শিক্ষক মূল্যায়নের এখতিয়ার ‘ডাকসুকে কে দিয়েছে?’
“ডাকসু যেটা করেছে, সেটা নিয়ে আমরা বসব; আলাপ-আলোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব,” বলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আলফেছানী।
শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব মূল্যায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) যে কার্যক্রম চালু করেছে, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি অনেক শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন।
ডাকসুর এ উদ্যোগ নিয়ে মূলত দুটি জায়গা থেকে আপত্তি তুলেছেন তারা।
তাদের প্রথম কথা হলো, শিক্ষক মূল্যায়নের ‘এখতিয়ার’ তাদের নেই। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের মূল্যায়নে রাজনীতিকীকরণের আশঙ্কা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ‘শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি’ উদ্বোধন করে ডাকসু। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মও (duevaluation.com) চালু করেছে তারা।
সেখানে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬টি বিভাগের ২,০৪৫ জন শিক্ষকের বিষয়ে ৬ হাজার ৬১৫ জন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করেছেন। এ মূল্যায়নে কোনো কোনো শিক্ষক ৫ এর মধ্যে ৫, আবার কোনো শিক্ষক ১ বা ২ ‘রেটিং’ পেয়েছেন।
ডাকসুর এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার এখতিয়ার নেই বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ডাকসু কোনোমতেই এটা পারে না। এটা ডাকসুর কোনো এখতিয়ারে নেই।
“আমাকে মূল্যায়ন করার এখতিয়ার ডাকসুকে কে দিয়েছে? তারা যদি নিজেদের বিকল্প প্রশাসন হিসেবে সব দায়িত্ব নিতে চায়, এটা তারা করুক।”
তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই শিক্ষক মূল্যায়নের বিষয়ে গত একাডেমিক কাউন্সিলে একটা নীতিমালা পাস করেছি। আমরা ধাপে ধাপে সেটা বাস্তবায়ন করব। শিক্ষক মূল্যায়ন ২০২২ সালে চালু করা হয়েছিল। কোভিডের কারণে সেটা পরে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সেটাকে নতুন করে রিভাইভ করার উদ্যোগ নিয়েছি।
“এখন ডাকসু যেটা করেছে, সেটা নিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বসব। আলাপ-আলোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) গঠনতন্ত্রে শিক্ষকসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বের কথা বলা হয়নি।
২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়।
পরে ২০২৪ সালে এ পদ্ধতির অংশ হিসেবে ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও করা হয়েছিল।
সেখানে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি শর্ত পূরণ করে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারতেন বলে জানিয়েছেন তৎকালীন সাবেক ডিন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা ২০২৩ সালে এক বছর, অর্থাৎ দুটি সেমিস্টারের শিক্ষক মূল্যায়ন চালু করেছিলাম। এজন্য একটা ওয়েবসাইটও হয়েছিল। সেখানে প্রতি সেমিস্টারে ৭০ শতাংশ ক্লাসে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা ফাইনাল পরীক্ষার আগে মত দিতে পারতেন।”
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের সেই মূল্যায়ন গোপনীয় একটা ব্যাপার ছিল।”
সাবেক আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক আসিফ হোসেন খান বলেন, “২০২২ সালে শিক্ষক মূল্যায়নের যে নীতিমালা করা হয়েছিল, তা ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে বাস্তবায়ন করা হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা ৯৬টি বিভাগেই একযোগে শুরু করার কথা ছিল।”
শিক্ষক মূল্যায়নের প্রক্রিয়া কী
ডাকসুর ঘোষণা অনুযায়ী, তারা ওয়েবসাইট চালু করেছে, সেখানে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে ডাকসু বলেছে, “একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করলে ওই ঠিকানায় একটি কোড পাঠানো হবে। সেই কোড ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।”
এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী সেই ওয়েবসাইটে লগইন করে সেই বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেন। ফলে একজন শিক্ষার্থী একজন শিক্ষকের ক্লাস না করেও মন্তব্য করার সুযোগ রয়েছে, যা নিয়ে একাধিক শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসিফ হোসেন খান বলেন, “২০২৪ সালে আমরা যে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি করেছি, সেখানে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে হলে ন্যূনতম ৭০ শতাংশ ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই শিক্ষার্থী যে সেমিস্টারে পড়ছে, সেই সেমিস্টারের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ছাড়া আর কাউকে মূল্যায়ন করতে পারবেন না। কিন্তু এখন একজন শিক্ষার্থী ক্লাস না করেও যদি মন্তব্য করতে পারেন, তাহলে সেটা হবে শুধুই লোক দেখানো।”
ওয়েবসাইট নিয়েও প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে ডাকসু যে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ নিয়ে সাবেক আইসিটি সেলের পরিচালক আসিফ হোসেন খান বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে একটা ওয়েবসাইট যারা চালাচ্ছেন, তারা যেহেতু শিক্ষার্থীদের পরিচয় প্রকাশ করবেন না, তাহলে সেখানে যে আসলেই শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন করেছে, তা কী করে বুঝব? আর এমনও হতে পারে যে, যারা ওয়েবসাইট চালাচ্ছে, তারাই নিজেদের মত ডেটা দিয়ে একটা রেটিং করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ডেটার সত্যতা কীভাবে নিশ্চিত হলো?”
‘শিক্ষক হেনস্থার ঝুঁকি’
ডাকসু শিক্ষক মূল্যায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে শিক্ষক হেনস্থা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাইনুল ইসলাম।
তার ভাষ্য, “আমরা বিদেশে পড়েছি ও পড়িয়েছি। সেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে কোনো শিক্ষককে মূল্যায়ন করার নেতৃত্ব থাকে না। আর ডাকসু তো স্টুডেন্টদের বডি, তাদের কাজেরও একটা পরিধি আছে। তারা এভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাজ।”
তার ভাষ্য, “শিক্ষককে যখন অনলাইনে শিক্ষার্থীরা মন্তব্য করবে, সে ডেটা পাবলিকলি থাকতে পারে না। এতে একজন শিক্ষকের হেনস্থা হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আবার আমাদের শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকদের যখন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রয়োগের ঝুঁকি থাকে।”
ডাকসুর যুক্তি কী?
ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, “এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষকদের গড়িমসিকে যেমন জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে, তেমনি ডেডিকেটেড শিক্ষকদের উৎসাহিত করা হবে।”
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, “আমার ডাকসু নির্বাচনের ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ করেও অগ্রগতি না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে স্বতন্ত্রভাবে তা চালু করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় থেকেই কাজ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি দপ্তর, উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।”
ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দীন খান বলেন, “এই উদ্যোগের লক্ষ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করা নয়, বরং পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মতামত জানানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলেও শিক্ষকদের পাঠদানের মান কিংবা উন্নতির জায়গা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এক বছরেও ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।”
ডাকসুর এ ধরনের মূল্যায়ন করার এখতিয়ার আছে কিনা জানতে চাইলে জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করেছিল। সেজন্য আমরা চালু করেছি। আমরা ডাকসু ৪০ হাজার শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমাদেরকে শিক্ষার্থীরাই অথরিটি দিয়েছে। আমরা কারো নিয়োগপ্রাপ্ত না।”
তিনি বলেন, “কেউ যদি আমাদের চ্যালেঞ্জ করে যে আমরা ডেটা ইনপুট দিয়েছি, সেক্ষেত্রে আমরা ডেটা পাবলিক করে দিব। আর আমরা এখন ট্রায়াল করছি, আগামী এক মাস ট্রায়াল চলবে। এরপর আমরা যেসব ইস্যুতে প্রশ্ন উঠবে, তা ঠিক করব।”
এখানে রাজনীতিকীকরণের যে ঝুঁকি আছে, তা কীভাবে বন্ধ করবে জানতে চাইলে ফরহাদ বলেন, “ আমরা তো বলছি, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হবে না। যদি হয়, এরকম কেউ চ্যালেঞ্জ করলে আমরা জবাব দিব।”
শিক্ষকরা হেনস্থার যে ঝুঁকি দেখছেন, তা কীভাবে দূর হবে জানতে চাইলে ডাকসুর জিএস বলেন, “যেসব শিক্ষক বলছেন যে শিক্ষকদের হেনস্থা হওয়ার ঝুঁকি আছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলুক যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করে। তাহলেই আমরা বন্ধ করে দিব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
কিন্তু মূল্যায়নের উদ্যোগ কে নেবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এটা কি ডাকসুর কাজ? এটা করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। ডাকসু এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে পারে; চাপ তৈরি করতে পারে।
“শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু যেটা করছে, এটা অনধিকার চর্চা। এর ফলে এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে মবে রূপান্তরিত হতে পারে। কার্যত শিক্ষার্থীরা শিক্ষক মূল্যায়নের ইতিবাচক ফলাফল থেকে বঞ্চিত হবে।”
