২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

বিদেশে উচ্চশিক্ষার মেলা: শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের চোখে টাকাটাই বড় বাধা

“বাজেট কম হলে পরামর্শকরা ঠিকমতো কথাও বলতে চান না। তারা আগে বাজেট শোনেন, এরপর সে অনুযায়ী সময় দেন।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2026, 06:53 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্যকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

তাদের ভাষ্য, আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে লেখাপড়ার জন্য কেউ কেউ পূর্ণ শিক্ষাবৃত্তি (ফুল স্কলারশিপ) পাওয়ার চেষ্টায় আছেন; গন্তব্য বদলানোর ভাবনাও আছে কারো কারো।

শনিবার ঢাকায় বিদেশে উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত এক মেলায় এসে নিজেদের নানা অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা শোনান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ হোটেলে ‘আইডিপি স্টাডি ওয়ার্ল্ড রোডশো’ নামে এ আয়োজন করা হয়।

মেলায় এসেছিলেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মুকিত হাসান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে চান।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া তুলনামূলক ব্যয়বহুল। কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ৬০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যা আমার পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই স্কলারশিপের আশায় আছি। পাশাপাশি কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব, সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি।”

মুকিত বলেন, তার পরিবারের পক্ষে ৩০-৩৫ লাখ টাকার মতো ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু সেজন্যও জমিজমা বিক্রি করতে হতে পারে।

বাজেট কম থাকলে পরামর্শকরাও গুরুত্ব দেন না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বাজেট কম হলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলররা ঠিকমতো কথাও বলতে চান না। তারা আগে বাজেট জিজ্ঞেস করে নেন, তারপর সেই অনুযায়ী সময় দেন।”

ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম রাজ যুক্তরাজ্যে পড়তে চান।

তিনি বলেন, “স্কলারশিপ আমার অবশ্যই লাগবে। নিজস্ব সঞ্চয় আর পরিবার থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা আমার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃত খরচ এর চেয়ে অনেক বেশি।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের এক শিক্ষার্থীও এসেছেন প্রদর্শনীতে, যিনি যেতে চান কানাডায়।

তিনি বলেন, “ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ না পেলে আমার জন্য দেশের বাইরে পড়তে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এর মধ্যে আমার পছন্দের সঙ্গে যায়, এমন কোর্স নেই বললেই চলে।

“আমার ইচ্ছা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স করা। এখানে এসে মনে হচ্ছে, সবকিছু নিয়ে আমাকে আরও ভালোভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী সনেট সরকারও নিজে খোঁজখবর করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “আমি তাড়াহুড়ো করতে চাচ্ছি না। পুরোপুরি রিসার্চ করে শিক্ষাবৃত্তির দিকে আগাব। কিন্তু শিক্ষাবৃত্তি পাওয়ার শর্ত বা যোগ্যতার ব্যাপারে তেমন ধারণা নেই। তাই প্রফেশনাল কারও সাহায্য নিতে চাচ্ছি। মূলত লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো বিষয়ে মাস্টার্স করতে চাই।”

আর্থিক চাপ ও ভিসা জটিলতার কারণে গন্তব্যও বদলাচ্ছেন অনেকে। এদের একজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাইমুর ওয়াজিদ, যিনি কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করতে যুক্তরাজ্যে যেতে চান।

তিনি বলেন, “আমি মূলত অস্ট্রেলিয়া নিয়ে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে অনেক সময় লাগে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলক সহজ মনে হচ্ছে।

 “আর খরচ তো একটা বড় বিষয়। অস্ট্রেলিয়ার জন্য শুনলাম ব্যাংকে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা দেখাতে হবে। আমার পরিবারের পক্ষে এটা সম্ভব নয়।”

তুলনামূলক কম খরচে মালয়েশিয়ায় পড়ার পথ খুঁজছেন আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আম্মার বিন আনিস।

তিনি বলেন, “ওখানে ফাউন্ডেশন কোর্স করে তারপর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম করার সুযোগ পাব। বাজেটটাও তুলনামূলক কম লাগবে, ১৫ লাখের মধ্যে সব হয়ে যাবে হয়তো। পরে সেখান থেকে ইউরোপে মুভ করার সুযোগও থাকবে।”

লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগেই উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কেউ কেউ।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নবম সেমিস্টারের ছাত্র ইমতিয়াজ আজিম বলেন, “আমার স্নাতক শেষ হতে এখনও এক বছরের বেশি সময় লাগবে। এমএসসি করতে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা যেহেতু আছে, আগেভাগেই খোঁজখবর করতে চলে এলাম। সেই অনুযায়ী আর্থিক ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপার তো একটা আছে।”

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নুসরাত আহমেদ যুক্তরাজ্যে পড়তে চান। তিনি বলেন, “আর্থিক বিষয়ে এখনই তেমন কিছু ভাবছি না। তবে স্কলারশিপ তো সবাই চায়, আমিও অবশ্যই সেই চেষ্টা করব।”

সন্তানের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ও খরচের হিসাব মেলাতে প্রদর্শনীতে এসেছেন অভিভাবকরাও। আনিসুর রহমান নামে একজন বলেন, “আমার মেয়ে দেশের বাইরে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। অনলাইনে আমরা ঘাঁটাঘাঁটি করেছি, কিন্তু প্রপার গাইডলাইন পাচ্ছি না।

“কোন দেশ বেশি নিরাপদ হবে, ভালো ইউনিভার্সিটি কোনটা, কোন লোকেশনে গেলে ভালো হবে, কোর্স বা স্কলারশিপ পাওয়ার শর্ত কী—এসব জানতেই আসা। সবশেষে বাজেটও একটা বড় বিষয়।”

আয়োজক প্রতিষ্ঠান আইডিপি বলছে, এবারের আয়োজনে যুক্তরাজ্যের ৮টি, কানাডার ১৭টি, যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি এবং মালয়েশিয়ার ৫টিসহ মোট ৪০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টলগুলোতে ভিড় ছিল বেশি।

রোডশোতে শুধু তথ্য নেওয়াই নয়, পাসপোর্ট ও একাডেমিক কাগজপত্র নিয়ে এসে সরাসরি আবেদনের পরামর্শও নিয়েছেন অনেকে।