খেলাধুলা ও পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে শাহরিয়ার নাফিসের গবেষণাধর্মী বই
তিন বছরের পরিশ্রমে লেখা নিজের বইয়ে খেলাধুলা ও পড়াশোনা পাশাপাশি থাকলে জীবন কতটুকু সহজ হয়, তা তুলে ধরেছেন শাহরিয়ার নাফিস।
শাহরিয়ার নাফিসের প্রাথমিক পরিচয় সাবেক ক্রিকেটার, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়ে আছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগের দায়িত্ব। এই দুইয়ের বাইরে নতুন এক পরিচয় যুক্ত হল তার নামের সঙ্গে- লেখক।
বন্ধু এইচ এম আতিফ ওয়াফিকের সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন ‘প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইন দা রেস’ নামের একটি বই। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়াবিদদের গল্প তুলে এনে খেলাধুলা ও পড়াশোনার সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
শনিবার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
তিন বছর ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে লেখা বইয়ের পেছনের ভাবনার কথা জানান শাহরিয়ার।
“১০০ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন একদম শীর্ষ পর্যায়ে যায়। কিন্তু বাকিরা যেহেতু শীর্ষ পর্যায়ে যেতে পারছে না। খেলার পাশাপাশি পড়াশোনা থাকলে, জীবনে কতখানি তাকে সাহায্য করে এই ব্যাপারটা আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন খেলোয়াড় প্রচুর সময় ব্যয় করে, এরপরে তার পড়াশোনাটা আসলে কতটুক প্রয়োজন তার জীবনে।”
বইয়ের কাজ কখন শুরু করেছেন এবং বই কীভাবে সাজানো হয়েছে সেই বিষয়েও ধারণা দেন সাবেক এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
“এই বইয়ের কাজ শুরু করেছিলাম ২০২২ সালে। এটা একটা গবেষণাধর্মী বই। যে কাজ করার চেষ্টা করছি, সেটা হচ্ছে বিভিন্ন খেলার ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে কথা বলেছি।
“আমি এখানে জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়, অ্যালান ডোনাল্ডের সঙ্গে কথা বলছি, স্টুয়ার্ট লর সঙ্গে কথা বলছি। ২০০০ সিডনি অলিম্পিকে ৪০০ মিটারের গোল্ড মেডেলিস্ট ক্যাথি ফ্রিম্যানের কোচের সঙ্গেও কথা বলেছি।”
তাদের তথ্য-উপাত্ত বইয়ে কীভাবে সাজানো হয়েছে, সেটাও জানান।
“এমন না যে আমি একে নিলাম বা ওকে নিলাম। আমরা আসলে বিভিন্ন সেক্টরের বিভিন্ন খেলোয়াড় এবং বিভিন্ন প্রফেসরের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে, সেসব গল্প আকারে নিয়ে এসেছি।”
কিশোর বয়সে খেলাধুলার মনোনিবেশ করা ক্রীড়াবিদরা সাধারণত পড়াশোনায় উদাসীন হয়। যেমন, ২০২৬ অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করা আজিজুল হাকিম পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে দলের হয়ে খেলেছেন। খেলাধুলা ও পড়াশোনা একই সঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব সেই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির লক্ষ্যের কথা বলেন ৪১ বছর বয়সী শাহরিয়ার।
“এই উদ্যোগ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্য। এই বইয়ের মূল লক্ষ্য কিন্তু অভিভাবক। তারা যদি এই বই পড়েন, তাহলে ওনারা দেখবেন বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রফেসররা বলছেন পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার অনেক গুরুত্ব আছে। আবার অনেক বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদরা বলছে, খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনারও দরকার আছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।”
২০০৬ সালে বাংলাদেশ দলের প্রথম টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শাহরিয়ার পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে খেলাধুলা ও পড়াশোনা- দুই জায়গায় সমানভাবে মনোনিবেশ করতে হয়েছে তাকে। ব্যক্তিগত সেই অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন।
“(ওয়াহিদুল গণি) স্যার অনেক সময় এরকম বলতেন ক্রিকেট খেলে কী করবি? তুই তো পড়াশোনাই করিস সারাদিন। আমার বাসায় সবসময় (পড়াশুনার) চাপ ছিল। যখন জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়েছিলাম, তখন আব্বার বলা কথা আমার কানে এখনও ভাসে। আব্বা বলত, ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না। তখন খুব বিরক্ত লাগত, জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করছি, আব্বা বলছে ক্রিকেট ভাত দেবে না। কিন্তু ওইটার মর্মটা আমি এখন বুঝি।”
“আমার বাবা-মার সাথে সবসময় একটা দর কষাকষি ছিল। আমার বাবা-মা বলত পড়াশোনা না করলে খেলতে দেব না, এটা ছিল তাদের দর কষাকষির জায়গা। আর আমার ক্ষেত্রে ছিল খেলতে হবে, তার জন্য কিছুটা হলেও পড়াশোনা করতে হবে।”
বিসিবিতে চাকরির পাশাপাশি কোচ হিসেবেও কাজ করেন তিনি। সেখানে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাচ্ছেন তিনি।
“আমি বাচ্চাদের বাবা-মাকে বলি আপনার বাচ্চাদের খেলতে দেন। কিন্তু বাচ্চাকে গিয়ে বলি তুমি যত যাই করো না কেন, যদি পড়াশোনা না করো তাহলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তোমার জীবন খুব কঠিন হবে।”
