এক রানের অপেক্ষায় সাদমানের এক রাত
৯৯ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন সাদমান ইসলাম, প্রথম সেশনে দুই ব্যাটসম্যানের বাজে শটের পরও দিনটি ভালো কেটেছে বাংলাদেশের।
৯৬ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করাটা খুব একটা সুখকর হওয়ার কথা নয়। সেঞ্চুরির এত কাছে গিয়ে কিছু টেনশন, শঙ্কার কিছুটা দোলাচল তো থাকেই। আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ হওয়ার সময় সেই অস্বস্তি নিশ্চয়ই ছিল সাদমান ইসলামের। হুট করে সূর্যের মুখ দেখা গেল আবার। সাদমানের মনেও হয়তো খেলে গেল আশার ঝিলিক। খেলা শুরু হলো আবার। তিনি আরেকটু এগোলেন সেঞ্চুরির কাছে। অপেক্ষা যখন স্রেফ আর একটি পদক্ষেপের, তখন আবার বিপত্তি!
আলো পর্যাপ্ত না থাকায় খেলা বন্ধ হলো আবার। এবার আর হেসে উঠল না প্রকৃতি। গুমোট বিকেলে সাদমান যখন মাঠ ছাড়লেন, নামের পাশে তখন অপরাজিত ৯৯! টেস্টে তৃতীয় সেঞ্চুরির সুবাস পেয়েও রাতটা তাকে কাটাতে হবে অস্বস্তিকর অপেক্ষায়।
দলের স্বস্তি অবশ্য ফিরেছে তার সৌজন্যেই। প্রথম সেশনে দুই ব্যাটসম্যানের বাজে শটে বিদায়ের পর সাদমানের ব্যাটেই মিলেছে ভরসা। আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত নির্ভরতা জুগিয়ে গেছেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে ৭৪ ওভারে বাংলাদেশের রান ৩ উইকেটে ২১৩।
সাদমানের ইনিংসটি তার চেনা রূপেরই উজ্জ্বল সংস্করণ। চোখধাঁধানো ব্যাটিং বা চটকদার শটের পসরা নেই সেখানে। বরং ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, গভীর মনোসংযোগ আর নিজের ভেতর ডুবে গিয়ে দলকে জিইয়ে রাখার নিবেদন।
উইকেটে সকালে ছিল বেশ আর্দ্রতা। বাউন্স ছিল কিছুটা অসম। স্পিনাররা টার্ন পেয়েছেন সকাল থেকেই। সময়ের সঙ্গে অবশ্য কিছুটা সহজ হয়ে আসে উইকেট। তবে বোলারদের জন্য সহায়তা ছিল দিনজুড়েই। সব পরিস্থিতিই সামলেছেন সাদমান। ২১৯ বলের লড়াইয়ে তার ব্যাট থেকে চার এসেছে ১০টি।
দিনের সেরা জুটিতে তার সঙ্গী ছিলেন তাওহিদ হৃদয়। এই ম্যাচ তার খেলার কথা ছিল না। তবে আগের দিন নেটে চোট পাওয়া মুশফিকুর রহিম শেষ পর্যন্ত ছিটকে যাওয়ায় সুযোগ মেলে হৃদয়ের। কাজে লাগাচ্ছিলেন তা ভালোভাবেই। তবে পায়ে টান লাগায় তাকে স্ট্রেচারে করে মাঠে বাইরে নিতে হয় ৪২ রানে।
সকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আঁটসাঁট বোলিংয়ে টসজয়ী বাংলাদেশের শুরুটা খুব সাবলীল হয়নি। সাদমান বরাবরের মতোই ছিলেন সতর্ক, আগ্রাসী তানজিদ হাসানও পারেননি ডানা মেলতে। প্রথম ৬ ওভারে ৯ রান ওঠার পর বাজে শটে উইকেট হারান তানজিদ (২৩ বলে ৭)।
পরের জুটিতে সেই ধাক্কা সামাল দেন সাদমান ও মুমিনুল হক। অস্বস্তির বেড়াজাল ছেড়ে স্বচ্ছন্দ হতে থাকেন দুজন। বাড়তে থাকে রানের গতিও।
১০ ওভার পরই স্পিন আক্রমণে আনে ক্যারিবিয়ানরা। তবে স্পিনারদেরও সামলে নিচ্ছিলেন দুই ব্যাটসম্যান। সবকিছুই মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। হঠাৎই বুঝি মরণ খেলায় মেতে ওঠার খায়েশ জাগল মুমিনুলের। জোমেল ওয়ারিক্যানের প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আলতো ক্যাচে উইকেট উপহার দিলেন দলের অভিজ্ঞতম ব্যাটসম্যান (৫১ বলে ২৮)।
জুটি থামে ৫৯ রানে।
পরের জুটিও জমে গিয়েছিল বেশ। সাদমান ততক্ষণে নিজের জোনে ঢুকে গেছেন। ফিফটি করেন তিনি ৯৫ বলে। নাজমুল হোসেন শান্তও থিতু হতে গিয়েছিলেন প্রায়। তিনিও থামেন ওয়ারিক্যানের বলে। আগের উইকেটের মতোই বোলারের কৃতিত্ব সেখানে খুব একটা নেই। প্যাডল সুইপ করার চেষ্টায় লাইন মিস করে বসেন বাংলাদেশ অধিনায়ক (৪২ বলে ১৯)।
বাংলাদেশের সেরা সময়টা আসে এরপরই। নড়বড়ে হয়ে পড়া লাগাম শক্ত হয় সাদমান ও হৃদয়ের ব্যাটে। পেসারদের সামনে খুব বেশি পরীক্ষায় পড়তে হয়নি দুজনকে। স্পিনেও পড়তে হয়নি বিপাকে। দ্বিতীয় সেশনে আর কোনো উইকেট হারায়নি দল। শেষ সেশনেও দুজন দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন নির্ভরতায়। দারুণ এই জুটি থমকে যায় ৮৮ রানে।
পায়ে ক্র্যাম্প করায় মাঠেই এক দফায় চিকিৎসা হয় হৃদয়ের। কিন্তু একটু পর তার পায়ে টান লাগে আবার। এবার আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। মাঠ ছাড়তে হয় তাকে স্ট্রেচারে করে।
বাকি সময়ে সাদমান ও লিটন দাস আর কোনো বিপদ হতে দেননি। তবে আলোর স্বল্পতার টানাপোড়েনে শেষবেলায় বয়ে আসে সাদমানের সেঞ্চুরিটা না হওয়ার আক্ষেপ। দিনের খেলা শেষে ভারপ্রাপ্ত ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীনের কথায় ফুটে উঠল সেই অস্বস্তি, “সাদমান তো নার্ভাস থাকবেই, আমরা গোটা দলও নার্ভাস।”
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৭৪ ওভারে ২১৩/৩ (সাদমান ৯৯*, তানজিদ ৭, মুমিনুল ২৮, নাজমুল ১৯, হৃদয় আহত অবসর ৪২, লিটন ১০*; সিলস ৮-৩-১৪-১, জোসেফ ১০-১-২৮-০, চেইস ১৩-১-৫৩-০, গ্রেভস ১০-৪-৩০-০, বিশপ ১৯-২-৫০-০, ওয়ারিক্যান ১৪-১-৩৩-২)
