০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কার্বন নিঃসরণ কমানোর খরচ শুধু কারখানার ওপর চাপানো যাবে না: বিশেষজ্ঞ

“এক্ষেত্রে ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ একটা সমাধান হতে পারে,” বলেন পোশাকশিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা জোট— ক্যাসকেইলের কর্মকর্তা জয়েস সোই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Sep 2026, 01:46 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমাতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার পুরোটা মালিকদের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন জয়েস সোই।

বিশ্বব্যাপী পোশাকশিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা জোট— ক্যাসকেইলের এ কর্মকর্তার মতে, এই অর্থায়নে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ব্যাংক, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু তহবিল, এমনকি সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

ক্যাসকেইল একটি অলাভজনক জোট, যাদের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে। শুরুতে তাদের নাম ছিল ‘সাসটেইনেবল অ্যাপারেল কোয়ালিশন’। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ‘ওয়ালমার্ট’ ও ‘প্যাটাগোনিয়ার’ উদ্যোগে। 

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতা, এনজিও ও প্রস্তুতকারকসহ বর্তমানে এই জোটের সদস্য তিন শতাধিক। 

ক্যাসকেইলের মূল লক্ষ্য হল, পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন পরিমাপে একটি অভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করা।

এর অংশ হিসেবে তারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পক্ষেও কাজ করে।

জয়েস সোই আছেন জোটের ‘ডিকার্বনাইজেশন প্রোগ্রামের’ জ্যেষ্ঠ পরিচালকের দায়িত্বে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ডিকার্বনাইজেশন পরিস্থিতি ও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাসহ নানা বিষয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন তিনি। 

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ডিকার্বনাইজেশনের বর্তমান অবস্থা কী? 

বাংলাদেশে গত এক দশকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কম কার্বন নিঃসরণকারী পোশাকশিল্প হিসেবে বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। 

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক এলইইডি সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা গড়ে তোলা এবং টেকসই উন্নয়নের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ সক্ষমতা দেখিয়েছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোরও অঙ্গীকার রয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ জ্বালানি খাতে। বর্তমানে অধিকাংশ পোশাক কারখানা এমন একটি বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসসহ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেশি। 

ক্যাসকেইলের হিগ ইনডেক্স-ফ্যাসিলিটি এনভায়রনমেন্টাল মডিউলের মাধ্যমে কারখানাগুলো তাদের জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ করতে পারে। আমাদের ‘ম্যানুফ্যাকচারার ক্লাইমেট অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ও কারখানাগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাসের হিসাব তৈরি, বিজ্ঞানভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও অনুমোদন এবং জলবায়ু ঝুঁকি বুঝতে সহায়তা করছে। এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানে বাস্তবসম্মত ডিকার্বনাইজেশন পরিকল্পনা করা সম্ভব।

গ্রিসের এথেন্সে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাসকেইলের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

গ্রিসের এথেন্সে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাসকেইলের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

জ্বালানি সংকটে থাকা বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য ডিকার্বনাইজেশন কি জ্বালানি নিরাপত্তারও সমাধান হতে পারে? নাকি এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার উদ্যোগ?

ডিকার্বনাইজেশনকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার উদ্যোগ হিসেবে দেখাটা ঠিক হবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কারখানার জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, জ্বালানির দামের ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে পারে এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।

কারখানা পর্যায়ে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, বর্জ্য তাপ পুনর্ব্যবহার, আরও ভালো বয়লার ব্যবহার, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংগ্রহ কিংবা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানো— সবগুলো উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পোশাক খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে জ্বালানি ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে। এতে কারখানার উৎপাদন ও ব্যবসা সচল রাখাও সহজ হবে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সরবরাহ বিঘ্নের কারণে যে দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তার ঝুঁকিও কমবে।

একটি পোশাক কারখানার বিদ্যুতের চাহিদার কতটা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে মেটানো সম্ভব? কোনো কারখানা এ ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত কি না, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এখন পোশাক কারখানার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাগুলোর একটি। এর বড় সুবিধা হলো, কারখানার নিজস্ব জায়গাতেই এটি স্থাপন করা যায় এবং অর্থনৈতিকভাবেও সাশ্রয়ী। 

গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো সম্মিলিতভাবে নিজের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে। চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে।

তবে ছাদে সৌরবিদ্যুৎকে বৃহত্তর ডিকার্বনাইজেশন পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

আর কোনো কারখানা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযুক্ত কিনা, তা জানতে সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। আমরা জিআইজেডের সঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ১২৯টি কারখানায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছি। 

কারখানাগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা কি আছে? সীমিত পরিসরের ছাদভিত্তিক ব্যবস্থার বদলে বড় কোনো কেন্দ্রীয় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প কি বেশি কার্যকর হতে পারে?

এটি কারখানা থেকে কারখানায় ভিন্ন। ছাদের আয়তন, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ছাদে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা হল, কারখানা সরাসরি সেখান থেকে বিদ্যুৎ পায়। তবে বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পুরো পোশাক খাতের জন্য বৃহৎ পরিসরে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।

নীতিগত কাঠামো থাকলে করপোরেট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট বা পিপিএর মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোকে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

সাধারণ একটি পোশাক কারখানার জন্য ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বা জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় আর্থিক বাধা কী? 

প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করাটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। অধিকাংশ কারখানাই বাজেটের চাপে থাকে, ফলে বড় অঙ্কের অর্থ একবারে বিনিয়োগ করা কঠিন। ডিকার্বনাইজেশনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ পাওয়াও সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বর্তমান সরকারের একটি নীতিগত পরিবর্তন বেশ ইতিবাচক। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি স্টোরেজসহ বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর শুল্ক ২০৩১ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করা হয়েছে। এতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ কমবে এবং বাংলাদেশে আরও বেশি কারখানা নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহ পাবে। ফলে কম খরচের পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতে পোশাক খাতের রূপান্তরও দ্রুত হতে পারে।

বিনিয়োগের হিসাব করার সময় শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভ দেখলে হবে না। জ্বালানি সাশ্রয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান—এসব সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে।

অনেক পোশাক কারখানা  তুলনামূলক কম মুনাফায় ব্যবসা করে। তাদের পক্ষে কি ডিকার্বনাইজেশনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাস্তবসম্মত? 

২০২৫ সালের জুনে ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট: ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিস’ শিরোনামে আমাদের একটি প্রতিবেদন বেরোয়। এতে বলা আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে। অথচ অর্থায়নের ঘাটতি এখনও বড়। ফলে এটা পরিষ্কার যে, ডিকার্বনাইজেশনের পুরো দায়িত্ব শুধু কারখানার মালিকদের ওপর দেওয়া সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ বা বিভিন্ন উৎসের অর্থায়ন। বাণিজ্যিক ঋণদাতা, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু অর্থায়নকারী সংস্থা, ব্র্যান্ড এবং সরকারের সহায়তাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

স্বল্প সুদের ঋণ, গ্রিন ক্রেডিট লাইন এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির মতো ব্যবস্থা এ ধরনের বিনিয়োগকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তুলতে পারে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও দক্ষ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের প্রভাব কি পোশাকের দামে পড়তে পারে?

কিছু বিনিয়োগে স্বল্পমেয়াদে খরচ বাড়তে পারে। তবে সাশ্রয়ের ব্যাপারও আছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মতো উদ্যোগ জ্বালানির খরচ ও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে। পক্ষান্তরে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হিসাব করলে, উৎপাদনকারীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবানই হবেন।

আর বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ঘাড়ে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগের পরিমাণ, অর্থায়নের ধরন এবং বাজার পরিস্থিতির মতো নানা বিষয়ের ওপর।

সব কিছু মিলিয়ে ডিকার্বনাইজেশনকে শুধু বাড়তি খরচ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনাগত দক্ষতা বাড়ানোর বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

উৎপাদন খরচ বাড়লে ভিয়েতনাম, চীন, ভারতের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? 

প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো ডিকার্বনাইজেশনের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি। বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলো ক্রমেই বিজ্ঞানভিত্তিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে এবং কম নিঃসরণকারী ও বেশি স্থিতিস্থাপক সরবরাহব্যবস্থা চাইছে।

যেসব উৎপাদনকারী কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে পারবে, ভবিষ্যতের ব্যবসা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে থাকবে।

ক্রেতাদের প্রত্যাশা যেহেতু বদলাচ্ছে, ডিকার্বনাইজেশন এখন শুধু নিয়ম মেনে চলার বিষয় নয়; বরং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার একটি উপায় হয়ে উঠছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ক্রেতাদের চাহিদা পূরণেও সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ যদি এই রূপান্তরে দেরি করে, তাহলে কম কার্বন নিঃসরণে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ক্যাসকেইল ও তাদের অংশীজনরা বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ ডিকার্বনাইজেশনের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। আপনার অভিজ্ঞতায় এখন পর্যন্ত প্রধান শিক্ষা কী?

বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ১২৯টি প্রতিষ্ঠানকে কারখানার প্রাঙ্গণে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সহায়তা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের অর্থায়নযোগ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্প তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে, যা বিদ্যুৎ খরচ কমাতে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে।

ব্র্যান্ডগুলোর জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে সরবরাহব্যবস্থায় বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ কর্মসূচি বড় পরিসরে প্রয়োগযোগ্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে।

উৎপাদনকারীরা নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মতো সমাধান খুঁজছেন।

তবে ডিকার্বনাইজেশনকে বড় পরিসরে নিতে হলে সরকার, বিভিন্ন ব্র্যান্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দরকার। এই রূপান্তরের খরচ, ঝুঁকি ও সুফল পুরো সরবরাহব্যবস্থার অংশীদারদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে।

১২. ছাদে সৌরবিদ্যুতের বাইরে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর কোন প্রযুক্তি বা উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত? জ্বালানি দক্ষতা, তাপ পুনরুদ্ধার, বিদ্যুতায়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জ্বালানি সংরক্ষণ, নাকি অন্য কোনো সমাধান?

আগামী দশকে কারখানাগুলোর জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার এবং বয়লারের মতো তাপীয় ব্যবস্থার উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিশেষ করে পোশাক খাত এখনও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হওয়ায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমবে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ও কমবে।

একই সঙ্গে কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎপাদনব্যবস্থায় যেতে হলে শুধু কারখানা পর্যায়ে উদ্যোগ নিলেই হবে না, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকেও কার্বনমুক্ত করতে হবে। গ্রিডের উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং নতুন ধরনের বিদ্যুৎ সংগ্রহব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সুযোগ বাড়লে উৎপাদনকারীদের বিদ্যুতায়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জ্বালানি সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে হবে।

পাশাপাশি অটোমেশন, ডিজিটাল উৎপাদন প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, অপচয় কমাতে এবং উৎপাদনব্যবস্থা আরও দক্ষ করতে পারে।

তবে এই রূপান্তরের জন্য একক কোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা যাবে না। সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট করা এবং নির্ভরযোগ্য ও কম কার্বন নিঃসরণকারী বিদ্যুতের সুযোগ বাড়ানোর মধ্যে সমন্বয় ঘটানো।

কারখানাগুলোর ডিকার্বনাইজেশন দ্রুত করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন দেখতে চান? 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ বাড়ানো। এ জন্য ‘করপোরেট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা পিপিএর ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও সহজ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহায়ক নীতি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে হবে, উৎপাদনকারীরা যেন বড় পরিসরে সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পান। 

বাংলাদেশের সামনে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রাকে একই পথে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য অবশ্য নীতিগত সংস্কার অব্যাহত রাখা, বিদ্যুৎ গ্রিডের অবকাঠামো উন্নত করা এবং সরকার ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোটা জরুরি।

সবশেষ প্রশ্ন, আপনি যদি আজ বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ও নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দিতেন, তাহলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে ডিকার্বনাইজেশন ত্বরান্বিত করতে কোন তিনটি কাজকে সবচেয়ে জরুরি বলতেন?

প্রথমত, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। এতে জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি গ্রিডে পরিবর্তনশীল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি আরও বেশি যুক্ত করা সম্ভব হবে। 

২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য রয়েছে। কারখানাগুলো যেন বড় পরিসরে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক দামে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ পায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের ঘাটতি কমাতে হবে। ব্যাংক, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু তহবিল, ব্র্যান্ড ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ বা সমন্বিত অর্থায়ন সংগ্রহ করে ডিকার্বনাইজেশন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনকারী, সরকার, ব্র্যান্ড ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এনে বাস্তবসম্মত ও বড় পরিসরে প্রয়োগযোগ্য সমাধানে ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ যদি এই তিনটি ক্ষেত্রে একই সঙ্গে অগ্রগতি করতে পারে, তাহলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম পোশাক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও পোক্ত হবে।

আরও পড়ুন

পোশাক কারখানার ছাদে ১৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব: সিপিডির গবেষণা