০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

একজন বেকার মানুষের সুখী হওয়ার গল্প

এম নাসির

Published : 24 Feb 2018, 10:34 AM

Updated : 23 Jun 2022, 11:12 PM

ছবির মানুষটির নাম শাহ্‌ আলম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১০নং রামরাইল ইউনিয়নের ছোট্র ঘাটিয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গত কয়েক বছর আগেও গ্রামের মানুষের কাছে একজন বেকার যুবক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তখন তার সাংসারিক হিসাব-কিতাবের মধ্যে শুধুই দুঃখ-দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠতো। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চোখের সামনে কত কিছুইনা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই সংসারের সুখ-শান্তি ফেরাতে পারছিলেন না। স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সাংসারিক চাপ তার চেহরার মধ্যে পরিষ্কার হয়ে ভেসে বেড়াতো।

বিদেশে যাওয়ার জন্যেও অনেক চেষ্টা করেছেন। অনেক দিন ঘুরাঘুরি করেও বিদেশ যাওয়া হয়নি। ফলে সুখের স্বপ্ন যেনো দুঃখের মাঝেই দেখতে হচ্ছিল। বেশি টাকা কামানোর চিন্তা মাথা থেকে একদিন ফেলে দিয়ে বাড়ির পাশে জাহাঙ্গীর নামের একজন সবজি খামারির সাথে কথা হয়। কিভাবে এই সবজি চাষ করা যায় সে সম্পর্কে তার কাছ থেকেই কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে ঘরে ফিরেন। স্ত্রীর সাথে বোঝাপড়া করে নিজের পনেরো শতাংশ জমিতে শুরু করেন সবজি চাষ। প্রথমে নিজের সামান্য জমিতে শসা চাষ করেছিলেন। এই শসা দিয়েই সাফল্যের দেখা পেয়ে গেলেন।

প্রথম সাফল্য লাভের পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনদিন চাষাবাদ বাড়াতে থাকেন এবং আশেপাশের অন্যের জমি লিজ নিতে থাকেন। কয়েক একর জমি নিয়ে পুরোদমে শুরু করেন বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ। টমেটো, বেগুন, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, চাইনিজ তরমুজ, লাউ, ঢেঁড়স, শিম সহ হরেক রকম শাক-সবজি। এসব সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার বাজারেও পাঠানো হচ্ছে। এখন খামারে কাজের জন্যে অনেক লোক রাখা হয়েছে। তার দেখাদেখি আশপাশের খালি জমিতেও অনেকেই সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

শাহ আলমের পেছনে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ যোগান তার স্ত্রী। বাড়িতে গাভী পালনের মাধ্যমে প্রতিবছর তিনিও অনেক টাকা আয় করছেন। প্রতি ঈদেই একটি দুটি ষাঁড় বা গরু বিক্রি করেন লাখ টাকায়। সবমিলিয়ে তাদের সংসারে কোনো ঝামেলা নেই। হাসি-খুশিতে তাদের জীবন চলছে অবিরত। ছেলে-মেয়েরা ভালোভাবে স্কুলে লেখাপড়া করে যাচ্ছে্। আগে যেখানে ধার-কর্য চাইলেও কেউ দিতে চাইতো না, এখন বিভিন্ন ব্যাংক-সংস্থা তার কাছে এসে বলে, টাকা লাগবে?

তার সাথে আমার একদিন সবজি চাষ নিয়ে কথা হয়েছিল যে, নতুন একজন চাষি যদি সবজি চাষ করতে চায় তাহলে প্রথমে কি করতে হবে? উত্তরে তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা এবং সুপরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সবজি চাষে সবচেয়ে কঠিন কাজটি হচ্ছে সঠিক সময় বোঝা এবং নিজেকে উজার করে সবজি চাষে শ্রম দেয়া। লক্ষ রাখতে হবে, সবজি চারাগাছে কোন প্রকার পোকামাকড় ধরেছে কি-না? সঠিক সময়ে কীটনাশক দিতে হবে, সময় মতো সার ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই সাফল্য আপনার হাতে আসবে।

তিনি এটাও বলেছেন যে, পৃথিবীতে সব ব্যবসায় লোকসান থাকতে পারে, কিন্তু সবজি চাষে লোকসান নেই। সঠিক সময়ে সবজি চাষ করুণ, অধিক মুনাফা ঘরে তুলুন। সবচেয়ে বড় যে কথা বলেছেন তিনি, সেটি হচ্ছে- দেশ-বিদেশে চাকরির পেছনে না ঘুরে চোখ-কান বন্ধ করেই শুরু করুন সবজি চাষ। দেখবেন বিদেশের টাকা দেশে থেকেই আয় করা সম্ভব। তিনি দেশের সব যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "আপনারা বেকার কেন থাকবেন? আসুন, জমির মাটি নিয়ে খেলা করি! এই খেলাতে জয় ছাড়া পরাজয় নেই। বাস্তব উদাহরণ আমি নিজেই……।"