৯২ দিন ধরে পেট্রোবাংলা চলছে ‘অতিরিক্ত’ দায়িত্বের চেয়ারম্যান দিয়ে
এই করপোরেশনের ওপর রয়েছে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বড় পরিকল্পনা নিলেও ৯২ দিন ধরে পেট্রোবাংলাকে চেয়ারম্যান দেয়নি সরকার।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মান্নান নিজের পদের পাশাপাশি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
এই করপোরেশনের ওপর রয়েছে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব।
সাগরের ২৬টি ব্লকে বিদেশি কোম্পানি আনার কাজও করছে প্রতিষ্ঠানটি। এত কাজের মধ্যে পেট্রোবাংলার দায়িত্বে একজন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান না রাখায় প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি বিভাগের ১৭ মে জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়, ‘পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত’ অতিরিক্ত সচিব আব্দুল মান্নানকে ‘নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে’ পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হল।
সোমবার পর্যন্ত ওই আদেশের ৯২ দিন পেরিয়েছে। নতুন কোনো আদেশও হয়নি। আব্দুল মান্নানকে এখনো জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হিসেবে দেখানো হচ্ছে দুই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯ মাসে পেট্রোবাংলায় তিনজন চেয়ারম্যান এসেছেন। মো. রেজানুর রহমান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চেয়ারম্যান হন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়।
তার জায়গায় মো. এরফানুল হক ৫ ফেব্রুয়ারি পেট্রোবাংলায় যোগ দেন। কিন্তু তিন মাসের মাথায় তাকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এর তিন দিন পর আব্দুল মান্নানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নেতৃত্ব বদলেছে দুবার। সর্বশেষ চেয়ারম্যানকে সরানোর পর আলাদা কাউকে পদটিতে দায়িত্ব দেয়নি সরকার।
পেট্রোবাংলার অধীনে ১৩টি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানি গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের কাজ করে। এলএনজি আমদানি এবং কয়লা ও কঠিন শিলা উত্তোলনের কাজও এই করপোরেশনের অধীনে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান করপোরেশনটির পরিচালনা পর্ষদেরও চেয়ারম্যান। বড় প্রকল্প অনুমোদন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা এবং অধীন কোম্পানিগুলোর কাজ সমন্বয়ে তার ভূমিকা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান পদের জন্য আগ্রহী একাধিক ব্যক্তি থাকলেও উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাইয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসহ সব দিক যাচাই করে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কার করতে চায়।
এর মধ্যে জুলাই পর্যন্ত ২৮টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশার কথা জানিয়েছিল মন্ত্রণালয়। তবে সেসব কুপ থেকে পাওয়া গেছে ২৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ, প্রত্যাশার তুলনায় গ্যাস মিলেছে আট কোটি ঘনফুট বা প্রায় ২৪ শতাংশ কম।
১৫০টি কূপের কাজ শেষ হলে দৈনিক ১৮৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে বলে সরকারের আশা। বাকি প্রায় পাঁচ বছরে আরও ১২২টি কূপের কাজ শেষ করতে হবে।
দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড় সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি ছিল প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট।
এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি বাড়ে। জাহাজ চলাচল বা এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হলে সরবরাহও কমে যায়।
সরকার ২৪ মে সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন দরপত্র ডেকেছে। এর মধ্যে অগভীর সমুদ্রের ব্লক ১১টি। গভীর সমুদ্রের ব্লক ১৫টি। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর।
এর আগের ২০২৪ সালের দরপত্রে কোনো বিদেশি কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। নতুন দফায় শর্ত সহজ করে আবার কোম্পানি আনার চেষ্টা চলছে। বিদেশি কোম্পানির কাছে তথ্য তুলে ধরা, বিনিয়োগে আগ্রহী করা, দরপত্র মূল্যায়ন এবং চুক্তি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পেট্রোবাংলার।
পেট্রোবাংলার সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিকল্পনায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে সরকার কতটা আন্তরিক, তা কাজের অগ্রগতিতেই বোঝা যাবে।
“সময়মতো কূপ খনন, আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা, মজুদের তথ্য হালনাগাদ এবং পেট্রোবাংলায় স্থিতিশীল নেতৃত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারকে সেই আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে।”
