‘প্রযুক্তিতে স্বনামধন্য’ কাউকে পায়নি ৩ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
“এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তি বিষয়ের অধ্যাপকদেরই দায়িত্ব পাওয়া উচিত। যতদূর জানি, আইনেও সেরকম আছে,” বলেন ইউজিসির সাবেক সদস্য তানজীমউদ্দিন খান।
দেশের তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ের অধ্যাপককে উপাচার্য পদে বসিয়েছে সরকার, যা আইনের ‘সাংঘর্ষিক’ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উপাচার্য পদে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের শিক্ষাবিদকে’ দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি।
একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে বসানো হয়েছে আল-হাদীস বিষয়ের একজন অধ্যাপককে। একটিতে দায়িত্ব পেয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক।
আরেকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে আছেন সামাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আল-হাদীসের অধ্যাপক
গত ২৯ জুলাই সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দেন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন।
‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২০’ এ উপচার্য নিয়োগের বিষয়টি আছে ১০ নম্বর ধারা।
এই ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, “আচার্য (রাষ্ট্রপতি), তৎকর্তৃক নির্ধারিত শর্তে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে চার বছসরের জন্য উপাচার্য পদে নিয়োগ দেবেন।
“তবে কোনো ব্যক্তি একাধিক্রমে বা অন্য কোনোভাবে দুই মেয়াদের বেশি উপাচার্য পদে যোগ্য হবেন না।”
একই ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, “উপধারা ১-এ যা কিছুই থাকুক, আচার্যের সন্তোষ অনুযায়ী উপাচার্য স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।”
এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে যাই থাকুক না কেন, চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি যাকে উপাচার্য পদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হবেন, তিনিই এ দায়িত্ব পাবেন।”
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি তুলে ধরা হলে জাকির হুসাইন বলেন, “আমি তো নিজেই উপাচার্য হইনি। যারা আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করুন। যারা আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করেই দিয়েছেন বলে আমি মনে করি।”
মাওলানা ভাসানীতে মার্কেটিংয়ের শিক্ষক
গত ১৬ মে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম শহিদুল ইসলাম।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ১০(১) ধারা অনুযায়ী তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। তবে ওই ধারা অনযায়ী মার্কেটিংয়ের অধ্যাপক এ বি এম শহিদুল ইসলামের এ পদের দায়িত্ব পাওয়ার কথা নয়।
ওই ধারায় বলা আছে, “চ্যান্সেলর, তদ্কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে চার বছরের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দেবেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে উপাচার্য এ বি এম শহিদুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের (আইএসডব্লিউআর) অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী তাকে এ দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয় প্রজ্ঞাপনে।
তবে আইন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ অধ্যাপকের উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়ার কথা নয়।
কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে উপাচার্য পদে বসানো কথা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চ্যান্সেলর যাকে চান, তাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিতে পারবেন।”
তাকে ধারা ১০(১) অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে বলে তুলে ধরলে তিনি বলেন. “আমি সোস্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক। এতেতো সায়েন্স আছে।”
সার্চ কমিটি নিষ্ক্রিয়, ‘নীতি-নির্ধারকদের ইচ্ছায়’ নিয়োগ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের প্রার্থী সুপারিশ করতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সার্চ কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই কমিটি অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
মন্ত্রণালয়ের তৎকালীণ প্রধান হিসাবে শিক্ষা উপদেষ্টাকে ওই কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। আর সদস্য হিসাবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-ইউজিসির তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ও অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আজিম।
কথা ছিল, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য তিনজন প্রার্থীর সুপারিশ প্রণয়ন করবে এ সার্চ কমিটি।
আর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগ এ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা করবে।
উপচার্য পদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বিষয়ে আসলে মন্তব্য করার সুযোগ আমার নেই। আমরা (বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগ) উপাচার্য পদ নিয়োগের জন্য নাম পেলে তা প্রসেস করি। এতটুকুই।”
সার্চ কমিটির মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগে প্রার্থী সুপারিশ এখনও করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব বলেন, “সার্চ কমিটি আছে। আর মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও নাম প্রস্তাব করা হয়। আমরা সেটি প্রসেস করি।”
সরকারের পালাবদলের পর থেকে সার্চ কমিটি অনেকটাই নিষ্ক্রিয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন কমিটির একজন সদস্য।
এই নিয়োগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। সাড়া পাওয়া যায়নি ‘হোয়াটস অ্যাপে’ বার্তা পাঠিয়েও।
সরকার উচ্চশিক্ষা নিয়ে যা বলছে ‘সেই পথে নেই’
সার্চ কমিটির সদস্য ছিলেন ইউজিসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ অধ্যাপক গত ২৩ এপ্রিল ইউজিসির সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ অধ্যাপক গত ২৩ এপ্রিল ইউজিসির সদস্য পদত্যাগ করেন।
অন্য বিভাগের অধ্যাপককে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে বসানোর বিষয়টি ‘আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এটি হাস্যকর। এ থেকে বোঝা যায়, যারা বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন সম্পর্কে অবগত নন।
“একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদের দায়িত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের একজন শিক্ষাবিদেরই পাওয়া উচিত। যতদূর জানি আইনেও সেরকমটা আছে। কারণ ওই প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নেতৃত্ব দিতে সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে ধরনের গবেষণা, প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা প্রয়োজন, তা অন্যদের থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক।”
তিনি বলেন,“এ থেকে আরো বোঝা যায়, বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফেরানোর যে কথা মুখে বলছে, বাস্তবে সে পথ থেকে উল্টো দিকেই হাঁটছে। সরকার যদি তার কথায় থাকত, তাহলে এমন ঘটনা আমরা দেখতাম না।”
