বাংলাদেশের নিজস্ব হোটেল ব্র্যান্ড তৈরির সময় এসেছে: ইউনিক হোটেল সিইও
হোটেল খাতের ব্যবসা কর, শুল্ক ও সুদের চাপে থাকার কথা তুলে ধরে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের সিইও সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় উদ্যোক্তাদের হাত-পা বেঁধে দিলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে না।
উচ্চ কর-শুল্ক, ঋণের সুদ, আমদানি ব্যয় ও বিনিয়োগ জটিলতায় বাংলাদেশে হোটেল ব্যবসার খরচ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি অতিথি কমায় কক্ষ ভাড়া থেকে আয়ও কমেছে। তবে দেশীয় গ্রাহকের কারণে খাবার, পানীয় ও অনুষ্ঠান থেকে আয় বেড়েছে।
এ অবস্থায় নীতি পরিবর্তন, বিনিয়োগে নিরাপত্তা, সহজ অর্থায়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং দেশের পর্যটনকে ব্যবসা, চিকিৎসা ও হালাল পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
হোটেল ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চার ও পাঁচ তারকা হোটেলের কক্ষের অতিথিদের ৯৫ শতাংশের বেশি বিদেশি। বাকিদের বড় অংশ অনাবাসী বাংলাদেশি। স্থানীয় অতিথির সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতির ওঠানামার সরাসরি প্রভাব পড়ে হোটেল ব্যবসায়।
তার মতে, “৫ আগস্টের পর অতিথি ও বুকিং বেড়েছে। তবে বুকিংয়ের মান বদলেছে। আগে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মালিক বা শীর্ষ নির্বাহী বাংলাদেশে আসতেন। এখন নির্বাহীরা বেশি আসছেন। মালিকরা দূর থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফলে তাদের ক্ষেত্রেও রুমের বুকিংয়ে যে রেটটা আগে হতো, তার চেয়ে কম রেটে এখন বুক হচ্ছে। সুতরাং গড়ে দৈনিক হারটা কম, কিন্তু বুকিং আসছে। আগামী দিনগুলোতে আরো ভালো হবে। বিশেষ করে ইউএন সম্মেলন এবং ইত্যাদি শেষ হওয়ার পরে একটা বুকিং ফ্লো এবং আমাদের দেশে বিনিয়োগের ফ্লো বাড়বে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগও বাড়বে।“
হোটেলের আয়ের ধরন বদলের কথা তুলে ধরে ইউনিক হোটেলের সিইও বলেন, “২০০৭ সালে ওয়েস্টিন বাংলাদেশে আসার সময় কক্ষ থেকে আয় ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি। খাবার, পানীয় ও অনুষ্ঠান থেকে আয় ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। এখন কক্ষ থেকে আয় প্রায় ৪০ শতাংশে নেমেছে। খাবার, পানীয় ও অনুষ্ঠান থেকে আয় বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। দেশীয় গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে। কক্ষ ব্যবসায় একবার বড় বিনিয়োগের পর পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম। কিন্তু খাবার ও পানীয় ব্যবসায় কাঁচামালসহ নানা খরচ বেশি। এ খাতে ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ। তাই খাবার ও পানীয় থেকে আয় বাড়লেও মোট মুনাফায় চাপ তৈরি হয়।”
ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের প্রতিযোগিতার মূল শক্তি গ্রাহক সেবা বলে মনে করেন তিনি।
“একমাত্র শক্তি হলো কাস্টমার সার্ভিস। আমরা কোয়ালিটিতে কোনো কম্প্রোমাইজ করি না। জিরো টলারেন্স। যদি কোনো খাবার আমাদের ডিসপ্লেতে যায় অথবা মেন্যুতে যায়, এই খাবারটা যেই শেফ রান্না করবেন, যেই শেফ সুপারভাইজ করবেন এবং আমাদের একটা টেস্টিং প্যানেল আছে, এই টেস্টিং প্যানেলের লোক টেস্ট করবে। যদি অতিথির অভিযোগ এলে কারণ খুঁজে সমাধান করা হয়। আরেকটা হলো মেইনটেন্যান্স ও ক্লিনিং। মেইনটেন্যান্স ও ক্লিনিংয়ের দিকে আমরা ফুল ফোকাস দেই। আমরা ফোকাস দেই পার্সোনালাইজড সার্ভিস। প্রত্যেক মানুষকে জেনারেল সার্ভিস করি না, আমরা সার্ভিসটাকেও ভাগ করি। কোনো গ্রাহকের কী লাগবে, সেটাকে আমরা বুঝে তারপরে তাকে সেবা দেই। এজন্য কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।”
কর্মীদের সন্তুষ্টি ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া, কর্মীদের বেতন দিতে দেরি না করা, ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া এবং ভালো ধারণা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন অভিজ্ঞ এই সিইও।
তার মতে, কর্মীদের যত্ন নিলে তারা অতিথিদেরও যত্ন নেয়। অপারেশনাল এক্সিলেন্সের জন্য নিয়মিত গবেষণা ও সেবার বিশ্লেষণ করা হয়।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কর্মী নিয়োগে হসপিটালিটি ও ট্যুরিজম বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে ভালো। তবে কর্মীর সেবা দেওয়ার মানসিকতাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশের হোটেল খাতে আতিথেয়তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশি অতিথিরা বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হন। তবে যানজট, বাইরে হাঁটার সময় ভিক্ষুকের বিরক্ত করা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ কম থাকা তাদের অভিযোগের বড় বিষয়।
বাংলাদেশে পাঁচ তারকা হোটেলের খরচ বেশি হওয়ার পেছনে জমির দাম, ঋণের সুদ, আমদানি শুল্ক ও পরিচালন ব্যয়কে দায়ী করেন তিনি।
তার ভাষ্য, “গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিন। এইখানে একজন মানুষ হোটেল বানাবে। সে জায়গায় প্রতি কাঠা কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। নিউইয়র্কের যে দাম, টোকিওতে যে দাম, একই দাম এখানে। এ জায়গা কিনে হোটেল বানানোর জন্য ব্যাংক থেকে টাকা আনতে হবে। ব্যাংক থেকে আনতে হলে তাকে জামানত দিয়ে ব্যাংকের ১৪ শতাংশ সুদ দিতে হয়। বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদ। এটা আরো বাড়ছে। ভবিষ্যতে ১৮% হয়, তাই দিতে হবে।”
হোটেলের ফার্নিচার, ফিটিংস ও সরঞ্জাম আমদানিতেও বড় অঙ্কের শুল্ককে এ খাতের বিকাশে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরেন ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের এই সিইও।
“হোটেলের প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য দেশে তৈরি হয় না। ফলে খাবার, কক্ষের বিভিন্ন সামগ্রী, সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শুল্ক, ভ্যাট ও বিভিন্ন চার্জ।”
তার ভাষ্য, অতিথির বিলের সঙ্গে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ, ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক যুক্ত হয়।
পাঁচ তারকা হোটেলের ক্ষেত্রে সিটি ট্যাক্সের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নানা ধরনের ব্যয়ের কারণে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, আগে যেখানে একটি হোটেল করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লাগত, এখন সেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বিনিয়োগ ফেরত পেতে আগে প্রায় ২০ বছর লাগলেও এখন তা ৩৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় হোটেল ও পর্যটন খাতে শুল্ক কমানো, সহজ ঋণ দেওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ছাড়, কর অবকাশ, সিড মানি এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন। পর্যটন খাতের জন্য আলাদা দক্ষ জনবল এবং পর্যটন ক্যাডার চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি।
পর্যটনকে শুধু হোটেলকেন্দ্রিক না রেখে খাবার, বিনোদন, পরিবহন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। মসলিনসহ দেশীয় পণ্যের প্রচারেও পর্যটনকে কাজে লাগানোর কথা বলেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ব্যবসা পর্যটনের বড় সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাক, পাট, মসলিন, ওষুধ ও জাহাজভাঙা শিল্পকে কেন্দ্র করে বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। মিটিং, ইনসেন্টিভ, কনফারেন্স ও প্রদর্শনী পর্যটনেও সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসা পর্যটনে হৃদরোগ ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা সেবার সম্ভাবনা রয়েছে। ধর্মীয় ও হালাল পর্যটনেও বাংলাদেশ বড় সুযোগ নিতে পারে।”
টঙ্গীর বড় ধর্মীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিদেশি মুসলিম পর্যটক আকর্ষণের সম্ভাবনার কথাও বলেন।
তবে পর্যটক আকর্ষণের আগে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ঠিক করার ওপর জোর দেন তিনি। যানজট, ভিক্ষুকের হয়রানি ও চলাচলের সমস্যার সমাধান না হলে বিদেশি পর্যটক ধরে রাখা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও পর্যটনের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখেন তিনি।
উদ্যোক্তা তৈরির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন সাখাওয়াত হোসেন। বলেন, উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স, বিনিয়োগ নিরাপত্তা ও ব্যবসা পরিচালনায় সহযোগিতা দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় উদ্যোক্তাদের হাত-পা বেঁধে দিলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে না। বড় উদ্যোক্তা তৈরি হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
বাংলাদেশের নিজস্ব আন্তর্জাতিক হোটেল ব্র্যান্ড তৈরির সময় এসেছে বলেও মনে করেন তিনি।
ভারতের লীলা, ওবেরয় ও তাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইউনিকের ‘হানসা’ ব্র্যান্ডকে সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাখাওয়াত বলেন, এজন্য বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও লাভের নিশ্চয়তা দরকার।
অর্থনীতির ধীর গতিতে করপোরেট, কূটনৈতিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়েও এখন চাহিদার পরিবর্তন ও ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা চলছে বলে তার পর্যবেক্ষণ। যুদ্ধ, আর্থিক সংকট ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
“করপোরেটে আমরা একটা পরিবর্তন দেখছি যে, করপোরেটরা আগে যে পরিমাণে ব্যয় করতো, সেটা এখন করছে না। সবাই কনজারভেটিভ হয়ে গেছে। কারণ সবারইতো আয় কম। ব্যয়টাও সংকোচন করছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, আর্থিক সংকট এবং জ্বালানি সংকট- সবকিছু মিলে ডিপ্লোমেটিক পর্যায় থেকেও ব্যয় সংকোচন করছে। ব্যক্তি পর্যায়ও মানুষ ব্যয় সংকোচন করছে। একান্ত যদি না পারে, যেমন ধরেন কারও বিয়ে- জীবনে একবার এগুলো হচ্ছে। এবং জাতীয় দিবস, বড় বড় করপোরেটের বিভিন্ন ইভেন্ট সেগুলো হচ্ছে। কিন্তু আগে যে রকম ইভেন্ট হওয়া বা একটা আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমে অনেক ব্যয়ের যে একটা ধরন ছিল, ধরনটা অনেক পরিবর্তন হচ্ছে।”
বাংলাদেশের হোটেল ও পর্যটন খাতের সুদিনের জন্য নীতি পরিবর্তন, সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্ব এবং উদ্যোক্তাদের সহায়তার ওপর জোর দেন সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে পেশাজীবীদের মৌলিক কাজ ও মেধাস্বত্বকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
নিজের উদ্ভাবিত ‘সিক্স কন্ট্রোল পয়েন্টস অব ফুড কস্ট অপ্টিমাইজেশন’ তত্ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কপিরাইট পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এ বিষয়ে পড়ান। পাঁচ শতাধিক শেফ ও ব্যবস্থাপনা কর্মীকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিয়েছেন। খাদ্য কূটনীতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
“খাবার একটি সর্বজনীন যোগাযোগের মাধ্যম। খাদ্যকে জনকূটনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পর্যটন, খাদ্য কূটনীতি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নীতিগত সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বড় সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।”
