‘বেবি এবি’ নন, ব্রেভিস এখন ‘অরিজিনাল ডেওয়াল্ড’
রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির পর এখন নিজের নামেই পরিচিত হতে চান এবি ডি ভিলিয়ার্সের ক্লোন হিসেবে পরিচিত তরুণ ব্যাটসম্যান ডেওয়াল্ড ব্রেভিস।
‘নতুন এবি ডি ভিলিয়ার্স’ বা ‘ডি ভিলিয়ার্সের উত্তরসূরী’ কিংবা ‘ডি ভিলিয়ার্সের ক্লোন’, ডেওয়াল্ড ব্রেভিসকে মূলত এভাবেই চেনে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার আদুরে ডাক ‘বেবি এবি’ নামে। তবে অন্যের নামের খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে চান ব্রেভিস। ডি ভিলিয়ার্স এখনও তার আদর্শ। তবে রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির পর এখন আপন আলোয় উদ্ভাসিত হতে চান তরুণ ব্যাটসম্যান।
যে প্রতিভার ঝলক বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেট ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এতদিন দেখিয়েছেন ব্রেভিস, অবশেষে প্রথমবার তা মেলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৫৬ বলে ১২৫ রানের অপরাজিত ইনিংস।
ফাফ দু প্লেসির ১১৯ পেরিয়ে টি-টোয়েন্টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এটি। ২২ বছর ১০৫ দিন বয়সে ইনিংসটি খেলে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানও তিনিই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সংস্করণে সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডও এটিই।
শেষ নয় এখানেই, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে প্রথম টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরির কীর্তিও এটি। ৪১ বলে ছুঁয়েছেন সেঞ্চুরি, প্রোটিয়াদের হয়ে যা দ্বিতীয় দ্রুততম।
৮টি ছক্কা মেরেছেন এই ইনিংসে, এর ৬টিই ছিল সোজা ব্যাটে লং অন বা লং অফ দিয়ে। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, এটাই তার খেলার ধরন।
“এটাই আমার শট খেলার সহজাত ধরন। হাজার হাজার বল খেলেছি আমি (অনুশীলনে)… চাই শুধু মাঠে নামতে, উপভোগ করতে, মজা করতে এবং বলে চোখ রাখতে। যখন এটা পাই (নিজের জোনে), তখন স্রেফ হয়ে যায় (এরকম শট)। আমি এটা করার চেষ্টা করি না…আমি নিজের মতো থাকতে চেষ্টা করি, মজা করি, বলে চোখ রাখি, এরপর এটা স্রেফ হয়ে যায়…।”
ইনিংসজুড়েই যথারীতি তার নানা শটে ফুটে উঠেছে ডি ভিলিয়ার্সের ছাপ। কখনও কখনও ধন্দে পড়ে যেতে হয়েছে, এটা ডি ভিলিয়ার্স নাকি ব্রেভিস!
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই এমন তুলনা তার সঙ্গী। একসময় এসব উপভোগও করেছেন। তবে পরে তা হয়ে উঠেছে চাপ। তার স্বাভাবিক খেলাও বিঘ্ন ঘটেছে এই চাপে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর দুই ইনিংসে মোট ৫ রান করে বাদও পড়ে গিয়েছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ফর্ম হারিয়ে একসময় হারিয়ে যাওয়ার পথে ছিলেন।
একসময় প্রতিজ্ঞা করেন, ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে আবার জ্বলে ওঠেন। এসএ টোয়েন্টিতে এমআই কেপ টাউনের শিরোপা জয়ে বড় অবদান রাখেন। লিস্ট ‘এ’ টুর্নামেন্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান আসে তার ব্যাট থেকে। জাতীয় দলেও আবার জায়গা করে নেন।
সম্প্রতি জিম্বাবুয়ে সফরে টেস্ট অভিষেক হয়ে যায় তার। প্রথম ইনিংসে আগ্রাসী ফিফটি করলেও এরপর খুব ভালো করতে পারেননি। জিম্বাবুয়েতে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে কিছু ঝলক দেখালেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিজের সেরাটা মেলে ধরতে পারলেন।
এই ইনিংস যেন তার ওপর থেকে ভার নামিয়ে দিয়েছে অনেকটা। ঘোষণাও তাই দিয়ে রাখলেন, এখন থেকে এভাবেই নিজের পরিচয় পোক্ত করতে চান।
“আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বর আমাকে প্রতিভা দিয়েছেন এভাবে খেলার, আগ্রাসী ব্যাটিং করার। গত বছর ২৮ ডিসেম্বর আমি ওই প্রতিজ্ঞা করেছি। আমার কাছের কিছু মানুষ আছেন, তারা জানেন তারা কারা, যারা আমার ওপর ভরসা রাখেন… মূল ব্যাপারটি ছিল ‘অরিজিনাল ডেওয়াল্ড’ হওয়া এবং সেই জায়গাটিতে থাকা, যেখানে প্রতিটি ডেলিভারি যেখানে থাকবে, স্রেফ বলে চোখ রাখা ও হিট করা।”
“আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, এই জায়গাটিতে আমার থাকতে হবে এবং আমি সেখানে থাকবই। কাজেই নিজেকে নিয়ে আমার সংশয় ছিল না। পুরো ব্যাপারটিই হলো ক্রিকেটের, কীভাবে সবকিছু কাজ করে। রোলার কোস্টারের মতো এটি, কখনও উত্থান থাকবে, কখনও পতন। তবে আমার নিজের কখনও সংশয় ছিল না নিজেকে নিয়ে।”
শুরুর ব্যর্থতাগুলোর জন্য তার আক্ষেপ নেই। বরং কঠিন পথ ধরে এগিয়ে গেছেন বলেই নিজেকে আরও সমৃদ্ধ মনে করেন তিনি। ক্রিকেটবিশ্বকে একটি বার্তাও দিয়ে রাখলেন, এটি তার কেবলই শুরু, এমন ইনিংস আরও অনেক আসবে।
“অবশ্যই আরও আগে এখানে থাকতে পারলে ভালো লাগত। তবে সবটুকুই এই পথচলার অংশ এবং ভুলগুলোই আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এজন্যই আমি আজ এখানে। এই কারণেই এখনও খেলছি। সেই ভুলগুলো সব করতেই হতো, সিনিয়র ক্রিকেটাররা আমাকে যা বলেছিলেন যে আমি এসব করব। তারা আমাকে বলেছিলেন যে ‘এটা করো, ওটা করো’, কিন্তু আমি করছিলাম উল্টোটা। ওই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া দরকার ছিল আজকের অবস্থানে আসতে।”
“এভাবে বলতে পারেন যে, এটা কেবলই শুরু। আমি স্রেফ কঠোর পরিশ্রম করে যেতে চাই, একই প্রক্রিয়ায় থাকতে চাই। পরের ম্যাচ মানে পরের ম্যাচই। এই সেঞ্চুরি এখন উপভোগ করতে পারি, কিছুটা ভাবতে পারি, হয়তো দেখতে পারি (ভিডিও), তবে পরের ম্যাচটি পুরোপুরি নতুন এবং যে কোনো কিছু হতে পারে।”
