ও করব। 

এমনিতে আপনার পরিবার, বন্ধু বা কাছের মানুষদের প্রতিক্রিয়া কেমন?

তাইজুল:  অবশ্যই তারা অনেক খুশি। বিশেষ করে আমার পরিবার, আমার স্ত্রী আছেন, ওরা অনেক খুশি। আমার বাচ্চারা এখনও অতটা বোঝে না, তবে টিভিতে দেখে চনে, বুঝতে পারে যে বাবা খেলছে। ওরা মজা পায় আমি ভালো কিছু করলে। 

আর আব্বা-আম্মা তো আছেনই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সবাই খুশি। সবার ম্যাসেজ পাই, তারা অভিনন্দন জানায়, শুভ কামনা জানায়। ভবিষ্যতে আরও যেন ভালো কিছু করতে পারি, সেই দোয়া করে। 

আপনি তো এখন শুধু দেশের সফলতম বোলারই নন, বাঁহাতি স্পিনে টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম ২৫০ উইকেট শিকারি। রাঙ্গানা হেরাথের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন, যিনি আপনাদের বোলিং কোচ ছিলেন। কথা হয়েছে তার সঙ্গে? 

তাইজুল:  হ্যাঁ, আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন, আরও বেশি কিছু করতে শুভ কামনা জানিয়েছেন। শুধু আমার নয়, আমাদের সবার অর্জনে উনি অনেক খুশি হন। ভালো পারফরম্যান্স করলেই ম্যাসেজ পাঠান। সবসময়ই প্রশংসা করেন আমাদের সব স্পিনারকে। 

হেরাথ যখন এখানে ছিলেন, অনেক যত্ন নিয়েছেন আমার, অনেক সময় নিয়ে কাজ করেছেন। দেশে যখন কাজ করি, সাধারণত সোহেল ভাইয়ের (বিসিবির কোচ মোহাম্মদ সোহেল) সঙ্গে কাজ করি। উনি আমার অ্যাকশন সম্পর্কে সবকিছু জানেন ও বোঝেন। কোন সমস্যা হলে উনাকে আমি সাথে সাথে নক করি বা উনি দেখলেও বুঝতে পারেন যে, এটা ঠিক করতে হবে বা ওটা। 

তবে হেরাথের কাছ থেকেও অনেক উপকার পেয়েছি। এমনিতেও উনি অনেক ভালো মানুষ। এখনও কিছু জানতে চাইলে উনি আন্তরিকভাবে পরামর্শ দেন।

খেলতে খেলতেই অনেক সময় আমাদের অনেক কিছু এদিক-সেদিক হয়ে যায়। কিছু জিনিস ফাইন টিউন করতে হয়। সোহেল ভাই বা হেরাথ, তারা খুব দ্রুত ধরতে পারেন ও শুধরে দিতে পারেন। 

তাইজুলকে সামনে রেখে মাঠ ছাড়ছেন সতীর্থরা। ছবি: বিসিবি।

তাইজুলকে সামনে রেখে মাঠ ছাড়ছেন সতীর্থরা

রেকর্ডের পর তো অনেকের কাছ থেকেই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা পেয়েছেন, কোনটা বেশি দাগ কেটেছে হৃদয়ে?

তাইজুল: প্রত্যেকের উইশ আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে আমার জন্য একটি শব্দও লিখেছে, সবারটিই আমার সমান ভালো লেগেছে। উইশের তো আসলে কম ভালো বেশি ভালো নেই।

ড্রেসিং রুমে টিম মিটিংয়ে সবাই একসঙ্গে উইশ করেছে। এই ম্যাচের একটি স্টাম্প আমাকে উপহার দিয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় অনেকের উইশ তো আপনারা দেখেছেন। আমার কাছে সবকটিই মূল্যবান। 

ম্যাচের বলটা তো রেখেছেন?

তাইজুল: নাহ, নরমালি তো ৫ উইকেট পেলে বল দেওয়া হয় বা নেই। দুই ইনিংসেই চারটি করে উইকেট হলো। এজন্য আর বল নেইনি। আমি চাইলে অবশ্য পেয়ে যেতাম। তখন মনে হয়নি যে বল নেই। পরে আমার স্ত্রী বলল, বলটা তো রেখে দেওয়া উচিত, এত স্মরণীয় অর্জন। পরে শাহরিয়ার নাফীস ভাইকে (বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ইন চার্জ) বলেছি, বলটা পাওয়া যায় কি না। 

আপনার ক্যারিয়ারের শুরুতে একটু ফিরে যাওয়া যাক। সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে আপনার অভিষেক হয়েছিল ২০১৪ সালে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খুব বেশি খেলেননি তখন। টেস্ট অভিষেকেই ৫ উইকেট নিলেন। পরে দেশের মাঠে অভিষেকে ৩৯ রানে ৮ উইকেট নিলেন, ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট সেটি। এখনও দেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। কেমন ছিল ওই সময়টা?

তাইজুল: সত্যি কথা বলতে কী, ওই সময়টায় খুবই কম বুঝতাম। শুধু জানতাম, আমাকে বল করতে হবে এবং জায়গায় বল ফেলতে হবে। আর কিছু ভাবতাম না। পারফর্ম করতে হবে, না করলে বাদ পড়ব, এসব কিছু মাথায়ও আসত না। 

আমার বোলিং করতে ভালো লাগত, উপভোগ করতাম। ব্যস, বোলিংই করতাম। অনেক সময় অনেক কিছু ভাবলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। চাপ চলে আসে। আমার মধ্যে এসব ব্যাপারই ছিল না। বাইরের কোনো চিন্তাই মাথায় আসে নাই। অতশত আসলে বুঝতাম না। শুধু জানতাম, দলের কাজে লাগার জন্য খেলছি। 

অন্য অনেকেই অনেকরকম ভাবতে পারে। তবে আমার ভাবনা এরকমই ছিল। জটিল কিছু মাথায় ছিল না। মাঠে নেমে বল করতাম। বল করে চলে আসতাম। 

সময়ের সঙ্গে তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে বোলিংয়ে?

তাইজুল: ওসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে হয়। যত খেলবেন, তত শিখবেন আর বোলিংয়ে কাজে লাগবে।

কেউ যদি বলে অভিজ্ঞতার মূল্য নেই, তাহলে বিরাট ভুল। দুই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা আর ১০ বছর খেলার মধ্যে পার্থক্য আছে। 

যার ক্যারিয়ারের বয়স ১০ বছর, সে অনেক সময় পারফরম্যান্স না করলেও দলে থাকলে, ছোট্ট একটা পরামর্শ দিলে অনেক বড় কিছু হতে পারে। আমাদের সিনিয়র ভাইরা আগে এসব করেছেন। এখনও মুশফিক ভাই কিন্তু নানারকম পরামর্শ দেন সবসময়। একটা দলের জন্য এসব অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একটা দলে যখন অভিজ্ঞদের মূল্যায়ন করা হয়, তখন সেই দল ভালো জায়গায় পৌঁছে যায়। 

সুনির্দিষ্ট করে আপনার বোলিংয়ের কথা বললে, মোহাম্মদ রফিক বা সাকিব আল হাসান, তাদের আর্ম ডেলিভারি একসময় দুর্দান্ত ছিল। অন্যান্য কিছু তো ছিলই। আপনার আর্মার বা অন্য সেরকম কোনো ডেলিভারি অসাধারণ ছিল না, গতি বৈচিত্র, অ্যাঙ্গল, ক্রিজের ব্যবহার, টার্ন, ধৈর্য, এসব নিয়ে আপনি শিকার ধরেছেন। কীভাবে সম্ভব হলো এতটা পথ পাড়ি দেওয়া?

তাইজুল: আমি যখন থেকে স্পিন করা শুরু করেছি, তখন থেকেই অনেক বোলিং করতাম। দিনের পর দিন এমন হয়েছে, টানা দুই-তিন ঘণ্টা বোলিং করেছি। অভ্যাসটা গড়ে উঠেছে।

এরপর ম্যাচেও যখন টানা লম্বা সময় বোলিং করেছি, তখন অনেক বৈচিত্র আপনাআপনি চলে আসে। অনেক কিছু চেষ্টা করা যায়। বলের গ্রিপের সঙ্গে হাত আর মাথার একটা কম্বিনেশন হয়ে যায়। এটা হয়ে গেলেই টপ স্পিন, সাইড স্পিন, নানা কিছু করা যায়।

আমার হয়তো স্পেশাল কিছু ছিল না, অসাধারণ কোনো ডেলিভারি ছিল না, তবে ছোট ছোট অনেক কিছু আছে, ভালো কিছু আছে, যেগুলো কাজে লেগেছে। সেগুলো মিলেই আমি। সবসময় চেষ্টা করেছি উইকেট ও কন্ডিশন বুঝে বল করতে। কোনো পিচ হয়ত ৫০০-৬০০ রানের পিচ। দল হিসেবে আমাদের চেষ্টা থাকে প্রতিপক্ষকে ৪০০-৪৫০ রানে আটকাতে। ভিন্ন উইকেটে আবার ভিন্ন পরিকল্পনা থাকে। কোনো ম্যাচে হয়তো ৫০ ওভার বোলিং করে ১২০ রানে ৪ উইকেট নিতে পারা খুব ভালো বোলিং, কোনো ম্যাচে ৫০ রানে ৫ উইকেট। এভাবেই হয়।

বোলিংয়ের ভূমিকাও তো নানা সময় ভিন্ন ছিল! সাকিব থাকলে বেশিরভাগ সময়ই আপনি ছিলেন সাপোর্টিভ ভুমিকায়, সাকিব না থাকলে আপনিই মূল স্পিনার। তখন কি শুধু মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই আনতে হয়েছে নাকি বোলিংয়ের ধরনও বদলেছে?

তাইজুল: বোলিংয়ের ধরন বদলানো মানে, সাকিব ভাই না থাকলে বেশির ভাগ সময়ই আমাকে লম্বা বোলিংয়ের জন্য তৈরি থাকতে হয়েছে। সাকিব ভাই থাকলে হয়তো কখনও ২০ ওভার করলাম, কখনও ৩০ ওভার। সাকিব ভাই না থাকা মানে, কখনো কখনও ৫০-৬০ ওভার করার প্রস্ততিও নিতে হয়েছে। তখন যদি শরীর না চলত, হাত না ঘুরত, তাহলে কিন্তু পারতাম না দলের চাহিদা মেটাতে। এটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল।  

আর বোলিংয়ের ব্যাপারটিই হচ্ছে পার্টনারশিপ বোলিং। সাকিব ভাই থাকার সময়ও বিভিন্ন সময়ে ভূমিকা বদলেছে। কারণ একেকদিন একেকজনের বোলিং একেকরকম হয়। কখনও হয়তো সাকিব ভাই অ্যাটাকিং বোলিং করছেন, তখন আমাকে রান আটকানোর কাজ করতে হতো। কোনো স্পেলে আমার বোলিং ভালো হলে সাকিব ভাই হোল্ডিং রোলে থাকতেন। এভাবেই হতো। এখনও মিরাজের সঙ্গে বা হাসান মুরাদ এসেছে, এভাবেই হয়।

আপনার বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে একটু ফিরে তাকানো যাক। আপনি এখন দেশের সফলতম টেস্ট বোলার। কিন্তু ছেলেবেলাটা তো খুব কঠিন ছিল!

তাইজুল: হ্যাঁ, অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনেক মানে অনেক! 

আমার আব্বা সরকারি চাকরি করতেন, হর্টিকালচারে। বড় মাপের কিছু নয়, নরম্যাল চাকরি। ওই বেতনে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হতো উনার। তবু কোনোরকমে চলছিলাম আমরা। সমস্যা হলো, বড় বোনের বিয়ের সময় আব্বা মোটা সুদে ঋণ নিলেন কিছু। সেই টাকা পরে আর শোধ করা যাচ্ছিল না। সংসার চালানোর পর সুদের টাকাটাই দিতে পারছিলেন না।

এক পর্যায়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন আগেই, যাতে একসঙ্গে কিছু টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু সেই টাকাতেও ঋণ শোধ হয়নি। খুব কঠিন দিন গেছে আমাদের। আমার তখন ৮-১০ বছর বয়স হবে সম্ভবত।

পরে আব্বা পুরোনো কাপড় বিক্রির কাজ শুরু করলেন। টাকাপয়সার অনেক টানাটানি ছিল। তবে বাবা-মায়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আমাকে কখনও দোকানে বসতে বলেননি বা কিছু করতে বলেন। নিজের ইচ্ছেয় মাঝেমধ্যে আমি বসেছি। কিন্তু তারা কখনও বলেননি। ১৫-১৬ বছর বয়সেও কিছু করতে বলেননি। বরং বলেছেন, ‘তোমার ক্রিকেট খেলতে ভালো লাগে, ক্রিকেটই খেলো।’ আমাদের মতো অর্থকষ্টের পরিবারে এই সাপোর্ট অনেক বড় ব্যাপার। 

আমি যখন অনূর্ধ্ব-১৩ জেলা পর্যায়ে খেলছি, পরে অনূর্ধ্ব-১৫, জেলায় যখন আমাকে নিয়ে আলোচনা চলছে, আব্‌বা সবসময়ই বলেছেন খেলা চালিয়ে যেতে। একসময় নাটোর থেকে নিয়মিত রাজশাহীতে গিয়ে প্র্যাকটিস করতাম। ভাড়ার টাকাও ঠিকমতো ছিল না। অনেক কষ্টে আব্বা ম্যানেজ করেছেন। 

আব্বার দেনার পরিমাণ বাড়ছিল। প্রতিদিনই বাসায় কোনো না কোনো পাওনাদার আসতেন। অনেক কথা শোনাতেন। তাদেরও দোষ নেই, ধার দিয়ে কতদিন অপেক্ষা করা যায়! তখন আমার মনে হতো, জীবনে যা-ই করি, আব্বার দেনাগুলো যদি শোধ করতে পারতাম, বাসায় যদি পাওনাদার না আসত! মনে হতো, ঋণগুলো শোধ করতে পারলে জীবনে আর কিছুর দরকার নেই।   

ক্রিকেটের শুরুটা কিভাবে হলো?

তাইজুল: ছোট থাকতে পাড়ায় খেলতাম টেনিস বলে। আমার এক চাচা ছিলেন, মারা গেছেন, উনি একদিন মাইকিং শুনলেন যে অনূর্ধ্ব-১৩ ট্রায়াল হবে স্টেডিয়ামে। আমার চাচা বললেন, “তুই এত খেলা নিয়ে পড়ে থাকিস, তাহলে ওখানে যাস না কেন?” উনিই নিয়ে গেলেন। 

ওখানেই প্রথম ক্রিকেট বল দেখলাম ও ধরলাম। একটু আলাদা ছিল, ভারী লাগছিল।

সবার ওপরে তাইজুল, মুশফিকুর রহিম যেন ফুটিয়ে তুললেন প্রতীকী দৃশ্য। ছবি: বিসিবি।

সবার ওপরে তাইজুল, মুশফিকুর রহিম যেন ফুটিয়ে তুললেন প্রতীকী দৃশ্য

তখন থেকেই কি স্পিনার ছিলেন?

তাইজুল: নাহ, টেনিস বলে খেলার সময় বাঁহাতি পেসার ছিলাম। তবে ছোটখাটো ছিলাম তো অনেক। মঞ্জু চাচা ছিলেন একজন, ক্লাব চালাতেন, আমি ট্রায়ালে ট্রায়ালে যাওয়ার পর উনি বললেন, ‘এত ছোট ছেলে পেস বোলিং করবে কীভাবে! স্পিন করো।’ ওখান থেকেই স্পিনার হলাম। ট্রায়ালে টিকেও গেলাম। 

জেলা পর্যায়ে খেলে অনূধর্ব-১৩ বিভাগীয় ট্রায়ালে ডাক পেলাম। শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় দলে সুযোগ পেলাম না। তবে খেলা ছাড়িনি। আমাদের ওখানে আলাইপুর স্পোর্টিং ক্লাব ছিল, যেটি চালাতেন মঞ্জু চাচা। মারা গেছেন উনি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। উনার ক্লাবে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করি। পরে অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগীয় দলে সুযোগ পেলাম। অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় ক্যাম্পেও ছিলাম, বিকেএসপিতে হয়েছিল। তখন একটা টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা ছিল, পরে বাদ হয়ে যায়। 

এরপর অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯, সব পর্যায়েই ছিলাম। সাব্বির রহমান, মুমিনুল হক, ওরাও ছিল তখন। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের একটা সিরিজ খেলেছিলাম শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। কিন্তু পরে টিকতে পারিনি, বিশ্বকাপও খেলতে পারিনি। এরপর তিন-চার বছর কোনো লেভেলেই সেভাবে ছিলাম না। কিন্তু বোলিং চালিয়ে গেছি।  

সেখান থেকে আবার মূল স্রোতে ফিরলেন কিভাবে?

তাইজুল: ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলে। ওরিয়েন্ট স্পোর্টিংয়ে খেলেছিলাম। সেই দল প্রিমিয়ারে উঠল, আমি ভালো করলাম। পরে শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবে খেললাম। সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ) কোচ ছিলেন। পরেরবার প্রিমিয়ারে আমার খেলার কথা ওল্ড ডিওএইচএসে। সুজন ভাই তখন সেই দলের কোচ, আমাকে নেওয়ার কথা আগেই বলে রেখেছিলেন। তখন প্রাইম দোলেশ্বর একটা দল এলো, সেখানে কোচ পাইলট (খালেদ মাসুদ) ভাই। তিনিও আমাকে নিতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘তাহলে আপনারা দুজন মিলেই ঠিক করে, আমার কোনোটিতেই সমস্যা নেই।’ পাইলট ভাই তখন সুজন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে তার ক্লাবেই নিলেন। দোলেশ্বরের হয়ে সেবার খুব ভালো করলাম। এভাবেই চলতে থাকল।

আপনার টেস্ট দলে আসায় বড় ভূমিকা রেখেছিল তো ২০১৪ বিসিএল?

তাইজুল: হ্যাঁ, অনেক উইকেট পেয়েছিলাম সেবার (৪ ম্যাচে ৩৭টি)। যদিও তখন ভাবিনি যে সুযোগ পেয়ে যাব। সাকিব ভাই তো ছিলেনই, সানি ভাইরা (ইলিয়াস সানি) ছিলেন। আল্লাহর রহমত ছিল, সুযোগ পেয়েছিলাম।

বেড়ে ওঠার সময়টায় অভাব-অনটনে আপনার পড়াশোনা তো সম্ভবত এগোয়নি!

তাইজুল: অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। চেষ্টা করেছি পড়াশোনা করার। মহারাজা জেএন হাই স্কুলে পড়তাম। তবে বেশিদূর এগোতে পারিনি। নানা সমস্যা ছিল। পরে তো খেলাধুলা নিয়েই থাকতাম। কোনোরকমে এসএসসি পাশ করেছি। এরপর নানা কারণে আর হয়নি। খেলা নিয়েই ছিলাম। 

নাটোর রাজবাড়ীর পাশে কাঠালবাড়িয়া এলাকায় আমাদের বাড়ি। মহারাজা হাইস্কুলের মাঠ ছিল, ডোমপাড়া মাঠ বলে আর কী। সেখানেই খেলতাম। 

আজ এত বছর পরে আপনি নিজের পেশায় সফল, দেশের সফলতম টেস্ট বোলার, পেছন ফিরে তাকালে কেমন লাগে? সেই দিনগুলোর কথা ভাবেন?

তাইজুল: ভাবি, অনেক ভাবি। ভালো লাগে যে, জীবনে যা করতে চেয়েছি, তা পেরেছি। নিজের ভালোলাগার জায়গাটায় কিছু হলেও করতে পেরেছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। 

ওই সংগ্রামের দিনগুলোতে মনে হতো, প্রতিটি দিন অনেক লম্বা। সময় যেতে চাইত না। এখন মনে হয়, কত দ্রুত সব হয়ে গেল, সময় বদলে গেল! একটা কথা আছে না, চোখের পলকে? ওরকমই মনে হয় এখন। 

নিজের জীবন থেকে আমি বিশ্বাস করি, কোনো কিছু নিয়ে লেগে থাকলে সফল হবেনই। প্রতিভা সবারই কিছু না কিছু থাকে। সেটা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কষ্ট করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।  

নাটোরে আপনার বন্ধু-বান্ধবরা নিশ্চয়ই খুব গর্বিত?

তাইজুল: হ্যাঁ, অবশ্যই। নাটোরে গেলে আমি যতটুকু পারি, সময় দেই। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু আছে, তাদের সঙ্গে সময় কাটাই।  

নাটোরের ক্রিকেটের অবস্থা কেমন এখন? আগের চেয়ে বদলেছে?

তাইজুল: একটা সময় নাটোরে খুব ভালো ক্রিকেট সংস্কৃত ছিল। খেলা হতো অনেক। এখনও সবাই খেলতে চায় আর কী….। এখন নাটোরের সুজন হাওলাদার, শাকিল হায়দার, ওরা জাতীয় লিগে খেলে। আরও যারা উঠে আসছে, খারাপ না তারা। হয়তো সামনে ভালো কছু করবে।

প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগে খেলে, এরকম ক্রিকেটার আছে কিছু। নাটোরের পুরোনো ক্রিকেটার যারা, তারা চেষ্টা করে নতুনদের নানা জায়গায় সুযোগ করে দিতে। 

সমস্যা যেগুলো আছে, সেগুলো আসলে সব জেলাতেই আছে। জেলা পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়লে, নিয়মিত লিগ হলে আরও ক্রিকেটার উঠে আসবে। 

যখন আপনি জাতীয় দলে এলেন, নিয়মিত খেলতে থাকলেন, অভাব-অনটন দূর হলো, জীবন গুছিয়ে নিলেন, তখন আপনার বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

তাইজুল: উনারা সেভাবে কিছু বলেননি আমাকে। তবে তাদের ভালো লাগে, এটা তো বুঝি। উনাদের আসলে জীবনে সেরকম চাওয়া-পাওয়া ছিল না। অনেক কষ্ট করেছেন জীবনে, ধারদেনা করে চলতে হয়েছে, লোকের কথা শোনা, এসব তো আসলে খুব যন্ত্রণার। পরে যা পেয়েছেন, তাতেই তারা খুশি। উনাদের ভালো থাকতে দেখলে আমারও ভালো লাগে। 

উনারা কি নাটোরেই থাকেন?

তাইজুল: হ্যাঁ, ঢাকায় এসে বেশিদিন থাকতে পারেন না। আসলে খোলামেলা পরিবেশে থেকে অভ্যাস, ঢাকায় তাদের মন টেকে না। মাঝেমধ্যে এসে কিছুদিন করে ঢাকায় থেকে যান। আম্মার যখন আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে, অনেক দিন যদি বাড়িতে যাওয়া না হয়, উনারা চলে আসেন। আব্বা আমার বাচ্চাদের খুব মিস করেন। আমার বাচ্চাদের জন্য উনি পাগল। ওদেরকে বেশি দেখতে ইচ্ছে করলে চলে আসেন। 

আবার একটু ক্রিকেটে ফেরা যাক। ইনিংসে ৮ উইকেট নিয়েছেন, ওয়ানডে অভিষেকে হ্যাটট্রিক করেছেন, আরও অনেক ভালো পারফরম্যান্স আছে আপনার। নিজের কাছে সেরা বা প্রিয় কোনটি? 

তাইজুল: বিশ্বাস করুন, প্রতিটি উইকেটই আমার প্রিয়। কারণ, দলের জয়ের জন্য প্রতিটি উইকেটই দরকার। সব উইকেট না নিলে তো জিততে পারবেন না। 

এই মিরপুর টেস্টেই ধরুন, শেষ দিনে ওদের জুটি হলো। আমরা তো চিন্তা করছিলাম যে জুটি ভাঙা দরকার। হাসান মুরাদ যে উইকেট নিল, হয়তো বড় ব্যাটসম্যান নয় (গ্যাভিন হোয়ে), কিন্তু দলের জন্য খুব জরুরি ছিল। আমি এভাবেই চিন্তা করি। যখন যে দেশের সঙ্গে খেলি, প্রতিটি উইকেটই স্পেশাল মনে করি। আমার আড়াইশ উইকেট। সেখানে লেখা নেই, কে টপ অর্ডার, কে লোয়ার অর্ডার। প্রতিটিই আমার কাছে মূল্যবান। দলের কাজে লেগেছে, এমন প্রতিটি পারফরম্যান্সই আমার কাছে স্পেশাল, সেটা ৮ উইকে হোক বা ১ উইকেট। 

তবু বড় ব্যাটসম্যানদের উইকেট বেশি তৃপ্তি দেয় না? যেমন, কেন উইলিয়ামসনকে আপনি তিন টেস্টে চারবার আউট করেছেন…

তাইজুল: এভাবে নাম ধরে যদি জিজ্ঞেস করেন… হ্যাঁ, ভালো লাগা তো আছেই। এত বড় ব্যাটসম্যান, নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা মনে হয়। তাকে সিলেটে আউট করেছি দুই ইনিংসে, মিরপুর করেছি, ওদের ওখানে গিয়েও (ওয়েলিংটনে) আউট করেছি, কট অ্যান্ড বোল্ড ছিল। 

এভাবে আলাদা করে জানতে চাইলে আলাদা ব্যাপার। তবে সত্যি আমার কাছে প্রতিটি উইকেটই ভালো লাগে। 

হাসান মুরাদের কথা বললেন। দেশের ক্রিকেটে তো তাকে মনে করা হচ্ছে আপনার উত্তরসূরী…

তাইজুল: মুরাদ খুব ভালো বোলার, প্রতিভাবান। ও খেলাটা বোঝে, এটা বড় ব্যাপার। কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, কিছুক্ষণ পর কী হতে পারে বা পরের সেশনে কোন দিকে যেতে পারে খেলা, এসব বোঝা টেস্ট ক্রিকেটে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুরাদ তা বোঝে। এটা ওর বড় শক্তির জায়গা। ওর সঙ্গে আমার মাঠের ভেতরে-বাইরে অনেক কথা হয় বোলিং নিয়ে, নানা কিছু নিয়ে। অনেক দূর যাবে ও। 

আমাদের বাঁহাতি স্পিনাররা সবাই ভালো করছে। নাসুমকে দেখুন, গত কয়েক সিরিজে দুর্দান্ত বল করেছে। ভালো ব্যাটিংও করছে। তানভির ভালো করছে। রকিবুল তো গত কয়েক বছরে সব জায়গায় ভালো করেছে, যেখানেই খেলেছে। এখন আমাদের পাইপলাইনে অনেক ভালো স্পিনার আছে। 

ঘুরতে পছন্দ করেন তাইজুল ও তার স্ত্রী ঝুমু ইসলাম। ছবি: ঝুমু ইসলামের ফেইসবুক।

ঘুরতে পছন্দ করেন তাইজুল ও তার স্ত্রী ঝুমু ইসলাম

হেরাথের কথা বলছিলেন আলোচনার শুরুতে। আরও স্পিন বোলিং কোচ পেয়েছেন নানা সময়ে, ড্যানিয়েল ভেটোরি, সুনিল যোশি, এখন মুশতাক আহমেদ। কার সঙ্গে আপনার জমেছে বেশি?

তাইজুল: সবার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। একেকজনের বোঝানোর প্রক্রিয়া একেকরকম। কোচ হিসেবে তো সবাই ভালো। তবে আমি যেটা বেশি দেখি, তা হলো কে কতটা কেয়ার নিতে পারে। একজন ক্রিকেটারের ভালো সময় আসে, খারাপ সময় আসে। কিন্তু তার প্রতি কোচের মনোভাব একইরকম থাকতে হয়। আমার কাছে ওই সময়ের যত্ন, পাশে থাকা, এসব গুরুত্বপূর্ণ। আমার ভাগ্য ভালো, সবার কাছ থেকেই পেয়েছি সেটা। সবার কাছ থেকেই শিখেছি। 

দেশের কোচ সোহেল ভাইয়ের কথা না বললেই নয়। আমার বোলিং দেখে বা অ্যাকশন দেখেই উনি বুঝে ফেলেন কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে নাকি সব ঠিকঠাক আছে। 

আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, একটা সময় আমি অ্যাকশন বদল করে ভিন্ন কিছু চেষ্টা করছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, নতুন কিছু চেষ্টা করতে তো দোষ নেই। নিজেকে অন্য লেভেলে নেওয়ার চেষ্টা না করলে তো কিছু হবে না। যাহোক, সেসময় অনেক আলোচনা হয়েছে, কথা শুনতে হয়েছে, নেতিবাচক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সোহেল ভাই আমাকে পুরো সাপোর্ট দিয়েছেন, সবসময় প্রেরণা দিয়েছেন ও বোলিং নিয়ে কাজ করেছেন। তার মতো একজন কোচ পাওয়া আমার জন্য সৌভাগ্যের। 

আপনাকে সবাই ধীরস্থির, শান্ত হিসেবেই চেনে। ড্রেসিং রুমে আপনি কেমন?

তাইজুল: নাহ.. আমি দুষ্টুমি করি। অনেক দুষ্টুমি করি। বিশেষ করে নিজেদের মধ্যে কোনো গেম খেললে বা মজা-টজার সময়, অনেক কিছুই করি।

সাকিব তো বলেছেন, আপনার নামের পাশে ৪০০ উইকেট দেখতে চান। কি মনে হয়, পারবেন?

তাইজুল: সাকিব ভাই চিন্তাভাবনা না করে কিছু বলার কথা নয়। উনি গ্রেট ক্রিকেটার, খেলাটা বোঝেন। উনি নিশ্চয়ই চিন্তা করেছেন, তাইজুল আর কবছর খেলতে পারে… চার-পাঁচ বছর যদি খেলে, বাংলাদেশের কতগুলি টেস্ট ম্যাচ আছে, সব ভেবেই হয়তো উনি বলেছেন ৪০০ উইকেটের কথা। 

আমার খুব ভালো লেগেছে। উনার মতো বিশ্ব ক্রিকেটের একজন গ্রেট আমাকে নিয়ে এত বড় আশা করেছেন, এটা দেখে ভালো লেগেছে। আমি চেষ্টা করব তার আশা পূরণ করতে, ইনশাল্লাহ। 

মাঠের বাইরে তাইজুল কেমন? কি ভালো লাগে আপনার?

তাইজুল: ঘুরতে ভালো লাগে। দেশের ভেতরে-বাইরে যখনই সুযোগ পাই, চেষ্টা করি সুন্দর জায়গাগুলোতে ঘুরতে। আমার স্ত্রীও খুব ঘুরতে পছন্দ করে। ও আমাকে একটা কথাই বলে, ‘তোমার কাছে কিছু চাই না, শুধু সুন্দর সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাবে…।’ আমি চেষ্টা করি সাধ্যমতো। এই যে এখন খেলা নেই, আমার খুব ইচ্ছে করছে কোথাও যেতে। কিছু ব্যস্ততার কারণে পারছি না।

কোথাও বসে লম্বা সময় আড্ডা দিতেও ভালো লাগে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। খেতে পছন্দ করি। নির্দিষ্ট কিছু নেই, মুখে যা ভালো লাগে, সব খাই। 

বাইকের নেশা আছে আমার। বাইক চালাতে ভালো লাগে। বাইকে ঘুরতেও যাই অনেক। 

সংবাদ সম্মেলনে আপনার লক্ষ্য বা স্বপ্ন নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে নির্দিষ্ট করে বলতে চান না। আসলেই স্বপ্ন নেই?

তাইজুল: স্বপ্ন ছাড়া তো মানুষ হয় না ভাই। সবারই স্বপ্ন আছে। আমি নিজের মধ্যে রাখতে চাই আর কী।

আমার একটা স্বপ্ন… বা আশা বলতে পারেন, ফ্রেশ থেকে খেলা ছাড়তে চাই। শুদ্ধ থেকে, সবাই যেন বলতে পারে ছেলেটা সবসময় সৎভাবে ক্রিকেট খেলেছে। মন দিয়ে খেলেছে। 

খেলার ছাড়ার পর একটা ইচ্ছে আছে, বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। নিজে যা কিছু শিখেছি, ওদের শেখাতে চাই। তবে ভালো পরিবেশ থাকতে হবে। পরিবেশ বলতে ধরুন, শুধু সম্মানী নয়, সম্মানী খুব কম হলেও সমস্যা নেই, এমন পরিবেশ যেন থাকে যে বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করাটা উপভোগ করব আমি। সম্ভব হলে কখনও বড় আকারে কাজ করতে চাই বাচ্চা ও তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে।