বেসরকারি ঋণে ভাটা, ধার কমাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক
ঋণের চাহিদা কমার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যও বাড়ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় কলমানি, আন্তঃব্যাংক রেপো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার পরিমাণও কমছে।
ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণত এসব উৎস ব্যবহার করা হয়। কোনো ব্যাংকের হাতে সাময়িকভাবে নগদ অর্থের ঘাটতি তৈরি হলে অন্য ব্যাংক থেকে কলমানিতে ধার নেওয়া যায়। একইভাবে জামানতের বিপরীতে আন্তঃব্যাংক রেপো বা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো থেকেও অর্থ নেওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে এই তিন উৎস থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ধার নেওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। জুনে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ধার নেওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও এই তিন উৎস থেকে ব্যাংকগুলোর মোট ধার ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। মে মাসে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্বল বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি, জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমেছে।
ফলে ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
বাড়ছে উদ্বৃত্ত তারল্য
ঋণের চাহিদা কমার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফে রাখছে। এই ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখে নির্ধারিত সুদ পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এসডিএফে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা রাখে, যা এ ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর অর্থ রাখার ক্ষেত্রে রেকর্ড।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসডিএফে ব্যাংকগুলোর জমা ছিল প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মার্চে ৫৭ হাজার ৮০০ কোটি এবং এপ্রিলে ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে এসডিএফের সুদহার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৯ আগস্ট কলমানি বাজারে ভারিত গড় সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকায় স্বল্পমেয়াদি ধার নেওয়ার প্রয়োজন কমছে। তবে যেসব ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি রয়েছে, তারা এখনো কলমানি, আন্তঃব্যাংক ধার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপোসহ বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করছে।
ডলার কিনে বাজারে টাকা
ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এসব ডলার কেনার বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার সরবরাহ বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়ের তথ্যে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজারে ডলার কেনার কার্যক্রম দেখা যায়।
এদিকে ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির হার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হলেও এসডিএফের হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়।
তবে নীতি সুদহার কমানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ার স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বিনিয়োগের সুযোগ কমছে
ধারের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়ে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দীর্ঘ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগের সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ায় অতিরিক্ত তারল্যে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ব্যাংকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে আমানত ব্যবস্থাপনা।’’
তিনি বলেন, ‘‘জ্বালানি সংকটের মত বিভিন্ন কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ফলে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগও কমছে। কারণ এখনো ব্যাংকের ঋণ বেশি যায় প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। এ কারণেই ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের আগ্রহ ক্রমাগত কমছে।’’
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগবিহীন তারল্যের ক্রমবর্ধমান মজুদ অনেক ব্যাংকের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ঋণ প্রবৃদ্ধির চেয়ে আমানত প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ধার কমিয়ে দিচ্ছে জানিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, অন্যদিকে আমানত প্রবৃদ্ধি কিন্তু ১০ শতাংশের বেশি হচ্ছে। সুতরাং, ব্যাংকগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে।’’
ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ার এই প্রবণতা একদিকে ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি ধার নেওয়ার প্রয়োজন কমাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকার চিত্রও তুলে ধরছে।
