২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

তবে কি কথা হবে না ‘বয়স্ক গম্ভীর’ পুরুষ’র ‘চরিত্র’ নিয়ে?

আনা নাসরীন আনা নাসরীন

Published : 28 Jan 2018, 12:57 AM

Updated : 23 Jun 2022, 11:13 PM

'প্রাইভেসি'কে প্রকাশ করে এমন খুব যথাযথ বাংলা শব্দ নেই। সম্ভবত এই বস্তুটি বাঙালির ছিল না বলেই বাংলায় এই শব্দটিও নেই। অথচ হঠাৎ করে কেমন করে যেন আমরা এতটাই প্রাইভেসি প্রিয় হয়ে উঠেছি যেন আমরা পোপের চেয়ে বেশি ক্যাথলিক হয়ে উঠেছি।

কিছু মানুষের কাছ থেকে শুনেছি রাস্তায় কোনো বিপদগ্রস্ত মেয়ের চিৎকার শুনেও কাছে যায়নি। কেননা তারা মনে মনে কল্পনা করে নিয়েছেন কাছে গিয়ে জানতে চাইলে লোকটা যদি বলে মেয়েটা আমার বউ, এটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার, তাহলে কী হবে? আমার খুবই অবাক লাগে আমাদের সমাজের এরকম অদ্ভূত 'ব্যক্তিগত' বোধ সম্পর্কে। ধরে নিলাম লোকটা ঠিকই বলছে, মেয়েটা তোর বউ। বউকে কি সে মারতেও পারে, বা তাকে জোর করে টেনে নিয়েও যেতে পারে? এমন অধিকার কি মানুষের থাকে যে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার হয়ে যাবে!! মাঝেমধ্যে প্রতিবেশি নারী/শিশুর আর্তনাদ শুনে যখন মধ্যরাতে ছুটে যেতে উদ্যত হই তখন আমারই পরিবারের মানুষ আমাকে সাবধান করে বলে, 'আগ বাড়িয়ে যাস না। যদি তারা মুখের ওপর দরজা আটকে দেয়। যদি বলে আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।' কেউ কাউকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাবে, কেউ ঘরে দরজা আটকে পেটাতে পেটাতে মানুষ মেরে ফেলবে আর আমি দেখেও দেখব না শুনেও শুনবো না। কারণ আমি সভ্য দেশের শিক্ষিত নাগরিক, আমি প্রাইভেসিতে বিশ্বাসী। এই সভ্যতা আমাকে কি শিক্ষা দিল?

সকল অন্যায়কে প্রাইভেসির নামে এড়িয়ে গেলে এই তত্ত্বের ভিত্তিতে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, ঘুষ কোনও অপরাধ নিয়েই আর কথা বলা যাবে না। এই প্রাইভেসির চর্চাটা অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হলেও ভিকটিমের জন্য নয়। নির্বাসিতা লেখিকা তসলিমা নাসরিন তার বই 'ক' এ কিছু বিখ্যাত মানুষের মুখোশ খুলে লাম্পট্যের রূপ বের করে দিলে তা নিয়ে সেসময় কিছু মানুষের মধ্যে ঠিক একই রকম আলোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ওঠে নৈতিকতার অলিখিত চুক্তি সম্পর্কে। এই প্রসঙ্গে লেখিকা বলেছিলেন কোনও নৈতিকতার মানদণ্ডে এরকম কোনও অলিখিত চুক্তি কারও সাথেই কখনও থাকতে পারে না যা অপরাধীকে বাঁচাতে সাহায্য করে। এরকম চুক্তি যদি থাকে তাহলে অপরাধীরা নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে অপরাধ করতে পারবে।

অকারণে বা সামান্য কারণে নিজের ইনবক্স খুলে কাউকে দেখানোটাকে আমি প্যান্ট এর জিপার খুলে দেখানোর মতোই অশ্লীল মনে করি। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু কিছু রোগে আক্রান্ত হলে মানুষকে জিপার খুলেও দেখাতে হয় সেটা মেনে নেয়া দরকার। আপনাকে যদি কেউ কখনো কোনও ফর্মে জীবনের হুমকি দেয় সেটা মেসেজ বা ভয়েস কনভারসেশন এ। সেই স্ক্রিন শট বা ভয়েস রেকর্ড আপনি কি রাখবেন না? নাকি সেটা গোপন রেখে অপরাধীকে অপরাধ করতে সাহায্য করবেন? তবে ব্যাপার দু'টো একটু আলাদা। একটা হচ্ছে এক পাক্ষিক, অন্যটা দ্বিপাক্ষিক। প্রশ্নটা সম্ভবত এটাই যে দু'পক্ষের ইনভলভমেন্ট থাকার পরও কেন সেই কনভারসেশন শো করা হবে? সব কিছু আসলে নির্ভর করে সম্পর্ক ও বিশ্বস্ততার ওপর। কারও ওপর আস্থা রাখবার আগে যথেষ্ট সময় নিতে হয়।

মাত্র মাস দেড়েকের একটা অপরিণত সম্পর্ককে শরীরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আমার কাছে 'লাম্পট্যই' মনে হয়। যাকে বলে 'ধর তক্তা মার পেরেক'। এরকম ধর তক্তা মার পেরেক জাতীয় প্রেমে যে প্রেমিক-প্রেমিকা সাড়া দিতে পারে এমন নড়বড়ে ব্যক্তিত্বের মানুষের কাছ থেকে তো এই পরিণতিই আশা করা যায়। তক্তাটা ধরেই পেরেক মেরে আবার যখন সে কেটেও পড়বে, তার সাথে অবিশ্বস্ততা করে প্রতারণা করে চলে যাবে তখন এমন ঠুনকো ব্যক্তিত্বের প্রতারিত ব্যক্তিটি যে অতি মানবিক রূপ ধারণ করে প্রতারকের সম্মান আগলে বসে থাকবে এমনটি আশা করাটা বোধ হয় অতি কল্পনা বিলাসিতাই হয়ে যায়।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু কখনো কারও ইনবক্সে পাঠাই না যেটা সে পাবলিশ করলে আমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। ইনবক্সটা যেহেতু তার, আমি জানি না যে সেটা সে সিক্রেট রাখবে নাকি পাব্লিশ করবে। আমি যখন কাউকে কিছু দিয়ে দেই, তখন দানকৃত বস্তুর ওপর আর ওউনারশিপের দাবি রাখি না। ব্যাপারটাকে একেবারে অন্য কারও পার্সোনাল ডায়রি চুরি করে পাব্লিশ করার সমতুল্যও ভাবি না। তবে ব্যাপারটি অশোভন তা মানতেই হয়।

বিবাহিত বয়স্ক একজন পুরুষের প্রেমের ফাঁদে পা দেয়াটা মোটেও বুদ্ধিমতির কাজ নয়, এই বোকামিটা চরম অপরিপক্কতা ও অনভিজ্ঞতার ফসল। সর্বোপরি বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া উভয়ের দিক থেকেই অনৈতিক। তবে এই জাতীয় মুখোশধারী, ধূর্ত, ইন্টেলেকচুয়াল প্রতারক পুরুষের চতুরকলার ফাঁদে পড়ে যাওয়াটা কোনও অনভিজ্ঞ সদ্যগত কিশোরীর পক্ষে খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তার ওপর পুরুষটি যদি হন জনপ্রিয় কোনও নারীবাদী। যদিও এ জাতীয় পুরুষরা কখনও নারীবাদী হন না, কেবল একটি মুখোশ ধারণ করে থাকেন। এই মুখোশটা তাদের শিকার ধরতেও নানাভাবে সাহায্য করে। আর এটা তো বলাই বাহুল্য যে তারা শিকার ধরতে নানা রকম মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে থাকে। 'স্ত্রীর সাথে কোনো সম্পর্কই নেই; আমরা জাস্ট একসাথে থাকি। আমি ভীষণ নিঃসঙ্গ, বিষন্ন' – এগুলো খুব কমন কিছু কথা যেগুলো বলে বলে একজন প্রতারক পুরুষ তার 'শিকার'কে বোঝানোর চেষ্টা করবে স্ত্রীর সাথে সামাজিক সম্পর্ক ছাড়া ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্কই নেই।

শিকার ধরতে ওই ধরণের পুরুষ দীর্ঘকাল ধরে এই ফাঁদ ব্যবহার করলেও এটা এখনও অকার্যকর হয়নি। কারণ এই জাতীয় প্রতারক পুরুষরা অভিনয়েও খুব দক্ষ হয়ে থাকে। তারা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতেই নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে পারদর্শী। উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হলো এরা আপাতদৃষ্টিতে অন্য দশ জন পুরুষের চেয়ে অধিক নমনীয়, বিনয়ী ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে। যার ফলে এদেরকে চিনতে পারা কোনো অনভিজ্ঞ, অল্প বয়স্ক মেয়ের পক্ষে ভীষণ কঠিন বা দুঃসসাধ্য হয়ে পড়ে। তা হলেও এই আলোচনাগুলো চালু থাকা দরকার যেন এই চালাকিগুলো মেয়েদের পক্ষে বুঝতে পারা সম্ভব হয়। আর কৈশোরের প্রারম্ভ থেকেই দূরদৃষ্টি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার চর্চা আবশ্যক। অতি সরলতা বর্জনীয়।

বিবাহ বহির্ভূত প্রেম উভয় পক্ষের জন্য অনৈতিক হলেও নৈতিকতার মানদণ্ডে দু'টি সমান অপরাধ না। এরকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবাহিত ব্যক্তিটি একজনের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন, অবিবাহিত ব্যাক্তিটির ক্ষেত্রে অন্তত কারো সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবার অপরাধটি নেই।

আরেকটি ব্যাপার আমার কাছে উল্ল্যেখযোগ্য বলে মনে হয়, তা হলো দুজনের বয়স – একজনের আনুমানিক ষাট, অন্যজনের বাইশ। অন্যায়, অপরাধ, ভুল, দোষ যেভাবেই দেখি না কেন আমাদেরকে অবশ্যই দুজনেরই বয়সটা বিবেচনায় রাখতে হবে। যদি দোষও দেই 'একজন বয়স্ক গম্ভীর পুরুষ' আর এক চঞ্চলা সদ্যগত কিশোরীকে যেন এক পাল্লায় না মেপে ফেলি সেদিকটায় সতর্ক থাকা দরকার। অথচ স্তম্ভিত হয়ে দেখি, এক পাল্লায় মাপা দূরেই থাকুক, আমাদের প্রায় সবার আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জান্নাতুন নাঈম প্রীতি'র ইনবক্স ফাঁস করার ঘটনাটি! অপরাধের পাল্লা বরং অনেক ভারী প্রীতির দিকে।

এই ঘটনার অপর প্রান্তে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইমতিয়াজ মাহমুদ'র স্ত্রী তার স্বামীকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সাপোর্ট দিচ্ছেন। আমরা নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছি পারিবারিক সম্মান রক্ষা করার তাগিদেই তিনি এটি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি চাননি চরিত্রহীন স্বামীর দায়ে তাকে, তার সন্তানদেরকে এবং পরিবারের অন্যদেরকে সমাজের কাছে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয়।

এরকম ঘটনা এই প্রথম নিশ্চয়ই আমরা কেউ দেখছি না। আমি নিশ্চিত যে এরকম ঘটনা আমাদের চারপাশে হরহামেশাই ঘটে থাকে যার একটা দু'টা করে আমরা প্রত্যেকেই দেখেছি। স্থান, কাল, পাত্র ও শ্রেণী নির্বিশেষে এই অসহয়ত্বটা নারীর নিয়তি; হোক প্রান্তিক শ্রেণীর বা হোক এলিট শ্রেণীর নারী। বয়সকালে সংসার ত্যাগ করার সাহস খুব কম নারীরই হয়, ছানাপোনার মুখের দিকে চেয়ে চরিত্রহীন স্বামীর সংসার করা মেয়ের সংখ্যা অগুনতি। রাতের বেলা চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে উল্টো ঘুরে ঘুমানো আর দিনের বেলা সুখী দম্পতির অভিনয় সে তো আমাদের নারীদের জনম জনমের চর্চা।