লাইভে এসে স্ত্রী হত্যা: অপরাধ ও শাস্তির একাল-সেকাল

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক
Published : 21 April 2020, 06:05 PM
Updated : 21 April 2020, 06:05 PM

ফেইসবুক লাইভে এসে স্ত্রীকে খুন করার দৃশ্য দেখাচ্ছেন এক ব্যক্তি। এরপর স্ত্রীকে খুন করার কারণ ব্যাখ্যা করছেন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, গত ১৫ এপ্রিল ফেনী পৌরসভার উত্তর বারাহীপুর  মৌজার গোলাম মাওলা ভুঞার ছেলে ওবায়দুল হক টুটুল (৩২) তার স্ত্রী  তাহমিনা আক্তারকে (২৮)  ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

হত্যার মুহূর্তের এই দৃশ্য কিছুটা সে লাইভও করে। এরপর উদ্ভ্রান্তের মতো সে হতাশা ব্যক্ত করে; তার স্ত্রী সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে, পরিবারকে ব্ল্যাকমেইল করে ইত্যাদি।  এরপর সে পুলিশকে ফোন করে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে নিজেকে পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করে। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রথম শ্রেণির প্রচার মাধ্যমগুলো অনেকটা নিষ্প্রভ হলেও বিকল্প মাধ্যমগুলো এ ঘটনাকে লুফে নিয়ে রীতিমত জাবর কাটছে। যদিও ফেনীর ফেইসবুক লাইভের হত্যাকাণ্ডের মতো শত শত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে অহরহ  সংঘটিত হচ্ছে।

গত বছরের ২০ অক্টোবর ময়মনসিংহের একটি বাসস্ট্যান্ডে একটি ট্রাভেল ব্যাগের মধ্যে পাওয়া যায় একজন পুরুষের মাথা ও হাতবিহীন লাশ। পরে কুড়িগ্রামের এক ডোবা থেকে অজ্ঞাত মানুষের মাথা ও হাত পাওয়া গেলে সেগুলো এ ময়মনসিংহের বাসস্টান্ডে পাওয়া নেত্রকোনার বকুল মিয়ার লাশেরই অংশ ছিল তা পুলিশ অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়

২০১২ সালের জুন। রাজধানী ঢাকার হাতিরপুলের একটি আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষে একজন ট্রাভেল এজেন্ট কর্মচারী ফরিদপুর থেকে আসা তার কিশোরী বান্ধবীকে হত্যা করে তার লাশ ২৬ টুকরো করে বাথরুমের কমোডে ফ্লাস করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে টুকরোগুরো জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বানু বেগম তার স্বামী জাকিরকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে অচেতন করে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ শোবার ঘরের খাটেন নিচেই পুঁতে রাখেন

২০১৪ সালের এপ্রিল। কুমিল্লার মুরাদগনর উপজেলার লাজৈর গ্রামে পারিবারিক কলহের জের ধরে জনৈক  ইয়াসমিন তার বড় বোনের ছেলে রিফাত (৬) ও ভাসুরের ছেলে জসিমকে (৭) ফুঁসলিয়ে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নির্জন স্থান খালের ধারে নিয়ে যায়। রিফাতকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে গলা কেটে ও জসিমকে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে খালের কচুরিপানার নিচে ফেলে রাখে। এ সময় ঘাতক ইয়াসমিনের ৩ বছরের শিশু সিয়ামের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয় এবং ভুট্টাক্ষেত ও খালের কচুরিপানার নিচ থেকে দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে

এধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের কোনায় কোনায়। কিছু কিছু ঘটনা তার নৃশংসতার জন্য প্রচার মাধ্যমে আসে। কিন্তু অনেক ঘটনা রয়ে যায় আমাদের অগোচরে।

অপরাধের নিষ্ঠুর প্রবণতা নিয়ে অপরাধীদের মোডাস অপারেন্ডি নিয়ে প্রচার মাধ্যমে হাজার হাজার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় পুলিশ সেগুলোর তদন্ত করছে, লাশ উদ্ধার করছে, আলামত জব্দ করছে, আসামি গ্রেফতার করে আদালতে সমর্পণ করছে। বিচারে অনেকের সাজাও হচ্ছে। এভাবেই চলছে আমাদের সনাতনী বিচার ব্যবস্থায় নিষ্ঠুর প্রকৃতির অপরাধগুলোর প্রচার, তদন্ত, বিচারের ক্লাসিক্যাল চক্রটি।

অনেকে মনে করছেন, আমাদের সমাজে এ কি হল যে হত্যাকারী এখন তার হত্যার কাহিনী প্রকাশ্যে প্রচার করছে, নিজেকে নির্দোষ দাবী করে সব দোষ ভিকটিমের উপর চাপাচ্ছে? অনেকে ভাবছেন, আমাদের সমাজের মূল্যবোধের দারুণ অবক্ষয় ঘটেছে, সমাজ থেকে উঠে গেছে মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, অনুভূতি-সহানুভূতি।

কিন্তু অপরাধ বিজ্ঞান বলে অপরাধ সভ্যতার সমান বয়সী। আর খুন হল পৃথিবীর প্রথম ফৌজদারি অপরাধ। সমাজ পরিবর্তনের ধারায় হত্যার ধরন মানুষের কাছে কম বা বেশি জঘন্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু হত্যার ধরন যাই হোক না কেন, একজন মানুষের জীবন হরণ করাই এর আসল উদ্দেশ্য। মানুষকে জীবন্ত পুড়ে মারা, জীবন্ত কবর দেওয়া কিংবা জীবন্ত মানুষকে টুকরো টুকরো করে ফেলে খুনির খুন করার ধরনের সাথে সাথে আপন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু বিষয়টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে ভিকটিমের জীবন হরণ। 

পৃথিবীতে আধুনিক কালের শাস্তির ধরন চালু হওয়ার পূর্বে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মূল উপায়ই ছিল তাদের হত্যা করা। এ হত্যার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হতো। প্রথম দিকে বড় বড় অপরাধ যেমন রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা উচ্চ পদস্থদের হত্যার শাস্তি হিসেবে হত্যাকারীকে দফায় দফায় শাস্তি দিয়ে হত্যা করা হত। মধ্যযুগের ফ্রান্সে একটি হত্যার অপরাধীকে সাজা কার্যকর করতে  ১৮ থেকে ২০ দিন সময় লাগত। প্রথম দিন খুনির হাত ফুটন্ত পানিতে ঝলসে দেওয়া হত। পরদিন সেই হাত কেটে দেওয়া হত। তৃতীয় দিন তার বুক ও বাহুতে আংটা লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হত। চতুর্থ দিন তার পিঠের চামড়া আংটা দিয়ে উল্টো করে ঝুলানো হত। তারপর তার শরীরকে চাকার মধ্যে ঘোরানো হত, চাপ দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হত এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধীর শরীরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হত।

ইউরোপের এ ধরনের নিষ্ঠুর শাস্তিগুলো হত প্রকাশ্যে। হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে এসব জঘন্য শাস্তি সোৎসাহে উপভোগ করত। জল্লাদ এক চোটে এক চোটে হতভাগ্য অপরাধীর মাথা কেটে সেই মাথা এক হাতে উঁচু করে তুলে উৎসুক জনতার উদ্দেশ্যে ম্যাজিকের ভেলকির মতো প্রদর্শন করত। আর আনন্দে আত্মহারা জনতা তা দেখে জল্লাদকে গলাফাটা চিৎকারে বাহবা দিত। অপরাধীর দুই হাত, দুই পায়ের সাথে চারটি ঘোড়া জুড়ে দিয়ে যখন চারদিকে ছুটিয়ে দেওয়া হত এবং অপরাধীর দেহের চারটি অংশ যখন চারদিকে চার ঘোড়ার সাথে ছুটতো উপস্থিত জনতা তখন হৈ হৈ করে উল্লাস করত। নিরীহ ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্রের এ নৃশংসতা আমোদপ্রিয় নাগরিকদের জন্য উচ্চতর বিনোদনের মতো ছিল।

রাষ্ট্রযন্ত্রে মানবিকতা প্রবেশের প্রাক্কালে এক  সময় প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়া হলে জনগণ তার প্রতিবাদ করে বলত, কোনো অপরাধীকে কষ্ট দিয়ে মারার দৃশ্য দেখার অধিকার তাদের আছে। তাই সেটা প্রকাশ্যেই করতে হবে। অপরাধী তার ভিকটিমকে যেভাবে শাস্তি দিয়ে হত্যা করত, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার নৃশংসতার মাত্রা তার চেয়ে কোন অংশেই কম ছিলনা; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেশি জঘন্য ছিল।

কিন্তু ক্রমান্বয়ে মানুষের মূল্যবোধে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যে মানুষ প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড সচক্ষে দেখার দাবির জন্য রাজ প্রাসাদের বাইরে বিক্ষোভ  প্রদর্শন  করতো, এমন দিন আসতে শুরু করল যে সেই জনতাই আবার অপরাধীর শাস্তিকে মানবিক করে তোলার দাবি নিয়ে রাস্তায় নামল। কালের পরিক্রমায়  ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ফ্রান্সও অপরাধীদের শাস্তিদানের ক্ষেত্রে মানবিক হতে শুরু করল। এরই ধারাবাহিকতায় পাশ্চাত্য জগৎ এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে যখন তার শাস্তির খাতায়  মৃত্যুদণ্ড বলতে কিছু নেই।

কোনো সমাজ কতটা নির্মম হবে তা নির্ভর করে সে সমাজের গঠন ও প্রশাসনের উপর।  নিরঙ্কুশ ক্ষমতার রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যুগে ইউরোপিয়ান সমাজ ছিল নিষ্ঠুর। তাই সেই সমাজের অপরাধের ধরন ও শাস্তিও ছিল অনুরূপ। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে অপরাধের ধরন ও শাস্তির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।

আমি জানি না, বাংলাদেশের সমাজ এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের সমাজ এখন পর্যন্ত অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম কিছুতে সন্তুষ্ট নয়। আমাদের আইনের কাঠিন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।

ফেনীর ফেইসবুকের লাইভে এসে স্ত্রী হত্যাকারীকে আমরা সবাই জঘন্য বলছি। তার অপরাধের শাস্তি হিসেবে আমরা মৃত্যুদণ্ডই দাবি করছি। কেউ কেউ আবার মধ্যযুগের ফ্রান্সের মতো এ ঘাতকের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডও দাবি করছেন। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে, কী কারণে এ যুবক তার ভালবাসার স্ত্রীকে নির্মমভাবে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করল, কোন প্রেষণা তাকে সেটা ফেইসবুকে লাইভে আনার তাগিদ দিল সে কথা কেউ জানতেও চাইবে না। পুলিশের তদন্ত প্রমাণ করবে যে হত্যাকারী পরিকল্পিতভাবে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছিল। কিন্তু তার হত্যার পিছনের মোটিভ বা মনোভাবের কোনো তদন্তই হবে না। কারণ অপরাধের মোটিভ বিচারের বিষয় বা ফ্যাক্ট ইন ইস্যু নয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান যেখানে ইতি টানে, রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্র যেখানে ঘটনার সমাপ্তি ঘোষণা করে মনোবিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান ঠিক সেখান থেকেই শুরু করে। প্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক কালের বিচার ও শাস্তির জঘন্য ও অমানবিক স্তরগুলো পার হয়ে আমরা যে বর্তমান অবস্থায় প্রবেশ করেছি তার মূলে রয়েছে সমাজ বিজ্ঞানের অবদান। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে অট্রালিকা তৈরির তাগিদ দিয়েছে, নির্মাণ কৌশল শেখার তাড়ণা তৈরি করেছে। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানের গবেষণা সেই অট্রালিকায় বসবাসরত মানুষগুলোকে মানবিক করে তোলার  দিক নির্দেশনা দিয়েছে।

কিন্তু এসব জঘন্য অপরাধ নিয়ে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন সামাজিক ও মনোবিজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়নি। তাই এসব নিষ্ঠুর মানসিকতার পিছনের সত্য আমাদের জানা হয়নি, আমাদের জ্ঞান এখনও কেবল ভাসা ভাসা হাহুতাশ আর মূল্যবোদের অবক্ষয়কে দোষারোপের মধ্যেই সীমীত। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের এসব নিয়ে মৌলিক গবেষণা করা দরকার। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক